হঠাৎই একজন যুবক আমাদের হাতে গুঁজে দিল একটি লিটল ম্যাগাজিন ‘শাব্দ’। ‘পড়ুন, পড়ে দেখুন’ আবেদন শুনে বন্ধু বললেন, ‘ভাই এখানেও পদ্য আসছে তোমাদের? রুখে দাঁড়াতে পারো না এ সব বুজরুকির বিরুদ্ধে?’
ছেলেটি বলল, ‘এটাই প্রতিবাদ। পড়ুন।’
দুজনে একটা গাছতলায় বসে প্রথমে ‘শাব্দ’ থেকে পড়ি ‘উৎসমানুষ’ কাগজের একটা পুনর্মুদ্রণ ‘কল্যাণীর ঘোষপাড়ায় সতী মায়ের মেলা, যা দেখেছি যা বুঝেছি।’ প্রথমেই পুরনো বছরের একটা প্রতিবেদন, বক্সে।
এবারেও (১৯৮০) ২৯শে ফেব্রুয়ারি থেকে ঘোষপাড়ার বিরাট মেলা বসেছিল।…একটি শিশুকন্যাকে নিয়ে তার মাসী হাওড়ার দানসাগর থেকে এসেছিল সতী মায়ের মেলায়। ছোট্ট মেয়েটি ঝড়বাদলে অসুস্থ হয়ে পড়লে সমবেত অনেকের পরামর্শে মাসী মেয়েটিকে হিমসাগরে (একটা এঁদো পুকুর যার নোংরা জলে হাজার লোকে স্নান করে পুণ্যলোভে) স্নান করিয়ে সতী মায়ের থানে ডালিমতলায় নিয়ে গিয়ে শুইয়ে রাখে। মেলাতে ডাক্তার ছিল কিন্তু দৈবশক্তির ওপর ভরসা ছিল অনেক বেশী। ফলত শিশুটি মারা যায়। মাসীর বুকফাটা আর্তনাদে মেলার বাতাস ভারী হয়। জলকাদার মধ্যে সে মৃত শিশুকে আঁকড়ে বসে ছিল।
পড়ায় বাধা পড়ল। এক ভদ্রলোক এসে বললেন, “আচ্ছা ব্যান্ডেল প্রতিবন্ধী কল্যাণ কেন্দ্রের স্টল কোথায় জানেন?’
: না তো। কী ব্যাপার? এখানে এই মেলায় স্টলটা আছে?
: হ্যাঁ। মাইকে শুনলাম। আমার ছেলে বোবা কালা। ওই দেখুন।
দেখলাম একটু দূরে দাঁড়িয়ে ম্লানমুখে মার কোলে ভদ্রলোকের একমাত্র সন্তান। বছর আট-দশ বয়স। প্রচণ্ড আক্রোশে পা দাপাচ্ছে। ক্ষীণস্বাস্থ্যের মা তাকে সামলাতে পারছেন না। হতাশ ভঙ্গিতে ভদ্রলোক বললেন, ‘ছেলেটা ভয়ানক টারবুলেন্ট। গত তিনবছর এখানে আনছি। ডালিমতলার মাটি খাইয়েছি, হিমসাগরে চান করিয়েছি। কিন্তু কিছু হল না। কী করি বলুন তো?’
: আপনি থাকেন কোথায়? করেন কী?
: বেলেঘাটা। একটা কারখানায় কাজ করি।
: লেখাপড়া জানেন? তো এখানে এসেছেন কেন?
অসহায় ভঙ্গিতে জবাব এল, ‘সবাই বলল। ওর মা কান্নাকাটি করতে লাগল। একজন বলল পরপর তিনবছর আসতে হয়। তাই আসলাম। তা হল কই? কিচ্ছু হল না। যে এনেছিল সে অনেক পয়সা খেঁচল মশাই। ধ্যুস, সব বাজে। এখন বলছে আপনি ভক্তিভরে সতী মাকে ডাকেননি। যাক গে বাদ দিন সব বুজরুকি। কল্যাণকেন্দ্রটা দেখি।’
প্রতিবন্ধী কল্যাণ-কেন্দ্র তো আমাদেরও দেখা দরকার। পায়ের তলায় আমাদেরও মাটি চাই। অসহায় পিতা মাতা আর প্রতিবন্ধী সন্তানের পেছন পেছন আমরা এগোই। খানিক যেতেই কানে আসে মাইকের উচ্চারণ: এখানে আসুন, এই প্রতিবন্ধী কল্যাণকেন্দ্রে। বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে পরীক্ষা করুন আপনার সন্তানকে। হিমসাগরের জল আর ডালিমতলার মাটিতে কিছু সারতে পারে না।
এসে দাঁড়াই সেই স্বস্তিকর মানবতার আহ্বানকেন্দ্রে। ছোট্ট স্টল। ভেতরে পাতা বেঞ্চিতে বসে আছে অনেক অসহায় ভাগ্যহীন মা-বাবা, তাদের হরেক প্রতিবন্ধী সন্তান নিয়ে। বোবা-কালা-অন্ধ-জড়বুদ্ধি-পঙ্গু। কয়েকটি উজ্জ্বল যুবক তাদের পরীক্ষা করছেন যন্ত্রপাতি দিয়ে। নির্দেশ দিচ্ছেন। একটি টেবিলে মাইক্রোস্কোপে দেখানো হচ্ছে হিমসাগরের জলে কত বীজাণু।
‘আপনারা এখনও মারধোর খাননি?’ আমার এ প্রশ্নে হাসির পায়রা উড়ে গেল যেন একঝাঁক। একজন যুবক বললেন, ‘বছর দুই ধরে আমরা আসছি ব্যান্ডেল থেকে। অন্ধবিশ্বাস আর এই সব কুসংস্কারের একটা প্রতিবাদ করা দরকার। কী বলেন?’
সায় দিয়ে ঘাড় নাড়লাম কিন্তু কিছু বলতে পারলাম না। কেবল মনে হতে লাগল গভীর নির্জন পথের প্রান্তে হয়তো আমার প্রাপ্তি ঘটবে না তেমন কিছু। তবে পথের দুধারেই তো পেয়ে যাচ্ছি অনেক দেবালয়। মনের মানুষ খোঁজার গহন সাধনা আমার কই? আমি তো ভিড়ের মধ্যে, দলিত মনুষ্যত্বের মধ্যে, অবমানিত মূল্যবোধের পুঞ্জীকৃত শবের মধ্যে ক্ষণে ক্ষণে দেখছি জীবনের উদ্ভাসন। শেষপর্যন্ত মানুষকেই, মানুষের মুক্তবুদ্ধিকেই জাগতে দেখছি। এ পথেই আলো জ্বেলে তবে ক্রমমুক্তি? ভাবলাম, মনের মানুষ না মিললেও মনের মতো মানুষ তো মিলে যায়। যেমন এই ব্যান্ডেলের চারটি যুবক, কিংবা সেই ছেলেটি যে আমাদের হাতে গুঁজে দেয় ‘শাব্দ’। এদের বিবেচনা আর প্রতিরোধে ভর দিয়ে দাঁড়ায় আমাদের প্রহৃত মনুষ্যত্ব। আবার নতুন উদ্দীপনায় বুক বেঁধে মেলার ভেতরে এগোই। মধ্যদুপুর। রোদ গনগনে। চারদিকের অগণন আখড়ায় রান্নাবান্না চলছে। চাপ চাপ ধোঁয়া আর সেদ্ধভাতের গন্ধ। তারই মধ্যে কোথাও কোথাও গান হয়েই চলেছে। দূর থেকে শোনা যাচ্ছে গুপ্গুপ্ গুম্গুম্ আওয়াজ। গানের তালবাদ্য। গুটি গুটি একটা আখড়ার সামনে দাঁড়াই। একজন গ্রামীণ গাহক গাইছে শব্দগান
মানুষ হয়ে মানুষ মানো
মানুষ হয়ে মানুষ জানো
মানুষ হয়ে মানুষ চেনো
মানুষ রতনধন।
করো সেই মানুষের অন্বেষণ॥
আখড়ার মধ্যে ভাল করে নিরিখ করে দেখা গেল যেন একটা বিস্তৃত তাঁবু। পাটি আর পলিথিন পেতে অন্তত পঞ্চাশ ষাটজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে বসে আছে। তাঁবুর বাইরে রান্নাকাজ চলছে। মস্ত বড় একখানা কড়াইতে খিচুড়ি ফুটছে। আখড়ার মধ্যে একটা জলচৌকি আসন। তাতে একখানা সতী মা-র ছবি। তামার ঘটে জল। ফুল পাতা আবির ফাগ মাখানো। আমি বন্ধুকে বললাম: একেই বলে আসন। মাঝখানে ওই যে সাদা আলখাল্লা পরা জটাজূট মানুষ ঘুমোচ্ছেন উনিই হলেন ‘মহাশয়’। আর এরা সব ‘বরাতি। বুঝলে?
