–মন্ত্ৰপড়া স্ত্রী নয়, সে আমার আশ্রিতা।
এবার প্রচণ্ড ধমক দিয়ে কমলনয়ন বললেন–চোপরাও বদমাশ। আশ্রিতা নয়, রক্ষিতা। একটা রক্ষিতাকে নিয়ে আমার বাড়িতে এসে উঠেছ, আগে সে-কথা আমাকে বল নি কেন?
–তোমার সংস্কারে বাধতো বলেই বলি নি।
রাগে ফেটে পড়লেন কমলনয়ন–তুমি আমার বাল্যবন্ধু হয়ে আমার সঙ্গে শঠতা করেছ, মিথ্যাচার করেছ, আমার ঐতিহ্য মর্যাদা সংস্কৃতির মূলে আঘাত দিয়েছ, আমার বাড়ি অপবিত্র করেছ। এই মুহূর্তে ওই মেয়েমানুষটাকে নিয়ে তুমি আমার বাড়ি ছেড়ে চলে যাও, আমি তোমার মুখদর্শন করতে চাই না।
কমলনয়ন বিষ্ণুচরণের আর কোন কথা শোনবার অপেক্ষা না করেই দ্রুত হনহন করে দোতলার সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেলেন।
পরদিনই দেখা গেল এক ফার্নিচারওয়ালা একতলার ঘরের সব আসবাবপত্র লরী বোঝাই করে নিয়ে গেল। একদল রাজমিস্ত্রী এসে ঘর দুটোর দেয়াল আর ছাতের সব পলেস্তারা খুলে ফেলে চুন-সুরকি দিয়ে নতুন পলেস্তারা লাগাল। মেজের সিমেন্ট খুড়ে ফেলে নতুন সিমেন্ট এনে আবার মেজে তৈরি হল। কলকাতার সেরা কীর্তনের দল এনে অষ্টপ্রহরব্যাপী নাম-কীর্তনের ব্যবস্থা হল—অপবিত্র ঘর দুটো পবিত্র করে কমলনয়ন নিশ্চিন্ত হলেন।
শরৎবাবুর বাল্যবন্ধু গল্পটা এইখানেই শেষ করে সপ্রশংস দৃষ্টিতে শরৎবাবুর দিকে তাকালেন। শরৎবাবু অসীম ধৈর্যের সঙ্গে নীরবে গল্পটি শুনছিলেন, শোনা শেষ হলেও কোন মন্তব্য করলেন না, চুপ করে বসে আলবোলায় তামাক টানতে লাগলেন।
বন্ধু ছাড়বার পাত্র নন। বললেন—কিরে ল্যাড়া, কী রকম মনে হল?
এবার শরৎবাবু মুখ খুললেন। বললেন–ভালই তো মনে হল। তবে গল্পের শেষটা আমি হলে অন্যরকম করতাম।
কৌতূহলের সঙ্গে বাল্যবন্ধু জিজ্ঞাসা করলেন—কি করতিস শুনি?
গম্ভীরভাবে শরৎবাবু বললেন–আমি হলে পলেস্তারা বদলানো নয়, সমস্ত বাড়িটা রাতারাতি ভেঙ্গে ধুলিসাৎ করে দিতাম। শুধু তাই নয়, বহু কুলিমজুর লাগিয়ে বাড়িটার ভিত খুড়ে জমির মাটি কেটে একটা মস্ত পুকুর তৈরি করে শ্বেত পাথরের ঘাটলা বাঁধিয়ে দিতাম এবং সেই ঘাটের প্রত্যেক সিঁড়িতে লাল পাথরে লিখিয়ে দিতাম সতীলক্ষ্মীর ঘাট। পাড়ার কুললক্ষ্মীরা সেই ঘটে স্নান করে পুণ্য অর্জন করত।
বিমূঢ় দৃষ্টিতে শরৎবাবুর দিকে তাকিয়ে বাল্যবন্ধু বললে-অতবড় দোতলা বাড়িটাকে ভেঙ্গেচুরে পুকুর বানিয়ে ফেলতিস? সে কি কখনও হয়?
শরৎবাবু বললেন–কেন হবে না বল। আরে, ওই বাড়িও তোর আমার নয়, জমিও তোর আমার নয়। হাতে যখন কলম আছে তখন সেই কলমের এক খোঁচায় বাড়ি ভাঙ্গতে কতক্ষণ আর পুকুর কেটে ঘাট ধাঁধাতে কতক্ষণ।
১৯. একই নামের দুই লেখক
একই নামের দুই লেখক মাঝে-মাঝে বাংলা সাহিত্যে আবির্ভূত হয়ে পাঠকদের কিরকম বিভ্রান্ত করে তোলে তার পরিচয় সকলেরই কিছু-কিছু জানা আছে। বিশেষ করে যিনি অগ্রজ-সাহিত্যিক, বয়সের হিসাবে নয়, সাহিত্যরচনায় যিনি আগে আবির্ভূত হয়েছেন এবং প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন, তার দুর্ভাগ্যটা একবার অনুমান করে দেখুন। তাঁর উপন্যাসের যখন বাজারে প্রচুর কাটতি তখন সেই একই নামে আরেক নকল লেখক একখানি উপন্যাস নিয়ে দেখা দিলেন। নকল লেখকের লেখার সুখ্যতি এবং কুখ্যাতি দুই-ই আসল লেখকের উপর গিয়ে বর্তায়। অকারণে অন্যের বোঝা কে বহন করতে চায়। কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েই হোক বা পুস্তক বিক্রেতাদের দোকানেদোকানে ঘুরেই হোক নকল লেখকের, স্বরূপ উদঘাটন করবার আগেই নামভক্ত পাঠকদের বোকা বানিয়ে দু-এক এডিশন বই বিক্রি করে কিছু টাকা নিজের ঘরে তুলে, কিছু অপযশ আসল লেখকের ঘাড়ে চাপিয়ে সাহিত্য থেকে চিরকালের মত বিদায় নেন। সাহিত্যে এ ধরনের অসাধুতা মাঝেমাঝেই ঘটে থাকে এবং এরও পিছনে কোন-কোন পুস্তক প্রকাশকের প্রচ্ছন্ন হাত নিশ্চয় থাকে। তা না হলে জেনে শুনে তারা একই নামের আরেক অখ্যাত লেখকের বই প্রকাশ বা বিক্রি করবেন কেন। এখানেও সেই অসাধু উপায়ে মুনাফা শিকারের লোভ।
বিখ্যাত ঔপন্যাসিক আরোগ্য নিকেতন-এর লেখক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে বেশ কিছুকাল এক নকল তারাশঙ্করের অবির্ভাবে অতিষ্ঠ হয়ে তার যাবতীয় নৃতন বই আর পুরনো বইয়ের পুনর্মুদ্রণকালে এক দীর্ঘ ভূমিকা জুড়ে দিয়ে দুঃখের সঙ্গে ঘোষণা করতে হল—শ্রীময়ীর লেখক শ্ৰীতারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় শ্রীময় থাকুন, আমি এখন হইতে শ্রীহীন হইলাম। সেই থেকে অদ্যাবধি তিনি তার নামের আগে শ্রী ব্যবহার করেন না।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ঐ বর্জন করে এই সমস্যার একটা সমাধান করেছিলেন বটে কিন্তু শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এত সহজে রেহাই পান নি, তাঁকে দাড়ি বর্জন করতে হয়েছিল। এই ঘটনা নিয়ে একটি গল্প প্রচলিত আছে, সেইটিই আজ আপনাদের কাছে বলতে বসেছি।
শরৎবাবুর তখন চরিত্রহীন উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। নিন্দা ও প্রশংসায় বাংলা সাহিত্যে আলোড়ন দেখা দিয়েছে, পাঠকদের মুখে মুখে শরৎবাবুর নাম। এই সময়ে হঠাৎ আরেক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এসে দেখা দিলেন গল্পলহরী নামে ছোট গল্পের এক মাসিক পত্রিকার সম্পাদক রূপে। তখনকার দিনে নবীন লেখকদের গল্পলহরী ছিল আত্মপ্রকাশের একমাত্র পত্রিকা এবং আজকের দিনের একাধিক খ্যাতিমান লেখক সেদিন গল্পলহরীতে ছোটগল্প লিখে হাত পাকিয়েছিলেন। এই সুযোগে আপনাদের কাছে চুপিচুপি একটা কথা কবুল করে নিচ্ছি-সম্পাদকের বৈঠকের লেখকেরও দুর্মতি হয়েছিল। তার কৈশোর-যৌবনের সন্ধিকালে মফস্বল থেকে একটি ছোটগল্প লিখে গল্পলহরীতে পাঠিয়েছিলেন এবং তা প্রকাশিতও হয়েছিল। সুখের বিষয় সেইটিই প্রথম ও শেষ। গল্পলহরীর তখন মুম্ষু অবস্থা, পরের মাস থেকেই পত্রিকা চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।
