গল্পলহরীর সম্পাদক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় শুধু পত্রিকা-সম্পাদনা নিয়েই সন্তুষ্ট রইলেন না, উপন্যাস লিখতে শুরু করলেন এবং পর পর তিনটি উপন্যাস বাজারে ছাড়লেন, চাঁদমুখ, হীরক দুল ও শুভলগ্ন।
আসল শরৎবাবু প্রথমে ব্যাপারটা কানেই তুললেন না। প্রকাশক হরিদাস চাটুজ্যে এসে একদিন শরৎবাবুকে বললেন–
ওহে শরৎ, এর একটা কিছু বিহিত কর। তোমার নাম ভাড়িয়ে আরেক শরৎ চাটুজ্যে যে বাজারে বই ভালই কাটিয়ে দিল।
এসব নিয়ে ঝাট করা শরৎবাবুর প্রকৃতিই নয়। উনি শুধু বললেন–আমার পাঠকরা ভাল করেই জানে যে, আমার কলম দিয়ে ওরকম ধোয়া তুলসী পাতা উপন্যাস বেরোবে না। ওরা বই পড়ে বুঝে নেবে কে খাঁটি আর কে ভেজাল।
শরৎবাবুর এ-যুক্তি হরিদাস বাবুর মনঃপুত হল না। উনি পাকা ব্যবসাদার মানুষ। বললেন–
সেই খাঁটি আর ভেজাল ধরা পড়বার আগেই যে বাজারে দু-তিন হাজার ভেজাল মাল কেটে যাবে। সেটা তো তোমারই লোকসান।
লাভ কোকসানের কথাটায় কোন গুরুত্ব না দিয়ে শরৎবাবু বললেন–ওসব ব্যাপারে মাথা ঘামানো আমার কাজ নয়, ওটা আপনাদের কাজ। আপনারাই করুন।
মাস খানেক যেতে-না-যেতেই শরৎবাবুকে মাথা ঘামাতেই হল। একদিন সকালে বাতায়ন পত্রিকার সম্পাদক অবিনাশ ঘোষাল শরৎচন্দ্রের বাড়িতে ছুটে গিয়ে বললেন–দাদা আপনি তো এখানে বেশ নির্বিকার চিত্তে বসে আছেন। ওদিকে যে সর্বনাশ হয়ে গেল।
বাতায়ন সম্পাদক অবিনাশদার এখানে একটু পরিচয় দিয়ে রাখতে চাই। অবিনাশদা ছিলেন শরৎচন্দ্রের অনুজপ্রতিম স্নেহের পাত্র। শুধু তাই নয়, শরৎচন্দ্রের নিঃসঙ্গ জীবনে অবিনাশদা ছিলেন অন্যতম বিশ্বস্ত হিতাকাঙ্ক্ষী বন্ধু ও সখা। একমাত্র অবিনাশদার কাছেই শরৎবাবু নিজের ব্যাক্তিগত জীবনের সুখ-দুঃখের কথা অকপটে বলতেন। অবিনাশদার সঙ্গে শরৎচন্দ্রের এই অন্তরঙ্গতা অনেকের কাছে ঈর্যার কারণও হয়েছিল, অনেকে আবার ঠাট্টা বিদ্রুপও করতেন। এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনা বলার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না, পূর্বাহ্নেই আমি তার জন্য অবিনাশদার কাছে মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি।
শরৎচন্দ্রের একটি অত্যন্ত প্রিয় দেশী কুকুর ছিল, তার নাম দিয়েছিলেন ভেলি। বড় আদরের কুকুর। হাওড়ায় শিবপুরের বাড়িতে একা থাকতেন, ভেলি ছিল ওঁর নিত্য সহচর। ভেলির প্রতি শরৎবাবুর এই সন্তানবৎ স্নেহ ও দুর্বলতার কথা কলকাতার সাহিত্যিক সমাজে অজানা ছিল না। ভেলিকে তাই অনেকেই শরৎবাবুর পোয্যপুত্র বলে অভিহিত করতেন।
সেই ভেলি কয়েকদিনে অসুখে ভুগেই হঠাৎ মারা গেল। শরৎবাবু সন্তান বিয়োগসদৃশ ব্যাথায় মুহ্যমান। খবর পেয়ে কলকাতা থেকে অনেকেই এই নিদারুণ শোকে সান্ত্বনা দেবার জন্য শিবপুর গেলেন, অনেকে চিঠি লিখলেন। শুধু আমাদের বিখ্যাত শিবরাম চক্রবর্তী, যাকে শনিবারের চিঠি তারই অস্ত্রে চিরকাল শিবRAM লিখে আঘাত দিয়ে এসেছে, পানোন্মত্ত হয়ে (মাতাল অর্থে নয়, শব্দের pun পেলে যিনি উন্মত্ত হয়ে ওঠেন) দু-লাইনের এক ছড়ায় শরৎচন্দ্রকে এই সান্ত্বনাবাণী পাঠালেন—
ভেলির বিনাশ নাই,
ভেলি অবিনাশ।
সেই অবিনাশ ঘোষাল শরৎবাবুকে বললেন—দাদা আপনি করছেন কি। আপনার অনুরাগী পাঠকরা আপনার লেখা বই মনে করেই দোকান থেকে চাঁদমুখ কিনে নিয়ে পড়ছে এবং পড়ার পর চারিদিকে বলে বেড়াচ্ছে—এরই মধ্যে শরৎ চাটুজ্যে একেবারে গেঁজে গিয়েছে। এসব কথা শুনতে কি আমাদের ভালো লাগে?
শরৎবাবু এবার সত্যিই চিন্তিত হয়ে পড়লেন। লোকের মুখে-মুখে এরকম যদি একটা কথা রাষ্ট্র হয়ে যায়, সাহিত্যিকের পক্ষে তার চেয়ে বড় ক্ষতি ও অপমান আর কিছু নেই। শরৎবাবু ভাল করেই জানেন যে, জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বহু মানবচরিত্র তিনি দেখেছেন। সমাজ নিপীড়িত সেই-সব মানুষের নীরব চোখের জলে যে অভিশাপ এতকাল বষিত হয়ে এসেছে, তার কতটুকুই বা তিনি তাঁর সাহিত্যকর্মের মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন, এখনও যে অনেক বাকি রয়েছে বলবার। সুতরাং অবিনাশদার কথাকে সহজে উড়িয়ে দিতে পারলেন না। বললেন–তুমিই বল অবিনাশ, এ ক্ষেত্রে আমার কি করণীয়।
অবিনাশদা গভীর চিন্তায় পড়ে গেলেন। তাই তো, কী করণীয়। কাগজে একটা বিবৃতি দিলে কেমন হয়। তাতেও বিপদ, বিনা খরচায় নকল শরৎ চাটুজ্যের পাবলিসিটি হয়ে যাবে, ফলে ওর বইয়ের বিক্রি যাবে বেড়ে। পাঠকদের কৌতূহলের তো মাথামুণ্ডু নেই, দেখাই যাক নকল শরৎচন্দ্র আসলের উপর টেক্কা মারতে পেরেছে কি না। অতএব কেনো বই।
অনেক চিন্তা ভাবনার পর অবিনাশদা বললেন–দাদা, সব চেয়ে ভাল হয় আপনি নিজে একবার ওঁর সঙ্গে দেখা করে ওঁকে বুঝিয়ে বলুন একটা ছদ্মনাম নিয়ে বই লিখতে।
চোখ বড় করে শরৎবাবু অবিনাশদার দিকে তাকিয়ে বললেন–বল কি হে, আমি যাব ওর কাছে? তাহলে তো ও যা চেয়েছিল তাই হবে। যাওয়া মাত্রই উল্লসিত হয়ে বলবে-পথে আসুন। গল্পলহরীতে লেখা দিলেই নাম পালটে ফেলব। আমার উপর ওর রাগ, আমি বাতায়ন পত্রিকায় মাঝে-সাঝে লিখি অথচ ওর কাগজে একেবারেই লিখি না।
কথাটা শুনে সরলমতি অবিনাশদা অবাক হয়ে গেলেন। এও কি কখনও সম্ভব? কোন দায়িত্বসম্পন্ন সম্পাদক এমন কাজ করতে পারে? শরৎবাবুর অবিশ্বাস্য কথাটা হেসে উড়িয়ে দিয়ে অবিনাশদা বললেন–এ কি বলছেন দাদা। আপনার এই অনুমান ঠিক নয়। আপনি একবার ওঁর সঙ্গে দেখা করে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলুন, আপনার কথা উনি ফেলতে পারবেন না।
