একজন বরাতিকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের মহাশয়ের নাম কী? নিবাস কোথায়?
: মুর্শিদাবাদের বেলডাঙ্গার নাম শুনেছেন? সেই বেলডাঙ্গার ভেতরে ব্যান্যাডা গ্রাম। আমাদের গুরুপাট ওখানেই। আমাদের ‘মহাশয়’ ত্রৈলোক্য মহান্ত। ওই যে ঘুমিয়ে আছেন। পাশে আমাদের মা-গোঁসাই। মাটির মানুষ।
বন্ধুকে বললাম: ভেতরে ঢুকবে নাকি? এদের ওপর ভর করেই কিন্তু সারাবছর চলে সতী মার সংসার। এঁরাই মহাশয় আর বরাতি। এঁরাই দেন খাজনা আর প্রণামী। নতুন বরাতি এই সব গ্রাম্য মহাশয় রিক্রুট করেন।
বন্ধু বললেন: বুঝেছি এরাই গ্রাসরুট লেবেলের ক্যাডার। আর মহাশয় হলেন ল্যাডার। এদের ডেপুটি কালেকটারও বলা চলে কী বলো? কিন্তু এরা সব মহা ঘাঘু নয় কি? তোমার নোটবই এঁদের সম্পর্কে কী বলে?
আপাতত মহান্ত মহাশয় ঘুমোচ্ছেন তাই তাঁর সামনে বসে সাইড ব্যাগ থেকে নোটবই বার করে বলি, ‘এদের সম্পর্কে একটু মতামত আছে যোগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের বইতে। ১৮৯৬ সালে তিনি লেখেন,
The agents of the Karta are required to pay over their collections to him, at a grand levy held by him at his family residence in the month of March.
তার মানে এই দোলের মেলা। এর পরের অংশটা শোনো:
Each agent of the karta is generally on very intimate terms with a child- less and friendless widow in the village or group of villages entrusted to his charge, and through the instrumentality of this women he is able to hold secret meetings which are attended by all the female votaries with- in his jurisdiction and in which he plays the part of Krishna.’
: এ সব তুমি বিশ্বাস কর?
আমি বললাম, ‘যোগেন্দ্রনাথের আমলে হয়তো এ সব হত। কে জানে? আমার তো কোনও উলটোপালটা চোখে পড়েনি কখনও। আসলে গুরুবাদের ব্যাপারটা সবাই ঠিক বোঝেন না। তা ছাড়া এখানে তুমি কী দেখছ? শুধুই কি স্ত্রীলোক? কতই তো পুরুষ বরাতি রয়েছেন এ আখড়ায়। সবাই বিকৃত হতে পারে? আমি অনেক শুদ্ধ মহাশয় দেখেছি।’
কথার মাঝখানে উঠে বসলেন ত্রৈলোক্য মহান্ত। মাথায় ঝুঁটি, গালে দাড়ি গোঁফ, সিঁথিতে অজস্র আবির। মধ্যবয়সী অর্ধশিক্ষিত গ্রাম্য মানুষ। ভক্তিমান সেবাপরায়ণ। প্রথমেই আমাদের পরিচয় নিয়ে মিষ্টিজল খাওয়ালেন। বোধহয় আমাদের কথা কিছু কানে গিয়েছিল। তাই তারই রেশ ধরে বলে উঠলেন, ‘গুরু আর শিষ্যের সম্পর্ক আসলে পুরুষ আর নারীর মতো। সেইজন্য বলেছে,
প্রকৃতি স্বভাব না নিলে হবে না গুরুভজন।
আগে স্বভাবকে করো প্রকৃতি
গুরুকে পতি স্বীকৃতি।
তবে হবে আসল করণ॥
এ কথার মানে হল নিজের অহং ত্যাগ করে গুরুর পায়ে সব ছেড়ে দিতে হবে। কাজটা কঠিন।’
মহান্ত কথা বলে চলেছেন অনর্গল আর আমি অবাক হয়ে দেখে চলেছি আন্তরিক ও আত্মনিবেদিত সেবাধর্ম। একজন শিষ্যা প্রথমে পরম মমতায় মহান্তর কপালে জল চাপড়ে ধুয়ে আঁচল দিয়ে মুছিয়ে দেয়। তারপরে একটা চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ে তেল মাখিয়ে ঝুঁটি বেঁধে দেয়। তার মুখে সে কী আকুতি আর স্নেহের তাপ! যেন মা জননী। তারপরে গুরুর সারা মুখের ঘাম আঁচল দিয়ে মুছিয়ে পাশে বসে পাখার বাতাস করতে লাগল আর তাঁর প্রত্যেকটা কথা যেন গিলতে লাগল গভীর আগ্রহে। এমন দৃশ্য খুব বেশি তো দেখিনি জীবনে। আমার শিক্ষিত মগজ গুজবে উৎসুক, পর্নোগ্রাফিতে পোক্ত, খবরের কাগজে আইন-আদালতের পাতা-পড়া শহুরে বিকৃত মন। এমন অমলিন সম্পর্ক দেখলে অস্বস্তি হয় কোথায় একটা। অঙ্ক মেলে না।
ফস করে বলে বসলাম: আমাদের মন চট করে সব জিনিসে খারাপ দেখে কেন বলুন তো? একেই কি পাপী মন বলে?
সর্বজ্ঞের মতো হেসে মহান্ত বললেন, ‘তা হলে একটা গান শুনুন:
পাপ না থাকলে পুণ্যির কি মান্য হত?
যমের অধিকার উঠে যেত।
যদি দৈত্য দুশমন না থাকত
কামক্রোধ না হ’ত
মারামারি খুনখারাপি জঞ্জাল ঘুচিত।
সবাই যদি সাধু হ’ত
তবে ফৌজদারি উঠে যেত॥
গান থামিয়ে মহান্ত ক্ষণিক আমাদের দিকে চেয়ে নেন। সে কি আমাদের প্রতিক্রিয়া দেখতে? কী জানি? তারপরে হঠাৎ যেন একটা গিটকিরি মেরে গেয়ে ওঠেন:
দোষগুণ দুইয়েতে এক রয়
কর্মক্ষেত্রে পৃথক হয়।
পৃথক পৃথক না থাকিলে
দোষগুণ কেবা কয়।
যদি অমাবস্যা না থাকিত
পূর্ণিমা কে বলিত?
গ্রাম্যগানের এই বিন্যাস এই ন্যায়ের ক্রম আমার বরাবর খুব ভাল লাগে। যেন বক্তব্যের ব্যাখ্যার মতো গান এগিয়ে চলে। মনের মধ্যেই পাপপুণ্য, কামপ্রেম, প্রবৃত্তিনিবৃত্তি। কর্মক্ষেত্রে কেবল তারা পৃথক। এ পর্যন্ত বোঝার সঙ্গে সঙ্গে মহান্ত-র চোখের ইঙ্গিতে তাঁর পাশের সেই সেবাতৎপর শিষ্যাটি এবার অতি মধুর তারসপ্তকে গেয়ে উঠল:
গুরু মূল গাছের গোড়া
আছে ত্রিজগৎ জোড়া।
কীটপতঙ্গ স্থাবর জঙ্গম
কোথাও নেই ছাড়া।
লঘু যদি না থাকিত
গুরু কে বা বলিত?
গানের এই অংশ যতক্ষণ হল ততক্ষণ গুরু ত্রৈলোক্য ছিলেন মুদিতচোখ। হঠাৎ চোখ খুললেন। সে চোখভরা একবিশ্ব জল। বললেন, বড় কঠিন প্রশ্ন তুলেছিলেন বাবাজি। তার জবাবে গৌর গোঁসাইয়ের এত অকাট্য গানখানা অন্তর থেকে উঠে এল।
: অকাট্য গান?
: হ্যাঁ এক একটা গান কাটান দেওয়া যায় না। তার মানে এ-গানের মধ্যে যে-তত্ত্ব যে-সত্য তা চিরকালের মতো নির্ণয় হয়ে গেছে। মহতের লেখা পদ। এ তো বানানো গান নয়।
