শরৎবাবু খুশী হয়ে বললেন–হে অবিনাশ, যতটা ভাল মানুষ সেজে থাক ততটা তুমি নও। শয়তানী বুদ্ধিটা তো সময় বিশেষে ঠিক মাথায় খেলে যায়।
অবিনাশদা বললেন—এতকাল আপনার শাগরেদি করছি, একেবারে কিছুই কি পাই নি মনে করছেন?
শরৎবাবু গড়গড়ায় নলটা মুখে তুলে নিয়ে বেশ কয়েকটা টান দিলেন, কঙ্কের টিকে গনগনে হয়ে উঠল। এক গাল ধোঁয়া ছেড়ে বললেন–তাহলে তোমার কথাটায় রাজী হয়ে গেলেন, কি বল অবিনাশ।
অবিনাশদা বললেন–বইয়ের গোড়ায় ফটো ছাপার প্রস্তাবটা ওঁর খুবই মনঃপূত কিন্তু একটা সর্তে। আপনারও ফটো ছাপতে হবে। ওঁর বক্তব্য হচ্ছে চাদমুখের লেখক শরৎচন্দ্র ও চরিত্রহীনের লেখক শরৎচন্দ্র যে দুই ভিন্ন ব্যক্তি তা পাঠকদের ভাল করেই জানিয়ে দেওয়া প্রয়োজন।
কথাটা শুনেই শরৎবাবুর মুখ থেকে গড়গড়ার নলটা খসে পড়ল। বিস্ফারিত চোখে শরৎবাবু বললেন–বল কি অবিনাশ! ওঁর কথায় আমার ফটোগ্রাফ ছাপতে হবে? আর তুমি এ-কথায় সায় দিয়ে এলে?
অবিনাশদা বললেন–না, বইয়ে ছাপার কথায় আমি রাজী হই নি। তবে বলেছি, বাতায়ন পত্রিকায় আর্ট পেপারে আপনার ছবি ছেপে জানিয়ে দেব যে, আপনি চরিত্রহীন উপন্যাসের লেখক শরৎচন্দ্র।
কথাটা শুনে শরৎবাবু খানিকটা আশ্বস্ত হলেন। কিন্তু তার পরেই অবিনাশদা যে-কথা বললেন–তা শুনে শরৎবাবু স্তম্ভিত।
অবিনাশদা বললেন–আপনার এই ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি বর্জন করতে হবে।
গুম হয়ে বসে রইলেন শরৎবাবু। চিন্তিত মুখে গড়গড়ার নলটা তুলে নিয়ে দুটো টান দিলেন, ধোঁয়া বেরলো না। কল্কের আগুন নিবে কখন ছাই হয়ে গেছে। শরৎবাবু তখন ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি রাখতেন, তার একটা কারণও ছিল। শরৎবাবু ছিলেন মনেপ্রাণে ফরাসী মেজাজের মানুষ। ওঁর জীবনচর্যায় ফরাসী বোহেমিয়নিজম-এর মিল ছিল। ফরাসী লেখক এমিল জোলা ছিলেন ওঁর গুরু। রবীন্দ্রনাথের চোখের বালি যতবার উনি পড়েছেন, ততবারই পড়েছেন জোলার বিখ্যাত উপন্যাস মাদাম রাক্ট। শোনা যায়, এমিল জোলা ওঁর সাহিত্যিক-জীবনে এত বেশি প্রভাব বিস্তার করেছিল যে, জোলার অনুকরণে ফেঞ্চ-কাট দাড়ি পর্যন্ত রেখেছিলেন। বহুদিনের সযত্ন সেই শখের দাড়ি আজ বর্জন করতে হবে? শরৎবাবু সেই যে মুখ বুজলেন আর খুললেন না। দূর অকাশের দিকে উদাস দৃষ্টি মেলে চুপচাপ বসে রইলেন। কোন প্রতিবাদ যখন নেই তখন অবিনাশদা বুঝে গেলেন যে, এতে ওঁর সম্মতি একেবারে নেই তা নয়। বেদনাসিঞ্চিত নীরবতাই সম্মতি জানাচ্ছে। আর কোন কথার অবতারণা না করেই অবিনাশদা নিঃশব্দে চলে এলেন।
এই ঘটনার মাসখানেক বাদেই চঁাদমুখের লেখক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নতুন উপন্যাস প্রকাশিত হল কণকাঞ্জলি। টাইটেল-পেজ-এর সামনে আর্ট পেপারে পূর্ণ পৃষ্ঠা ফটোগ্রাফি ছাপা হয়েছে, তলায় লেখা আছে—শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। (জুনিয়র)।
সেই সপ্তাহেই বাতায়ন পত্রিকায় আর্ট পেপারে শরৎচন্দ্রের ছবি ছাপা হল, তলায় লেখা ছিল চরিত্রহীন উপন্যাসের লেখক শ্ৰীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বলাই বাহুল্য, ফ্রেঞ্চ-কাট দাড়ি বর্জিত ছবিই ছাপা হয়েছিল।
চাঁদমুখ উপন্যাসের লেখক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নাম অজি বাংলা সাহিত্য থেকে চিরকালের জন্যে হারিয়ে গিয়েছে। মাঝে মাঝে ওঁর নাম উচ্চারিত হয় গল্পলহরী পত্রিকার সম্পাদকরূপে, আর একই নামে দুই সাহিত্যিকের প্রসঙ্গ উঠলে। আজকের বৈঠকের আলোচনায় আমাকে যা করতে হল। কিন্তু আমি জানি, উঁদমুখ উপন্যাস রচয়িতা শরৎচন্দ্র জাত-লেখক ছিলেন। উপন্যাস রচনায় তিনি পাকা হাতের পরিচয় দিয়েছিলেন, কিন্তু এমনই দুর্ভাগ্য যে, পাঠকদের কাছে অজ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (জুনিয়র) সম্পূর্ণ বিস্মৃত লেখক। কোন দোকানে ওঁর বই পাওয়া যায় না, লাইব্রেরীতেও নয়। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-লেখকরা তাদের কোন গ্রন্থের এক কোণায় এতটুকু ঠাঁই ওঁকে দেন নি। জাতীয় গ্রন্থাগারে চাঁদমুখ বইখানি বহুবার ই হয়েছে দেখা যায়। তার কারণ বইটি বাঁধিয়ে রাখা হয়েছে, পাঠকরা আসল শরৎচন্দ্রের বই মনে করেই ইসু করান। চাদ মুখের লেখকের উপন্যাস রচনার শক্তি ছিল, শক্তির পরিচয় দিয়েছিলেন। কিন্তু এক আকাশে দুই চন্দ্র কখনও ওঠে না। চরিত্রহীনের লেখক যখন বাংলা সাহিত্যের আকাশে পূর্ণ জ্যোতি নিয়ে উদ্ভাসিত, তখন সেই আকাশেরই এক প্রান্তে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্করূপে ক্ষণকালের জন্য দেখা দিয়েই চাঁদমুখের লেখক শরৎচন্দ্র ম্লান হয়ে মিলিয়ে গেলেন। এ ট্র্যাজেডী লেখনীর অক্ষমতার জন্য নয়। এক নামের যশ খ্যাতি ক্ষমতা আরেক নামকে ম্লান নিষ্প্রভ করে দেবার এ-এক নির্মম দৃষ্টান্ত। ট্র্যাজেডী এই খানেই।
২০. শনিবার বিকেলে ধুনি জ্বালিয়ে বসে আছি
শনিবার বিকেলে ধুনি জ্বালিয়ে বসে আছি আড্ডাবাজরা কে-কখন আসবেন তারই অপেক্ষায়। দিল্লি অনেক দূর। সেখান থেকে পঞ্চতন্ত্রের লেখা ঠিক সময়ে হাতে এসে না পৌঁছলেই চিত্তির। চোখে সর্ষে ফুল, এ-সপ্তাহে লেখা বুঝি বাদ গেল। বসে গেলাম চিঠি লিখতে, জোর তাগিদের চিঠি। সৈয়দদার ওই এক দোষ। নিত্যনিয়মিত তাগাদার তাওয়া গরম না রাখলে ওঁর হাতের আঙ্গুল চলে না, কলমের কালি বরফ। অগত্যা চিঠির কাগজ টেনে নিয়ে বসে গেলাম লিখতে। উপরোধ, অনুরোধ, উষ্ম, অভিমান সব কিছুর মসলা ঢেলে চিঠিটা যখন প্রায় বাগিয়ে এনেছি, এমন সময় গাল্পিক সাহিত্যিকের প্রবেশ।
