শৈশবে শরৎবাবু যখন ভাগলপুরে থাকতেন তখন ওঁর বন্ধুরা মিলে একটি ক্লাব করেছিলেন, তার নাম ছিল আদমপুর ক্লাব। শরৎচন্দ্র ছিলেন এই ক্লাবের একজন হো-টাইম সদস্য। থিয়েটার, খেলাধুলা, গানবাজনা, চড়ইভাতি এইসব কাজে শরৎবাবু ছিলেন পাণ্ডা আর তার সমবয়সী বন্ধুরা ছিলেন যোগানদার।
শরৎচন্দ্রের এই খ্যাতি ও প্রতিভা যখন সারা দেশব্যাশী বিস্তৃত তখনও আদমপুর ক্লাবের বাল্যবন্ধুদের মধ্যে কয়েকজন, যথা বিজয় বাড়জে, সতীশ বসু, সুকুমার মিত্র, রাজেন মজুমদার, রাজেন গাছি জীবিত। আজ তারাও বৃদ্ধ হয়েছেন কিন্তু তাদের শৈশবের বন্ধু শরৎচন্দ্রের এই খ্যাতিতে যুগপং, গর্বিত ও বিস্মিত না হয়ে পারেন নি। বন্ধুর গৌরবে গর্বিত হওয়া স্বাভাবিক কিন্তু বিস্মিত হয়েছিলেন এই কারণে যে, তাদের আদমপুর ক্লাবের সেই বাউণ্ডুলে ডানপিটে ল্যাড়ার আজ দেশজোড়া নাম, বাংলা সাহিত্যে সে আজ একজন কেউ-কেটা। শৈশবে শরৎবাবুর মাথায় একরাশ চুল থাকা সত্ত্বেও ওঁর ডাক নাম ছিল ন্যাড়া, আদমপুর ক্লাবের বন্ধুরা ওকে ল্যাড়া বলেই ডাকতেন। শরৎবাবুর তাতে কোন আক্ষেপ ছিল না। এমন একটা কুৎসিত নামকে মর্যাদা দিলেন তার ইংরেজী রূপান্তরে। সেই সময় ওঁর বই ও খাতাপত্তরে সব সময়ে উনি ইংরেজী স্বাক্ষর দিতেন St. c. Lara। যেন বেলজিয়ম বা হল্যাণ্ডের একজন পাদ্রী। ক্লাবের বন্ধুদের মধ্যে যখনই দুঃসাহসিক সুকর্ম অথবা কুকর্মের কোন প্ল্যান হত তখনই শরৎচন্দ্রকে এগিয়ে দিয়ে সবাই বলত—ল্যাড়া, তুই তো বাবা পাদ্রী আছি, লেগে যা। খলিফা অর্থে পাদ্রী কথাটার ব্যবহার অদমপুর ক্লাবেই শুরু হয়, পরে শরৎবাবুই কথাটা কলকাতায় চালু করেছিলেন।
আদমপুর ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে যারা জীবিত তাদের কয়েকজন ভাগলপুরে একজোট হয়ে স্থির করলেন কলকাতায় গিয়ে একবার তাদের বাল্যবন্ধু ল্যাড়ার সঙ্গে দেখা করতে যাবেন। যদিও আজ সে মস্ত নামী লোক তবু ছেলেবেলাকার বন্ধু যখন অনাদর করবে না।
আদমপুর ক্লাবের সভ্যরা আজ বৃদ্ধ হলে কি হবে। মাথায় যখন প্ল্যান এসেছে কার্যে পরিণত করা চাই। ক্লাবের তিনজন সভ্য পরামর্শ করে ভাগলপুর থেকে এক রবিবার সকালে সোজা চলে এলেন কলকাতায় শবাবুর বালীগঞ্জের বাড়িতে।
ছেলেবেলার বন্ধুদের পেয়ে শরৎবাবু বুকে জড়িয়ে ধরলেন। সারা সকাল ধরে গল্প আর গল্প, ছেলেবেলার দিনগুলির কথা যেন আর ফুরোতে চায় না। অতবড় সাহিত্যিকের কাছে যখন এসেছেন তখন সাহিত্য নিয়ে আলোচনা তো হবেই। বাল্যবন্ধুদের মধ্যে একজন বললেন—দ্যাখ ল্যাড়া, তুই তো অনেক লিখেছিস, আর তোর গল্প-উপন্যাস বেরলেই আমরা পড়ি। তোর গোড়ার দিকের লেখা শ্রীকান্ত প্রথম পর্ব যত ভাল এবং রিয়ালিস্টিক, তোর এখনকার বইগুলো সে-তুলনায় বড় বেশী আন-রিয়াল মনে হয়।
শরৎবাবু বললেন–তা মনে হওয়া স্বাভাবিক। একান্ত প্রথম পর্ব তো তোদের কীর্তি-কাহিনী নিয়েই লেখা, ও কি আনরিরাল হতে পারে?
আজকাল গল্প-উপন্যাস কে কিরকম লিখছে সে-প্রসঙ্গে আলোচনা শুরু হতেই বাল্যবন্ধুদের মধ্যে একজন বললে-জানিস ল্যাড়া, সেদিন একজন নতুন লেখকের লেখা একটা গল্প পড়লাম—ওয়াণ্ডারফুল। যেমন গল্পের প্লট, তেমনি কনক্লুশন। আর স্টাইল যেন হীরকদ্যুতি। আজকাল সমাজ নিয়ে প্রোগ্রেসিভ গল্প লেখার একটা ফ্যাশান হয়েছে, এ সে-জাতের লেখা নয়। যেমন হাইসিরিয়াস, তেমনি হাই-থিংকিং। তাছাড়া লেখক গল্পের মধ্যে এমন একটা মরাল তুলে ধরেছেন যা আজকের দিনের ভেঙ্গে-পড়া সমাজে শিক্ষণীয় বস্তু।
শরৎবাবুর কৌতূহল জেগে উঠল। কি এমন গল্প যে তার এত উচ্ছসিত প্রশংসা! বললেন—গল্পটা একবার মুখে-মুখে বল তো, শুনি।
উৎসাহের সঙ্গে বাল্যবন্ধু সমস্ত গল্পটা শরৎবাবুকে বলতে শুরু করলেন
পূর্ববঙ্গের সমৃদ্ধিশালী গ্রাম। গ্রামের জমিদার কৃষ্ণনয়ন রায়চৌধুরী বিত্তশালী কিন্তু সাত্ত্বিক লোক। প্রজাদের সঙ্গে চিরকালই তিনি সৌহার্দ্যের সম্পর্ক রেখে এসেছেন। তার একমাত্র পুত্র কমলনয়নকে গ্রামের ইস্কুলেই ভর্তি করে দিয়েছেন যাতে প্রজাদের ছেলেদের সঙ্গে মিলেমিশে বড় হয়ে ওঠে, সহপাঠীদের প্রতি মায়া মমতা বন্ধুত্ব কৈশোরকাল থেকেই দেখা দেয়।
স্কুলের সহপাঠী বিষ্ণুচরণ দাস চাষার ছেলে, যেমন ডানপিঠে তেমনি ফুর্তিবাজ। কমলনয়নের সঙ্গে বিষ্ণুচরণের খুব ভাব, একেবারে হরিহর আত্মা। স্কুলের বেঞ্চিতে সব-সময় পাশাপাশি বসে, মাঠে গিয়ে একসঙ্গে ঘুড়ি ওড়ায়, পুকুরে একসঙ্গে ছিপ ফেলে মাছ ধরে, পুজোর সময় যাত্রার আসরে একসঙ্গে বসে রাত জাগে।
এন্ট্রান্স পরীক্ষা একসঙ্গে পাশ করার পর কমলনয়নকে চলে যেতে হল কলকাতায় কলেজে পড়বার জন্য, বিষ্ণুচরণ থেকে গেল গ্রামেই। চাষীর বংশের ছেলে, বি-এ এমএ পাস করলে চলবে কেন। বৃদ্ধ বাপ ক-দিনই বা আর আছেন, এখন থেকেই জোত জমি চাষবাসের কাজ বুঝে নিতে হবে। কমলনয়ন যেদিন কলকাতায় চলে গেল—তিন মাইল হেঁটে স্টিমার-ঘাটায় এসেছিল বিষ্ণুচরণ বন্ধুকে বিদায় দেবার জন্যে। দুজনেরই চোখে জল।
মহানগরীতে এসে কমলনয়ন যেন মহাসমুদ্রে পড়ল। কলেজের পড়াশোনায় ডুবে রইল, অবসর সময় মেতে রইল খেলাধুলা আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়ে।
দেখতে দেখতে বেশ কয়েক বছর কেটে গিয়েছে। কমলনয়নের পিতৃ বিয়োগের পর সে জমিদারীর কাজকর্মের ভার সরকার মহাশয়ের হাতে তুলে দিয়ে বালীগঞ্জে দোতলা বাড়ি করে কলকাতাতেই থাকে। এম-এ পাস করে বাড়িতে বসেই সে গবেষণা কাজে ব্যস্ত থাকে, ওদিকে নানাবিধ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন নিয়ে অবসর সময় কাটায়। অকৃতদার হলেও কমলনয়ন উছুল নয়।
