একদিন সকালে একতলার লাইব্রেরী ঘরে বসে একরাশ বই নিয়ে কমলনয়ন নোট নিতে ব্যস্ত, সপ্তদশ শতাব্দীতে বাংলার নৌ-বাণিজ্য নিয়ে তাকে একটা থসিস্ তৈরী করতে হচ্ছে। এমন সময় চাকর এসে বললে, দেশ থেকে একজন দেখা করতে এসেছে। লাইব্রেরী ঘরেই ডেকে পাঠালেন তাকে।
বলিষ্ঠ চেহারার একটি যুবক এসে ঘরে প্রবেশ করতেই কমলনয়ন বই পত্র ফেলে চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে উৎফুল্ল কণ্ঠে বললেন–আরে, বিষ্ণুচরণ, তুমি? এস এস, কতকাল বাদে তোমার সঙ্গে দেখা। বলতে বলতে এগিয়ে এসে দুই হাত প্রসারিত করে তার বাল্যবন্ধু বিষ্ণুকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
বিষ্ণু বললে-তুমি তো আমাকে ঠিক চিনতে পেরেছ। ভয় ছিল গ্রামকেই যে ভুলে গেছে, আমাকে কি সে আর মনে রাখবে?
কমলনয়ন বললে-গ্রামকে ভুললেও তোমাকে কোনদিনও ভুলব না ভাই। শৈশবস্মৃতি কি কেউ কখনও ভুলতে পারে? কিন্তু কোথায় উঠেছ? কি মনে করে কলকাতায় এলে?
বিষ্ণু বললে কোথাও এখনও উঠি নি, সোজা শিয়ালদা থেকে তোমার সঙ্গে দেখা করতেই এসেছি। এখন বেশ কিছুকাল কলকাতাতেই আমাকে থাকতে হবে।
খুশী হয়ে কমলনয়ন বললেন—খুবই আনন্দের কথা। ভালই হল। এতবড় বাড়িতে আমি একা থাকি, আজ থেকে তুমিও থাকবে। কই, তোমার জিনিসপত্র কোথায়? চল চল ওপরে চল।
কিন্তু-কিন্তু করে বিষ্ণুচরণ বললে-আমার সঙ্গে আমার ইয়ে-ও এসেছেন—
ব্যস্ত হয়ে কমলনয়ন বললেন–বউকে নিয়ে এসেছ বুঝি। কোথায়, কোথায় তিনি, বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছ?
না, ঘোড়ার গাড়িতে বসিয়ে রেখে এসেছি। তোমার দেখা পাব কি পাব না আগে তো বুঝতে পারি নি।
ধমকের সুরে কমলনয়ন বললেন–আমার কাছে তোমার সংকোচ কি হে, তা ছাড়া তোমার আক্কেলটাই বা কি রকম। বউকে গাড়িতে বসিয়ে রেখেছ? যাও যাও, তাকে ডেকে নিয়ে এস। হরিচরণ, এই হরিচরণ, শিগগির গাড়ি থেকে জিনিসপত্র নামা।
হইচই বাধিয়ে দিলেন কমলনয়ন। হাঁক-ডাকে বাড়িময় চাকরবাকরদের ছুটোছুটি পড়ে গেল। চিবুক পর্যন্ত অবগুণ্ঠনাবৃতা একটি স্বাস্থ্যবতী তরুণী বিষ্ণুচরণের পিছনে পিছনে গাড়ি থেকে নেমে আসতেই কমলনয়ন বললেন–নমস্কার বউঠান। হতভাগা বিষ্ণুটা বিয়ে করল, অথচ আমাকে নেমন্তন্ন করে খাওয়ালোও না। এবার তার শোধ তুলব আপনার হাতের শাক-চচ্চড়ি খেয়ে। কতকাল যে দেশের রান্না খাই নি।
বিষ্ণুর দিকে আড় চোখে চেয়ে ফিসফিস করে বললেন—খাসা বউ হয়েছে ভাই। তুমি ভাগ্যবান। তার পরেই কমলনয়ন বিষ্ণুর হাত ধরে একতলার লাইব্রেরী ঘরটার পাশে যে দুটো ঘর খালি ছিল সে ঘরে নিয়ে গিয়ে বললেন–এ দুটো ঘর সব সময় খালিই পড়ে থাকে। এখন থেকে স্বচ্ছন্দে তোমার বউ নিয়ে তুমি থাক, আমি খুব খুশী হব।
বিকেলে গাড়ি করে বিষ্ণুচরণকে নিয়ে নিউ মার্কেট থেকে জানলা-দরজার দামী পর্দা কিনলেন, তাছাড়া ঘর সাজানোর টুকিটাকি আরও অনেক কিছু গাড়ি বোঝাই করে কিনে এনে বিচরণের বউয়ের কাছে দিয়ে বললেন–বউঠান, আপনার মনের মত করে ঘর-দোর সাজিয়ে নিন। যখন যা-কিছু প্রয়োজন আমাকে জানাতে কিছুমাত্র সঙ্কোচ বোধ করবেন না।
বিষ্ণুচরণ বললেন–দেখ কমলনয়ন, তোমার বউঠানের ইচ্ছে আমাদের দুজনের রান্নাবান্নাটা উনি নিজেই করে নেন। তুমি আমাদের থাকবার জায়গা দিয়েছ, এতেই আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। এর পরে আর তোমার উপর বোঝা চাপাতে চাই নে।
ক্ষুণ্ণ হয়েই কমলনয়ন বললেন—আমি তোমার বাল্যবন্ধু। আমাকে তুমি পর মনে করছ কেন ভাই। আমার এখানে ডাল-ভাত যা হয় সবাই সমান ভাগ করে খাব। তাছাড়া বউঠানও মাঝে মাঝে রান্না করে আমাদের খাওয়াবেন বই কি। আমার এখানে বামুন ঠাকুর রান্না করে, মুসলমান বাবুর্চি নয়। সুতরাং জাত যাবার ভয় নেই।
বিষ্ণুচরণ লজ্জায় পড়ে বললে-ওসব ভেবে তোমাকে ও কথা বলি নি। যাক, তুমি যখন ক্ষুণ্ণ হচ্ছ তখন তোমার কথায় আর আমরা আপত্তি করব না।
আনন্দেই দিন কাটতে লাগল। কমলনয়ন নোজই ওদের নিয়ে বেরোয়। বায়োস্কোপ, থিয়েটার, গানের জলসা, যাদুঘর, চিড়িয়াখানা ইত্যাদি নোজই একটা না একটা প্রোগ্রাম আছেই। কমলনয়নের নিঃসঙ্গ জীবন ওদের পেয়ে খুশীতে উচ্ছল হয়ে উঠল।
মাস তিনেক কেটে যাবার পর দেশ থেকে সরকার মশাই এসেছেন কমলনয়নের কাছে জমিদারী সংক্রান্ত কাজে পরামর্শ করতে। কলকাতার বাড়িতে এসে হঠাৎ বিষ্ণুচরণকে দেখে সরকার মশাই চমকে উঠলেন। কিছু
বলে সোজা দোতালায় চলে গেলেন কমলনয়নের কাছে। এক ঘণ্টাও পার হয় নি, হঠাৎ বিষ্ণুচরণ শুনতে পেল ওদের ঘরের বাইরে পরদা-দেওয়া দরজার ওপাশে ভারী জুতোর পায়চারির শব্দ। কমলনয়ন কিছু একটা বলবার জন্যে বোধ হয় বাইরে অপেক্ষা করছে মনে করে বিষ্ণুচরণ বললেএস কমলনয়ন, ভিতরে এস, বাইরে দাঁড়িয়ে কেন?
গম্ভীর গলায় কমলনয়ন বললে-ভিতরে যাবার আর আমার প্রবৃত্তি নেই। তুমি একবার বাইরে এস, একটা কথা জিজ্ঞাসা করবার আছে।
বিষ্ণুচরণ তাড়াতাড়ি বাইরে এসে দেখে কমলনয়ন স্থির দৃষ্টিতে রাস্তার দিকে তাকিয়ে। মুখে গাম্ভীর্যের ভাব, চোখে বিরক্তির চিহ্ন।
বিষ্ণুচরণের দিক থেকে মুখটা অন্য দিকে ফিরিয়ে জলগম্ভীর কণ্ঠে কমলনয়ন জিজ্ঞাসা করলেন —কথাটা কি সত্যি? সরকার মশাই যা বলেছেন?
–সরকার মশাই কি বলেছেন সেটা তো আমার জানা দরকার।
–তুমি আমাদের গ্রামের হারাণ ভটচায্যের বিধবা মেয়েকে ভাগিয়ে এনেছ?
–ভাগিয়ে আনি নি, আশ্রয় দিয়েছি।
–তোমার মুখে ওসব বড় বড় নাটক নভেলের কথা শুনতে চাই না। যাকে তুমি সঙ্গে করে এনেছ সে তোমার বিবাহিতা স্ত্রী নয়, এটা তো সত্যি।
