এবার শরৎবাবু একটু গম্ভীর হয়ে বললেন–দ্যাখো অবিনাশ, মানবচরিত্র আমি তোমার চেয়ে কিছু বেশি দেখেছি জেনেছি চিনেছি। ও যা করেছে তা জেনেশুনে ইচ্ছা করেই করেছে, আমাকে জব্দ করবার জন্যই করেছে।
অবিনাশদা অনুরোধের সুরে বললেন—তবু আপনার উচিত একবার দেখা করে ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলা। কারণ এতে লোকসানটা তো আপনারই হচ্ছে।
শরৎবাবুর মুখে এবার যেন কৌতুকের হাসি খেলে গেল। শুধু বললেন–দ্যাখো অবিনাশ, তুমি তো আমাকে দেখা করতে বলছ। তার পরিণামটা
একবার ভেবে দেখেছ কি?
অবিনাশদা সরল মানুষ, তাই বললেন–তা একটা লেখা যদি চায় তো লিখে দেবেন।
সঙ্গে সঙ্গে শরৎবাবু বললেন–লেখার কথা হচ্ছে না। কথাটা হচ্ছে, চঁদমুখো শরৎচন্দ্রের কাছে চরিত্রহীন শরৎচন্দ্রের যাওয়া কি সমীচীন হবে?
অবিনাশদা এবার বেশ গম্ভীর হয়ে বললেন—একটা সিরিয়াস বিষয় নিয়ে পরামর্শ করতে এলাম, আপনি ঠাট্টা ইয়ার্কি করে হালকা করে ফেলছেন।
শরৎবাবু বললেন–আমরা আমাদের জীবনটাকে বড় বেশি সিরিয়াস করে ফেলেছি। একটু হাল্কা না করতে পারলে এ-বোঝ বেশী দিন বইব কি করে।
আবিনাশদা বললেন—ও সব তত্ত্বকথা রেখে এখন কাজের কথায় আসুন। আপনি তো যাবেন না বুঝতেই পারছি। আমিই না-হয় আপনার দুত হয়ে যাই। কিন্তু কি বলব?
–মধ্যপদলোপী হয়ে যেতে বল।
–মধ্যপদলোপী? সে আবার কি?
–কেন, চারু বন্দ্যোপাধ্যায় যা হয়েছেন। তুমি গিয়ে ওকে বল। চটা বর্জন করতে। উনি যখন পরে এসেছেন উনি শরৎ চট্টোপাধ্যায় থাকুন। আমি আদি ও অকৃত্রিম শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে গেলাম।
–আপনার এই প্রস্তাবে কোন কাজ হবে না। নামের এই সামান্য পার্থক্যে দুই ব্যক্তির স্বাতন্ত্র পাঠকদের কাছে মোটেই প্রকট হবে না।
—তাহলে এক কাজ কর। ওকে মারপিটের ভয় দেখাও।
অবিনাশদা এবার বেশ খানিকটা হকচকিয়ে গিয়ে বললেন–সে কি দাদা, শেষকালে গুণ্ডা লাগিয়ে মারপিট করবেন নাকি! ফৌজদারী মামলায় পড়ে যাবেন যে।
শরৎবাবু এবার হেসে ফেললেন। অবিনাশদাকে নিশ্চিন্ত করবার জন্যে বললেন–না হে না, আমি গুণ্ডা লাগাতে যাব কেন? তুমি শুধু ওকে বলবে যে, চরিত্রহীন বই বেরোনোর পর শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নামে বাজারে খুব দুর্নাম, লোকে অকথ্য কুকথ্য গালিগালাজ করছে। এতেই শেষ নয়। সিটি কলেজের ছেলেরা মারমুখখা হয়ে বলছে যে, সমাজে সাহিত্যের নামে দুর্নীতি প্রচারকারী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাপের নাম ভুলিয়ে দেবে। আসল শরৎচন্দ্রকে তো ওরা হাতের কাছে পাবে না, তার কোন চালচুলো নেই। কখন কোথায় থাকে তার হদিস পাওয়া ভার। নকল শরৎ চন্দ্র খাস কলকাতার পুরনো বাসিন্দা, ওকে পেতে কতক্ষণ। পৈত্রিক নামটার চেয়ে পৈত্রিক প্রাণটার দাম অনেক বেশি–এই কথাটাই ওকে ভাল করে বুঝিয়ে বল।
অবিনাশদা বুঝে গেলেন শরৎবাবুর কাছে এ-বিষয়ে পরামর্শ নিতে আসাই ভুল হয়েছে। লেখক শরৎচন্দ্র আর ব্যক্তি শরৎচন্দ্র দুই ভিন্ন সত্তার মানুষ। সাহিত্যকর্মে শরৎবাবুর নিষ্ঠা, সততা ও সংগ্রামী-চিত্ত সদাজাগ্রত কিন্তু ব্যক্তিজীবনে মানুষটি মুখচোরা, লাজুক ও নিস্পৃহ ঔদার্যের প্রতীক। অবিনাশদা হাল ছেড়ে দিলেন। নিজেই দেখা করে এ-বিষয়ে একটা ব্যবস্থা করার সংকল্প নিয়ে শরৎবাবুর কাছ থেকে সেদিন বিদায় নিলেন।
সাতদিন বাদেই অবিনাশদা আবার শরৎবাবুর কাছে এসে হাজির, মুখে হাসি আর ধরে না।
শরৎবাবু বললেন–কি হে অবিনাশ, খুব যে খুশি-খুশি ভাব। কিছু একটা সুখবর আছে নিশ্চয়।
অবিনাশদা বললেন–তা আছে বইকি। চাঁদমুখ শরৎচন্দ্রকে রাজী করিয়েছি।
—কি রাজী করালে? নাম পালটে ফেলবে তো?
–পৈত্রিক নাম কি কেউ পালটাতে চায়? ও-প্রস্তাবে একেবারেই রাজী হল না। শেষকালে আপনার পরামর্শ টা প্রকারান্তরে বলতেই কাজ হল।
অবাক হয়ে শরৎবাবু বললেন–আমি আবার তোমাকে কোন্ পরামর্শ দিলাম।
–ওই যে মারপিটের পরামর্শ। কথাটা ওভাবে না বলে একটু ঘুরিয়ে বললাম। চরিত্রহীন বই লেখার পর লেখকের সম্পর্কে চারিদিকে যে দুর্নাম বটছে তাতে কান পাতা যাচ্ছে না এবং চঁদমুখ বিদূষক-এর মত ভাল-ভাল উপন্যাস লেখা সত্ত্বেও কেন উনি এই দুর্নামের ভাগী হতে যাবেন।
শরৎবাবু হাসতে হাসতে বললেন–মোক্ষম দিয়েছ। দুর্নামের ভয় কার বা নেই। যাক, তা চাঁদমুখ চাটুজ্যে কি বললেন।
–বলবেন আবার কি, একেবারে জল। এতক্ষণ যে-প্রস্তাব দিই, এক উত্তর–না, ওসব হবে না। আর কি মেজাজ, যেন উনি বই লেখার আগে আপনি বই লিখে মস্ত অপরাধ করে ফেলেছেন। অবশেষে, যেই দুর্নামের কথাটি বলা অমনি কেঁচোটি হয়ে গেলেন।
শরৎবাবু এতক্ষণ আরামকেদারায় গা এলিয়ে দিয়ে আপনমনে গড়গড়া টানছিলেন। নলটা মুখ থেকে সরিয়ে কেদারায় টান হয়ে উঠে বসেই বললেন–প্রস্তাবটা কি দিলে শুনি?
প্রস্তাব আমাকে আর দিতে হয় নি, নিজেই দিলেন। অনুনয়ের সুরে বললেন–পৈত্রিক নামে কয়েকটা উপন্যাস লিখে ফেলেছি, বিক্রিও মন্দ হচ্ছে না। এখন নাম বদলে নতুন বই লিখলে তো আর লোকে ছেলেই না। চাঁদমুখ উপন্যাসটাই আমার বেশী বিক্রি হয়েছে। আমি তাই ভাবছি আমার নামের আগে চাঁদমুখ কথাটা বসিয়ে দিলে পাঠকদের বুঝতে অসুবিধা হবে না।
শরৎবাবু শুনে বললেন–বাঃ, বেড়ে উপায় বাতলেছেন। তার মানে আমাকেও আমার নামের আগে চরিত্রহীন বসাতে হবে নাকি?
অবিনাশদা অভয় দিয়ে বললেন—সে ভয় আপনার নেই। যেই উনি নামের আগে চাঁদমুখ বসাবার প্রস্তাব করলেন সঙ্গে সঙ্গে আমি বললাম—সেটা কি ভাল দেখাবে? আমার কথাটা শুনেই একটু থমকে থেমে বললেন–ঠিকই বলেছেন অবিনাশবাবু। এক গাল দাড়িভর্তি এই মুখকে চাঁদমুখ বললে লোকে পরিহাস করবে। তার চেয়ে আমার সদ্য প্রকাশিত বই বিদূষক নামটা বরঞ্চ দেওয়া যাক। আমার চেহারার সঙ্গে ওনামটা মানাবে ভালো। এ-প্রস্তাবটা তারিফ করে আমি বললাম—তা হলে আরেকটা কাজ করুন। উপন্যাসের টাইটেল পেজ-এর আগে আর্ট পেপারে আপনার একটা ফটো ছেপে দিন। তাহলে আর কোনও পাঠকের ভুল বোঝার কোন অবকাশ থাকবে না।
