পার্ক ফার্মেসির সেই দোকানদারের কথা ঘুরে ফিরে বার বার মনে পড়ছিল। এমন একনিষ্ঠ পাঠক সচরাচর দেখা যায় না। বিশুদাকে তাই বললাম-আপনার মুখে ঘটনাটা শুনে সেই দোকানের মালিকের উপর কিন্তু আমার অসীম শ্রদ্ধা বেড়ে গেল। চলুন, সেই নমস্ক ব্যক্তিটিকে একবার দেখে আসি। বিশেষ করে সেই কম্পাউণ্ডার প্রাণকেষ্টকে।
দীর্ঘ নিঃশাস ফেলে বিশুদা বললেন–দুঃখের কথা আর বলেন কেন। কয়েক বছর পরের কথা, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ বেধে গেছে। আমার স্ত্রীর মরণাপন্ন অসুখ, তাঁকে ল্যান্সডাউন রোডের রামকৃষ্ণ মিশনের হাসপাতালে রেখেছি। একদিন ডাক্তার একটা ইনজেকশন কিনে আনতে বললেন, যা লিসে স্টীট ছাড়া আর কোন অঞ্চলের ওষুধের দোকানে পাওয়া সম্ভব নয়। পার্ক ফার্মেসির কথা মনে পড়ে গেল। লিণ্ডসে স্টীট ছুটব? তার চাইতে কাছের এই দোকানটা একবার দেখাই যাক। গেলাম দেশপ্রিয় পার্কের পূর্বদিকের রাস্তায়। সেখানে গিয়ে দেখি পার্ক ফার্মেসির কোন চিহ্নই নেই। সে তল্লাটটা ভেঙ্গেচুরে সেখানে এক বিরাট ইমারত গড়ে উঠছে, শুনলাম কোন এক ব্যাঙ্কের বাড়ি তৈরী হচ্ছে।
সব্যসাচী লেখক মন্তব্য করলেন-উপন্যাস পড়েই বোধ হয় ভদ্রলোক ব্যবসাটা লাটে তুলে দিলেন এবং এর জন্যে শরৎবাবুই দায়ী।
১৮. একই নামে দুই লেখকের আবির্ভাবের পরিণাম
একই নামে দুই লেখকের আবির্ভাবের পরিণাম যে কী তার উদাহরণ স্বরূপ দুই শরৎচন্দ্রের কাহিনী বলতেই বৈঠকের সবাই নকল শরৎ চাটুজ্যে সম্বন্ধে আরও কিছু জানবার জন্যে উৎসুক হয়ে উঠলেন। গল্পলহরীতে আমার লেখা গল্প প্রকাশিত হয়েছিল বটে কিন্তু তাঁকে চাক্ষুস দেখার সৌভাগ্য আমার কোন দিন হয় নি। মফস্বল থেকে কলকাতায় এসে যখন স্থায়িভাবে বসবাস শুরু করেছি, তখন তিনি জীবিত কিন্তু লেখকরূপে প্রায় বিস্তৃত। সুতরাং তার সঙ্গে যোগাযোগ হবার সম্ভাবনাও ছিল না, সুযোগও কখনও ঘটে নি।
বৈঠকের গাল্পিক সাহিত্যিক বহুকাল বাদে মুখ খুললেন। তিনি বললেন–এই নকল শরৎ চাটুজ্যের সঙ্গে আমার চাক্ষুষ পরিচয়ের সুযোগ একবার মাত্র হয়েছিল।
আমরা সবাই উৎসুক চিত্তে নড়েচড়ে বসলাম, একটা কিছু নতুন কাহিনী শোনার আশায়।
কিন্তু আমাদের বৈঠকের গাল্পিক সাহিত্যিকের ওই এক কৌশল। তার লেখা গল্প-উপন্যাসে পাঠকদের যেমন আগাগোড়া সাসপেন-এ রেখে লেখার শেষ পরিচ্ছেদে এনে চমকে দেন, আমাদের বৈঠকে গল্প বলতে বসেও সেই একই টেকনিক প্রয়োগ করে থাকেন। চাক্ষুষ পরিচয়ের একবার মাত্র সুযোগ হয়েছিল–এইটুকু বলেই একটা রসাল কাহিনীর আভাস দিয়ে নীরব। আমরা জানি, এরপর পকেট থেকে নস্যির কৌটো বেরোবে, সন্তর্পণে দুআঙ্গুলে নস্যির টিপ ধরা হবে, তারপর বা-হাতের আড়াল দিয়ে সড়াৎ করে নস্যিটা নাকে টেনে নিয়েই কিছুক্ষণ ভোম হয়ে বসে থাকবেন। ভাবখানা হচ্ছে, যেটুকু বলেছি সেইটুকু নিয়েই হাঁকুপাঁকু কর। ততক্ষণে গল্পর আরম্ভটা কি ভাবে হবে এবং কিভাবে শেষ করব ভেবে নিই। গল্প লেখার আর্ট আমাদের সকলেরই কিছু-কিছু জানা বিভিন্ন লেখকের বই পড়ে, কিন্তু গল্প বলারও যে একটা আর্ট আছে তা হৃদয়ঙ্গম করেছিলাম প্রথমত পরলোকগত পণ্ডিত ক্ষিতিমোহন সেন-এর মুখে গল্প শুনে, দ্বিতীয়ত সৈয়দ মুজতবা আলীর সঙ্গে দিনের পর দিন আড্ডা দিয়ে, তৃতীয়ত আমাদের গাল্পিক সাহিত্যিকের সঙ্গে বৈঠকী আলাপচারিতে।
বৈঠকের সব্যসাচী লেখক আর থাকতে না পেরে বলে উঠলেন—আপনি তো প্রবাসী-ভারতবর্ষে গল্প নিয়ে যাতায়াত করতেন শুনৈছি। গল্পলহরীতেও গল্পের উমেদারী করতেন বুঝি?
নীরবতা ভঙ্গ করে গাল্পিক-সাহিত্যিক বললেন—পাড়ার হাতে-লেখা পত্রিকা বাদ দিলে কলেজ-ম্যাগাজিন-এর পর গল্পলহরীতেই আমার প্রথম আত্মপ্রকাশ। একটা নয়, একাধিক গল্প আমার প্রকাশিত হয়েছিল। ডাকেই লেখা পাঠাতাম এবং দু-এক মাসের ব্যবধানে তা ছাপাও হত। কোন লেখারই দক্ষিণা তখন পাই নি, প্রত্যাশাও করি নি। গল্প প্রকাশিত হচ্ছে সেইটিই ছিল একমাত্র দক্ষিণা। সুতরাং সম্পাদকের সঙ্গে দেখা করার প্রয়োজনই তখন ছিল না। কিন্তু একবার প্রয়োজন হয়ে পড়ল।
গাল্পিক-সাহিত্যিক থামলেন, অন্তত আবার দু মিনিট বিরতি। বিরক্ত হয়ে বৈঠকের মধ্যমণি বিশুদ। একটু খোঁচা দেবার উদ্দেশ্যেই বললেন–লেখা ফেরত এসেছিল বুঝি?
গাল্পিক-সাহিত্যিক বললেন—লেখা ফেরত এলে সম্পাদকের কাছে কৈফিয়ত চাইতে যাওয়া আমার স্বভাব নয়, কোনদিনও আমি তা করি নি। সম্পাদক মহাশয় আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন।
এবার বিশুদা চোখেমুখে খানিকটা নিশ্চিন্তির ভাব এনে বললেন–তাই বলুন। আমি ভেবেছিলাম অশ্লীল গল্প লিখেছিলেন বলেই বোধ হয় লেখাটা ফেরত এসেছিল।
বৈঠকের সব্যসাচী লেখক বললেন—নিশ্চয় অসাধারণ গল্পই লিখেছিলেন যার জন্য সম্পাদক লেখককে দেখবার জন্য ব্যাকুল হয়েই ডেকে পাঠিয়েছিলেন।
গাল্পিকাহিত্যিক এবার বিশুদার দিকে তাকিয়ে বললেন–আপনার অনুমানটাই আংশিক সত্যি। আমি যে গল্পটা পাঠিয়েছিলাম তা চিরাচরিত ধাঁচের গল্প ছিল না, অর্থাৎ একেবারে নিরামিষ গল্প নয়। সেসময় কল্লোল দলের লেখকেরা যে-সব বিষয়বস্তু নিয়ে লিখেছিলেন তাতে সুনাম ও দুর্নাম দুইই সমান জুটেছিল। লেখক-জীবনের শুরুতে সে-সব গল্প পড়ে যে তেতে উঠি নি তা নয়। ইচ্ছে হল এবার এমন একটা গল্প লিখতে হবে যাকে আপনাদের সমালোচকদের ভাষায় বলা হয়ে থাকে বোল্ড স্টোরী। গল্পটা ছিল ইট সুরকির কারবারী এক হঠাৎ-বড়লোকের সুন্দরী বউকে নিয়ে। বন্ধুদের সঙ্গে মদ আর মেয়েমানুষ নিয়ে দিন কাটানোই স্বামীর একমাত্র আকর্ষণ, স্ত্রীর ভালবাসার মর্যাদা দেয় নি বলেই স্ত্রীর ভালবাসা থেকে সে বঞ্চিত ছিল। প্রথমে সুন্দরী স্ত্রীর প্রতি স্বামীর সন্দেহ, পরে শুরু হল অকথ্য অত্যাচার। নিরুপায় হয়ে সে কুলত্যাগ করল, আত্মহত্যা সে করে নি। স্বামী আরও বেশি ডুবে রইল মদ আর মেয়েমানুষে, নিত্য নতুন মেয়েমানুষ তার চাই। একদিন তার ইয়ার-বন্ধুদের একজন সন্ধান দিল বেশ্যাপল্লীতে সদ্য অগিতা এক নতুন পাখির। সেদিন সন্ধ্যায় বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে মত্ত অবস্থায় বেশ্যাপাড়ার এই নতুন পাখির ঘরে গিয়ে দেখে তারই স্ত্রী মোহিনীমূতি ধরে তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। গল্পের শেষে দুজনের অন্তদ্বন্দ্ব এবং প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে আমি বলতে চেয়েছিলাম যে, সমাজকে পরিত্যাগ করলেও মন থেকে সংস্কারকে মুছে ফেলতে তারা পারে নি।
