গল্পলহরীর সম্পাদকের চিঠি পেয়েই সেদিন দুপুরে কলেজ কামাই করে চলে গেলাম ওঁর দপ্তরে। মাঝবয়েসী এক ভদ্রলোক নিবিষ্ট মনে লিখে চলেছেন, অনুমানে বুঝলাম উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি। এক বুক দাড়ি, গায়ে ফতুয়ার উপর সাদা চাদর জড়ানো।
পরিচয় দিয়ে ওঁর চিঠির কথা উল্লেখ করতেই আমার মুখের দিকে বেশ কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। বসতেও বললেন না। অবশেষে কণ্ঠে অবিশ্বাসের সুর এনে বললেন–সংস্কার নামে যে-গল্পটা পাঠিয়েছ সেটা তোমার লেখা?
আমাকে দেখে ওর মনে গল্পের লেখক সম্বন্ধে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। তখন আমার বয়েস কতই বা হবে। কলেজে সেকেণ্ড ইয়ারে পড়ি, ষোলোসতোরের বেশি নয়। গল্পটা যে আমারই লেখা সে-কথা জানিয়ে দিতে কিছুক্ষণ চুপ করে কি যেন ভাবলেন। তারপর চেয়ারে বসার ইঙ্গিত দিয়ে যে খাতায় এতক্ষণ লিখছিলেন সেটা বন্ধ করলেন, কলমটা রাখলেন টেবিলের দেরাজে।
দাড়ি পরিবৃত মুখে থমথমে গাম্ভীর্য। একটা ফাইল থেকে গল্পটা টেনে বার করে আমার হাতে দিয়ে বললেন–তোমার লেখার হাত আছে কিন্তু এসব গল্প লিখে ক্ষমতার অপব্যবহার করছ কেন?
আমি বললাম—লেখাটা কি আপনার খারাপ লাগল?
-লেখা খারাপ নয়, বিষয়বস্তুটাই খারাপ। আজকাল দেখছি একটা ফ্যাশান হয়েছে মেসের ঝি আর বিশেষ পাড়ার মেয়েমানুষ নিয়ে গল্প লেখা। তোমরা এত অল্প বয়সেই এ-সব কেন লিখতে যাও।
গল্পটা যখন ওঁর পছন্দ হয় নি তখন আর বৃথা বাক্যব্যয় করে কি লাভ। আমি তাই বললাম-তাহলে গল্পটা নিয়েই যাই।
বাধা দিয়ে বললেন—নিয়ে যেতে কে তোমায় বলছে। লেখাটা তো খারাপ নয়, একটু বদলে দিলেই গল্পের দোষটা কেটে যাবে।
-গল্পের দোষটা কোথায় সেটা যদি আমাকে বুঝিয়ে দেন
–দোষ ওই একটি জায়গায়। বাড়ির বউকে কুলত্যাগিণী করে বেশ্যাপল্লীতে আনা চলবে না। ওকে কোন দুর সম্পর্কের মাসীর বাড়ি পাঠিয়ে দাও, সেখানে বছরখানেক থাকুক। এদিকে অত্যধিক মদ্যপান করে স্বামী লিভারের রোগে শয্যাশায়ী। খবর পেয়ে স্ত্রীর প্রত্যাবর্তন এবং অমানুষিক সেবা করে স্বামীকে বাঁচিয়ে তোেলা। শেষে স্বামীর ভুল বুঝে অনুশোচনা, মিলন।
আমি বললাম-এ তো মামুলী গল্প।
—মামুলী হতে পারে তবু নীতি-বিরোধী নয়।
—আপনার ফরমুলা অনুসারে গল্প বদলাতে গেলে আমার গল্পর মূল বক্তব্যটাই ব্যর্থ হয়ে যায়। তাছাড়া গল্পের চরিত্র একরকম ভেবে পাড়া করেছি তাকে এখন এক কথায় উল্টে দিই কি করে। আর তা করতে গেলে চরিত্রগুলিকে আবার নূতন করে ঢেলে সাজতে হয়, সে তো পরিশ্রম সাপেক্ষ ব্যাপার।
–কেন? এতে পরিশ্রমের কি আছে। সহজ ব্যাপার। কলম যখন তোমার হাতে তখন সেই কলমের খোঁচায় কুলটাকে কুলবধু করতে কতক্ষণ।
গাল্পিক-সাহিত্যিক আবার থামলেন। পকেট থেকে কৌটো বার করে আরেক টিপ নস্যি নিয়ে চুপ করে করে বসে রইলেন। আমাদের মধ্যে থেকে একজন কেউ প্রশ্ন না করলে আর মুখ খুলবেন না। অগত্যা আমাকেই প্রশ্ন করতে হল।
গল্পটা কি শেষ পর্যন্ত সম্পাদকের কথামতই বদলে দিয়েছিলেন? গাল্পিক-সাহিত্যিক নীরবতা ভঙ্গ করে বললেন–না। সে-গল্প আর বদলানও হয় নি, কোন পত্রিকাতেই আর ছাপা হয় নি। তবে গল্পটা হারায় নি, মাথার মধ্যে আজও রয়েছে। গল্পের প্লটটা নিয়ে এক বিরাট উপন্যাসের পরিকল্পনা ফেঁদে বসেছি, এখন লিখে ফেলতে পারলেই হয়।
বিশুদা বললেন–গল্পটা কি তাহলে গল্পলহরী সম্পাদকের কাছ থেকে ফেরত নিয়ে চলে এলেন?
তাছাড়া আর উপায় কি। সাহিত্য সম্বন্ধে ওঁর রক্ষণশীল ধারণার সঙ্গে আমার ধারণার আসমান জমিন ফারাক। এক্ষেত্রে তর্ক করার কোনই অর্থ হয় না। তাই ওঁর কথার প্রতিবাদ না করে পাণ্ডুলিপি বগলদাবা করে সেই যে চলে এসেছি আর ও-মুখে যাই নি, গল্পও আর পাঠাঁই নি। নকল শরৎচন্দ্রর সঙ্গে সেই আমার প্রথম ও শেষ সাক্ষাৎ।
সব্যসাচী লেখক বললেন–সম্পাদক মশাই তো ভাল কথাই বলেছিলেন। কলম যখন আপনার তখন কলমের এক খোঁচায় গল্প পালটে দিলেই তো হত।
-যা হয় নি তা নিয়ে আর আফসোস করে লাভ নেই। তবে কলমের এক খোচায় কি হয় আর কি না হয়, তা নিয়ে আসল শরৎচন্দ্র সম্বন্ধে একটা মজার গল্প আছে সেটাই আপনাদের বলি।
এ-কথা বলেই গাল্পিক-সাহিত্যিক পকেট থেকে আবার নস্যির কৌটো বার করলেন।
একটা রসাল গল্প, তাও আবার আসল শরৎচন্দ্রকে নিয়ে। বৈঠকের বিশুদাকে আর পায় কে। হাঁকডাক শুরু হয়ে গেল—চা কোথায়, সিগ্রেট আসুক, পান চাই ইত্যাদি।
নস্যির কৌটোর ঢাকনাটায় টকাস টকাস করে আঙ্গুলের টোকা মারতে মারতে গাল্পিক সাহিত্যিক ফরমাশ করলেন-নস্যি ফুরিয়ে গেছে। দুপয়সার র নস্যি আনিয়ে দিন তো।
ছোকরা অমরের তৎপরতায় একে-একে সবই ঝটপট এসে গেল।
মোড়ক থেকে র নস্যি কৌটোয় ভরবার সময় গাল্পিক-সাহিত্যিক বললেন–দোকানের খুচররা নস্যি নেওয়া বিপজ্জনক। Saw dust আর লঙ্কার গুড়ো মিশিয়ে দেয়।
আমি বললাম-তাহলে আনালেন কেন?
-ওটা অভ্যেস। পকেটে নস্যির কৌটা না থাকলে আর তাতে নস্তি ভরা না থাকলে সে যে কী মানসিক যন্ত্রণা আপনারা বুঝবেন না। কোন কাজেই মন বসে না। নস্যি নেওয়াটা বড় কথা নয়। নস্যি-ভর্তি কৌটোটা হাতে থাকা চাই। বাঁ হাতের তালুতে কৌটোটা মুঠো করে ধরে গাল্পিক সাহিত্যিক আসল শরৎচন্দ্রকে নিয়ে আরেকটি কাহিনীর অবতারণা করলেন।
শরৎবাবুর তখন খুব নাম-ডাক। ওঁর বইয়ের পাঠকসংখ্যা অগণিত এবং লেখক সম্বন্ধে পাঠকদের কৌতূহলের শেষ নেই। গ্রাম ছেড়ে কলকাতা শহরে অশ্বিনী দত্ত রোড-এ দোতলা বাড়ি করেছেন, গাড়ি করেছেন, টাকাও করছেন প্রচুর। বছর না ঘুরতেই বইয়ের নতুন সংস্করণ বেরোচ্ছে, ওদিকে ওঁর গল্পউপন্যাস নিয়ে তখন থিয়েটারে আর সিনেমায় চলছে কাড়াকাড়ি। ওদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেওয়া হয়েছে ডি-লিট উপাধি, এদিকে কলকাতায় বিরাট সম্বর্ধনার আয়োজন।
