ঘোষপাড়ায় দাঁড়িয়ে অনেকবার আমার মনে হয়েছে সর্বধর্মসমন্বয়ের এমন অপরূপ পীঠস্থান কেমন করে সতী মা-র মহিমায় আবিষ্ট হয়ে গেল? সে কি দুলালচাঁদের অকালমৃত্যুতে পরবর্তী যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে? ১৮৩৩ সালে দুলালচাঁদের প্রয়াণ ঘটে। সতী মা সম্প্রদায়ের কর্ত্রী হন। তাঁরও দেহাবসান ঘটে ১৮৪০ সালে। তারপর গদিতে বসেন দুলালের পুত্র ঈশ্বরচন্দ্র। ১৮৮২ সালে ঈশ্বরচন্দ্রের মৃত্যু এবং শরিকদের মধ্যে গদির লড়াই।
সেই গদির লড়াই এখনও মেটেনি।
১৮৯৫ সালে নবীনচন্দ্র সেন যখন ঘোষপাড়ায় গিয়েছিলেন তখন সতী মা জীবিত নেই, রামদুলালের ছেলে ঈশ্বরচন্দ্রও দেহ রেখেছেন। তাঁদের পরবর্তী দুই বংশধর তখন দুই শরিক হয়ে দুই গদি দখল করেছিলেন। মেলায় তাঁদের দেখে নবীনচন্দ্র লেখেন:
এখন রামশরণ পালের দুই বংশধর আছেন। দুইটিই মহামূর্খ। তথাপি ইঁহারা উভয়ই বর্তমান ‘কর্তা’।…
দেখিয়াছি, মূর্খ কর্তা দুজন দুই ‘গদি’তে বসিয়া আছেন এবং সহস্র সহস্র যাত্রী তাঁহাদের ভক্তিভরে নমস্কার করিয়া এবং প্রণামি দিয়া পদধূলি গ্রহণ করিতেছে।
এখন, এই বিশ শতকের শেষ অংশে ঘোষপাড়ার মেলায় গেলে একই দৃশ্য দেখা যাবে। ঠাকুরবাড়ির ভেতরে আর বাইরে হাজার হাজার ভক্ত, পা ফেলার জায়গা নেই। বেশির ভাগ অজ্ঞ মূর্খ গ্রামবাসী। হুগলী নদীয়া মুর্শিদাবাদ বর্ধমানের কৃষিজীবী মানুষ। তাদের মধ্যে বারো আনা স্ত্রীলোক। দুই গদির বদলে এখন চার গদি। তার মানে চার কর্তা। এঁরা শিক্ষিত তবে প্রণামী নিতে ও পদধূলি দিতে খুবই আগ্রহী। গোমস্তা জাতীয় একজন লোক খেরোর খাতায় মহাশয় আর বরাতিদের খাজনা আদায় করছেন। সামনে আবির রাঙানো প্রাক্তন কর্তাদের আলোকচিত্র। একজন গোমস্তাকে আমার সঙ্গী বন্ধু জিজ্ঞেস করল, ‘খাজনা আদায় করছেন? কীসের খাজনা?’
আমি তাকে একপাশে সরিয়ে এনে নোটবই খুলে কুমুদনাথ মল্লিকের ‘নদীয়া কাহিনী’ থেকে টোকা একটা অংশ পড়ালাম। তাতে লেখা আছে:
পালবাবুদের ত্রিবিধ প্রকারে আয় হইয়া থাকে। ১) খাজনা ২) ভোগ ৩) মানসিক। অর্থাৎ উহাদের মতে প্রত্যেকের দেহের মালিক কর্তা, সুতরাং তুমি যে উহাতে বাস করিতেছ তজ্জন্য কর্তাকে তোমার খাজনা দিতে হয়।
বন্ধুটি বদমেজাজি। গজগজ করতে লাগল। এক যুবক এগিয়ে এসে আমাদের কাছে একটি বই দেখাল। ‘ঘোষপাড়ার কর্তাভজা সম্প্রদায়’ লেখক অদ্বৈতচন্দ্র দাস। নগদ সাতটাকা দিয়ে বইটি কিনে বন্ধু এক জায়গায় বসে পাতা উলটোতে লাগল। হঠাৎ শেষ প্যারাগ্রাফে এসে আমাকে বলল, ‘দেখেছ দেখেছ কাণ্ড। পড়ো পড়ো।’ পড়লাম, লেখা রয়েছে:
ব্যক্তিগত আত্মপ্রচারে মুগ্ধ না হয়ে, তুচ্ছ দ্বেষাদ্বেষি ও অর্থলোলুপতায় আকৃষ্ট না হয়ে, সতীমার দুই শরিক ট্রাস্টিগণসহ একযোগে ঠাকুরবাড়ির তথা কর্তাভজা ধর্মের উন্নতিসাধনে ব্রতী হন এই প্রার্থনা জানাই শ্রীশ্রীসতীমার শ্রীচরণকমলে।
বন্ধু বললেন, ‘দেখেছ, শুরু হয়েছে প্রতিবাদ। রেজিসটেন্স।’
প্রতিবাদ কোথায়? বছরের পর বছর সতী মা-র মেলায় একই দৃশ্য দেখে গেছি। হাজার হাজার মানুষ, অশিক্ষিত অসহায় রোগগ্রস্ত, হত্যা দিয়ে পড়ে আছে। ডালিমতলায় সতী মা-র নামে লালপেড়ে কাপড় শাঁখা লোহা সিঁদুর ছুড়ছে, গাছে বাঁধছে ঢিল। ডালিমতলার মাটি মেখে, খেয়ে, হিমসাগর নামে নোংরা একটা ঘুলিয়ে-ওঠা পুকুরের জলে স্নান করে, সেই জল খেয়ে, তারা ভাবছে তাদের রোগবালাই সেরে যাবে। বোবা কথা বলবে, খোঁড়া হাঁটবে, বাঁজার ছেলে হবে, অন্ধ পাবে দৃষ্টি। প্রতিবন্ধিতায় ভরা এই দেশে, অজ্ঞতায় মোড়া আমাদের গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্ছে গোপনে কত ধর্মব্যবসায়ী দালাল। তারাই এ সব অসহায় মানুষদের আনে এখানে ভুজুং ভাজুং দিয়ে। তার ফলে হিমসাগর থেকে ডালিমতলার দীর্ঘ পথ কাদায় কাদা। ভোর থেকে অগণিত অন্ধবিশ্বাসী আর কুসংস্কারঘেরা পুরুষ আর নারী দণ্ডী খাটছে। চোখে তাদের জল। মুখমণ্ডলে তাদের গভীর বিশ্বাসের দ্যুতি। বেশবাস ভিজে, অসম্বৃত। আত্মজের রোগ নিরাময়ের আশায়, স্বামীর পক্ষাঘাত সারাতে, সন্তানকামনার অতলটানে কত লজ্জাশীলা গ্রাম্যবধূ এখানে আত্মজ্ঞান হারিয়ে লজ্জা ভুলে দণ্ডী খাটছে। তাদের স্নানচিকণ দেহ সিক্তবসনের বাধা মানছে না। তার ওপর পিছলে যাচ্ছে লম্পট আর লুম্পেনের চোখ। সতী মার নাম মাহাত্ম্যে মহিমময় এমন এক জায়গায় মাতৃজাতির এতখানি অবমাননা সওয়া যায় না।
কোথায় প্রতিবাদ?
হিমসাগরের পাড়ে এসে দাঁড়াই। স্নানের জন্যে কী উদ্দাম লড়াই। ওইটুকু পুকুর পাঁকে আর কাদায় আবিল হয়ে উঠেছে কয়েক হাজার মানুষের দাপাদাপিতে। ধর্মীয় দালাল কোমরজলে দাঁড়িয়ে বোবা বালককে চুলের ঝুঁটি ধরে জলে চোবাচ্ছে আর গালে মারছে চড়। বলছে, ‘বল, সতীমা বল।’অক্ষম নির্বাক বালক খাচ্ছে চড়ের পর চড়। তার অরুন্তুদ যন্ত্রণার প্রতিরোধ কই? তার রাঙা চোখের পার-ভেঙে-আসা অশ্রু আর পারে-দাঁড়িয়ে-থাকা তার অভিশপ্ত গর্ভধারিণীর চোখের জল মিশছে হিমসাগরের ঐশী সলিলে। কে প্রতিবাদ করবে?
মাইকে মেলা কর্তৃপক্ষ গজরাচ্ছেন: আপনারা সংযত থাকুন। নারীজাতির সম্ভ্রম রক্ষা করুন। কেউ মেয়েদের গায়ে হাত দেবেন না।
‘তার মানে?’ আমার বন্ধুটি গর্জে ওঠে। ‘এখানে এ সব কী শুনছি, দেখছি? এ কি আমাদের দেশ? আমরা যে সবাইকে বলি ধর্মের উগ্রতা নেই পশ্চিমবঙ্গে। সে কি তবে ভুল? এর প্রতিকার নেই?’
