শমনে কাউকে থোবে না॥
এ ভর্ৎসনা কি আমাকেই? ভাববার আগেই গ্রাম্য গানের দারুণ লজিক আমাকে আঘাত করে এইখানে যে,
গোপনে যদি কেউ বেশ্যার ভাত খায়
তাতে জাতির কি ক্ষতি হয়?
ফকির লালন বলে জাত কারে কয়
এ ভ্রম তো আমার গেল না॥
রয়েল বলে উঠল, ‘বাবা জাত বলে কিছু নেই। সব কর্তাবাবার সন্তান তাই লালশশী বলেন—ভেদ নাই মানুষে মানুষে/খেদ কেন করো ভাই দেশে দেশে।’
আমি চেয়ে থাকি শিবশেখরের দিকে। তার মুখে লাজুক হাসি। ভাবলাম, খুব শিক্ষা হল যা হোক। সে আমার অবস্থা বুঝে হঠাৎ উঠে হাত দুটো চেপে ধরে বললে, ‘বাবু মনে কিছু করবেন না। এখানে সতী মা-র থান, শান্তির জায়গা। মনের মধ্যে দুঃখ রাখবেন না। রয়েল, তোমার মনে বড় প্রতিহিংসা।’
রয়েল বলল, ‘প্রতিহিংসা নয়। বাবুকে পেরথমেই একটা ঝাপটা মেরে সঠিক পথে দাঁড় করিয়ে দিলাম। ওঁর আর ভ্রম হবে না। তাই না বাবু?”
সঠিক পথ কোথায়, কোন্খানে? বছরের পর বছর এই যে আমার ঘোষপাড়ায় আসা তার পিছনে কীসের টান? ঘোষপাড়া জায়গাটাই কি অবিতর্কিত? সেই আঠারো শতকে এখানে যে-কর্তাভজা ধর্ম গড়ে উঠেছিল তা গোড়াতে ছিল আউলচাঁদের সুফিমত। ওয়ার্ড সাহেব আউলচাঁদের বর্ণনা দিয়েছিলেন এইরকম:
About a hundred years ago another man rose up, as the leader of a sect, whose cloth, or dress of many colours, which he wore as a voiragee, was so heavy that two or three people can now scarcely carry it.
বিশাল ভারী এই আলখাল্লাধারী মানুষটি তাঁর সুফিধর্মের ছাঁচে যে গৌণ ধর্মটির পত্তন করেছিলেন তাতে কালে কালে অনেক প্রতিভার উজ্জ্বলতা মিশেছে। সবশেষে উনিশ শতকের সংস্কার আন্দোলন, পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে উত্থান, বেদবিরোধী মনোভাব আর জাতিবর্ণহীন সমন্বয়বাদ সবই ঢুকে গেছে এ ধর্মে। কিছুটা ইসলামি বিশ্বাস আর কিছুটা খ্রিস্টধর্মের ক্রিয়াকাণ্ডও জুড়ে গেছে তার মর্মে। সুফিদের ব্যক্তিগত দেবতা যাঁকে তাঁরা বলতেন ‘হক’ বা সত্য—কর্তাভজারা সেই সত্যকে ভজনা করেন। আমার প্রথমে মনে হয়েছিল কর্তাভজা শব্দটা বোধহয় কেউ ব্যঙ্গ করে বানিয়েছিল। কিন্তু ভাবের গীতের একটি পদে দুলালচাঁদের একটি দর্পিত উক্তি থেকে সে ধারণা পালটালো। দুলাল বলেছিলেন:
আমি আপ্ত খোদে মেয়ে মরদে
কর্তা ভজাবো
কর্তাভজার কাছে তোদিকে
মূর্খ বানাবো।
বলাবাহুল্য এই ‘তোদিকে’ বলতে দুলালের লক্ষ্য ব্রাহ্মণ্যবাদ। সেই ব্রাহ্মণ্যবাদকে খর্ব করতে দুলালের সগর্ব উচ্চারণ।
আছে কর্তাভজা আর এক মজা
সত্য উপাসনা।
বেদ বিধিতে নাইকো তার ঠিকানা
এ সব চতুরের কারখানা।
কিন্তু চতুর মানুষটি কি শেষরক্ষা করতে পেরেছিলেন? দেখা যাচ্ছে দুলালের জীবিতকালেই কর্তাভজাদের একটা উপদল গজিয়ে ওঠে, তাদের নাম রামবল্লভী। অক্ষয়কুমার দত্ত তাঁর ‘ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়’বইতে রামবল্লভীদের কথা প্রথম উল্লেখ করে জানান: বাঁশবেড়িয়ার শ্রীনাথ মুখোপাধ্যায়, কৃষ্ণকিঙ্কর গুণসাগর আর মতিলালবাবু ঘোষপাড়ার পালেদের নেতৃত্ব অগ্রাহ্য করে ‘কালী কৃষ্ণ গড খোদা’ উপাসনা শুরু করেন। এ খবর পড়ে গন্ধ শুঁকে শুঁকে আমি হাজির হই বাঁশবেড়িয়ায়। বাঁশবেড়িয়া আর ঘোষপাড়া বলতে গেলে গঙ্গার এপার আর ওপার। বাঁশবেড়িয়ায় গিয়ে দেখি কোথায় কী? সব শুনশান। কৃষ্ণকিঙ্কর বা শ্রীনাথ মুখুজ্যের ভিটে বা বংশ আর নেই। একজন বৃদ্ধ সব শুনে বললেন, ‘মনে পড়েছে। খুব ছোটবেলায় শুনেছি ওই যেখানে বাঁশবেড়ের পাবলিক লাইব্রেরি তার নীচে গঙ্গার ধারে রামবল্লবীদের আখড়া ছেল তা সে কি আর আচ্যা?’ পাবলিক লাইব্রেরির নীচে গঙ্গার ভাঙা পাড়ে যখন ঘুরছি, পুলিশ-কুকুরের মতো, তখন উদ্ধার করলেন আরেক বৃদ্ধ। জানালেন রামবল্লভীদের আসল কাণ্ডকারখানা ছিল ওপারে অর্থাৎ কিনা কাঁচড়াপাড়ার কাছে পাঁচঘড়া গ্রামে। খুঁজতে খুঁজতে বাঁশবেড়িয়ার গ্রন্থাগারে ‘সংবাদ প্রভাকর’-এ ১৮৩১ সালের একটি উদ্ধৃতি মিলল ‘সংবাদপত্রে সেকালের কথা’ বইতে। জগচ্চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী পাঁচঘরা গ্রামে রামবল্লভীদের এক সমাবেশের ভারী চমৎকার বর্ণনা করে লিখেছেন:
এই ক-একজন বাবু একত্র হইয়া মোর কাঁচড়াপাড়ার অন্তঃপাতি পাঁচঘরা সাকিনে একজন পোদের ভবনে এক ইস্টকনির্ম্মিত বেদি তদুপরি চৌকী এবং তদুপরি কুসুমমাল্য প্রদানপূর্ব্বক পরম সুখে পরম সত্য নামক বেদি স্থাপন করিয়া বহুবিধ খাদ্যদ্রব্য আয়োজনপূর্ব্বক বিবিধবর্ণ প্রায় পঞ্চসহস্র লোক এক পংক্তিতে বসিয়া অন্নব্যঞ্জনাদি ভোজন করিয়াছেন এবং ত্রিবেণী ও বাঁশবেড়িয়া ও হালিসহর নিবাসী একশত ব্রাহ্মণ নিমন্ত্রিত হইয়া এক এক পিত্তলের থাল ও সন্দেশাদি বিদায় পাইয়াছেন এবং তৎস্থানে ফিরিঙ্গিতে বাইবেল পুস্তক পাঠ করিয়াছে এবং মুসলমানে কোরাণ পাঠ করিয়াছে এবং ব্রাহ্মণ পণ্ডিত গীতা পাঠ করিয়াছেন।
পড়তে পড়তে কি মনে হয় না ধর্মসমন্বয়ের একটা তাপ এঁদেরও মধ্যে লুকানো ছিল? মনে না হয়ে কি পারে যে দুলালচাঁদ যতখানি ব্যক্তি তার চেয়ে অনেকখানি তাঁর যুগের সৃজন? এঁদের সাফল্যে যে সমসাময়িক গাঙ্গেয় অঞ্চলের ব্রাহ্ম ও ব্রাহ্মণসমাজ কেঁপে উঠেছিল তাতে আর সন্দেহ কী? অক্ষয়কুমার তো এতদূর অসূয়াসম্পন্ন ছিলেন যে রামবল্লভীদের গোমাংস ভক্ষণের অপবাদও দিয়েছিলেন।
