–কিছু মনে করবেন না তো?
—কিছুমাত্র না। আজীবন প্রশ্নের উত্তর দিয়েই আসছি। প্রশ্নের কি আর শেষ আছে? বলুন কি বলতে চান।
ভদ্রলোক সংকোচের সঙ্গে বললেন–দেখুন, আপনাকে ঠিক শরৎ চাটুজ্যের মৃত দেখতে।
কথাটা শুনেই শরৎবাবু একটু থমকে গেলেন। পরমুহূর্তেই চোখে মুখে এমন একটা ভান করলেন যেন প্রশ্নটা তাঁর কাছে দুর্বোধ্য। বললেন–কোন শরৎ চাটুজ্যে?
–নবেলিস্ট শরৎ চাটুজ্যে, যিনি শ্রীকান্ত, চরিত্রহীন, গৃহদাহ, দেবদাস, বিপ্রদাস লিখেছেন।
গম্ভীর গলায় শরৎবাবু বললেন–ও, অনেকে তাই বলে বটে।
শরৎবাবু আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালেন না। শেষপ্রশ্ন উপন্যাস লিখলে কি হবে। মানুষের প্রশ্নের তো আর শেষ নেই। আবার কি জিজ্ঞাসা করে বসে সেই ভয়ে একটু তাড়াতাড়ি দোকান থেকে ফুটপাথে নেমে মনোহর পুকুর রোডের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।
আমার মাথায় তখন দুষ্টবুদ্ধি চেপে গেল। ভাবলুম একটু রগড় করা যাক। শরৎবাবু যখন বেশ খানিকটা পথ এগিয়ে গিয়েছেন তখন আস্তে আস্তে পুস্তক-পাঠ-নিমগ্ন ভদ্রলোকের কানের কাছে ঝুকে গলাটা একটু খাটো করেই বললাম-ও মশাই, চিনতে পারলেন না? উনিই তো শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
ঘুমের মধ্যে হঠাৎ ছুঁচ ফুটিয়ে দিলে মানুষ যেমন চমকে ওঠে তেমনি কথাটা কানে যাওয়া মাত্র আচমকা চেয়ার থেকে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বললেন–অ্যাঁ, উনিই শরৎচন্দ্র? নবেলিস্ট শরৎ চাটুজ্যে? তা এতক্ষণ বলেন নি কেন? তাছাড়া আমার দোকানে উনি কেন আসবেন।
কাউণ্টারের সুইং-ডোরটা এক ঝটকায় খুলে বিদুৎগতিতে ফুটপাথে ছুটে নেমে গেলেন। যাবার সময় হাতের ধাক্কা খেয়ে কাচের পেপার-ওয়েটেটা ছিটকে মাটিতে পড়তেই দেখলাম নো-অ্যাডমিশন লেখা কালো পর্দাটা নড়ে উঠল, একটুখানি ফাঁক দিয়ে প্রাণকেষ্টর দুই উদ্বিগ্ন চোখ আমার দিকে জল অল করে তাকিয়ে আছে।
ওদিকে দোকানের মালিক তখন ফুটপাথের উপর দাঁড়িয়ে স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে আছেন সেই পথের দিকে, গ্রীষ্মমধ্যাহ্নের যে-নির্জন পথ দিয়ে শরৎচন্দ্রের দীর্ঘ দেহ ধীরপদক্ষেপে মনোহরপুকুর রোডের মোড়ে এসে মিলিয়ে গেল।
বিশুদা এবার থামলেন। সঙ্গে সঙ্গে একজন সিগারেট এগিয়ে দিল, আরেকজন পকেট থেকে দেশলাই বার করে ধরিয়ে দিল। বেয়ারা অমর ছুটে চলে গেল চা আনবার জন্যে।
আমি বললুম-বিশুদা আপনার অনুপস্থিতিতে আমরা আপনার সম্বন্ধে বৈঠকে যে-সব কটুকাটব্য করেছি তা প্রত্যাহার করছি।
বৈঠকের সবাই আমার প্রস্তাবে সম্মতি জানালেন শুধু একজন ছাড়া। সব্যসাচী লেখক বললেন—তা না হয় হল। কিন্তু আমার মনে একটা খটকা থেকে গিয়েছে। বিশুদা আমাদের বৈঠকে বরাবরই গর্বের সঙ্গে জাহির করে এসেছেন যে শরৎবাবুর সঙ্গে ওঁর পরিচয় সাধারণ পরিচয় নয়, এক গেলাসের ইয়ার বললেই হয়। তাই যদি হবে তাহলে বিশুদার সঙ্গে শরৎবাবু একটিও কথা বললেন না কেন?
সব্যসাচী লেখক এবার একটা অকাট্য যুক্তি ছেড়েছেন। আমাদেরও তো এতক্ষণ এটা খেয়াল হয় নি। পাঁচ জোড়া জিজ্ঞাসু চোখ বিশুদার মুখের উপর ফোকাস ফেলল, উনি কিন্তু নির্বিকার। ঠোঁটের কোণায় কৌতুকপূর্ণ হাসির ঝিলিক তুলে আপন মনে পা দোলাচ্ছেন।
কিছুক্ষণ বিরতির পর বিশুদাই মুখ খুললেন। বললেন—ঘটনাটা হচ্ছিল ওষুধের দোকানদার আর শরৎবাবুকে নিয়ে। তার মধ্যে আমার কথা আসবে কেন? আর এলেও, যেহেতু ঘটনাটা আমিই বলছি, সেই হেতু নিজের কথা বলাটা আমি ভালগারিটি বলেই মনে করি। শরৎবাবুর সঙ্গে মামার কথা হয়েছিল বইকি। ওষুধ নিয়ে দোকান থেকে যাবার সময় আমার দকে হঠাৎ তাঁর নজর পড়ল। কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন–চেনা চেনা বলে মনে হচ্ছে।
আমি বললুম-রসচক্রর আসরে নিয়মিতই যাই, সেখানেই আমাকে দেখেছেন।
-ও, তাহলে তুমিও একজন রসচক্রী। তা এই দুপুরে এখানে কোন রসের সন্ধানে।
আমি বললাম-এসেছিলাম ওষুধের সন্ধানে, কিছু রসের সন্ধানও তো পেয়ে গেলাম। কিন্তু আপনি এই রোদে ছাতা না নিয়ে বেরোলেন কেন?
শরৎবাবু বললেন–ছাতা নিয়েই বেরনো উচিত ছিল। বেরোবার সময় ভুলে লাঠিটা নিয়েই বেরিয়ে পড়েছি। লাঠিটাই সব সময় হাতে রাখা আমার অভ্যেস।
–আপনি নিজে না এসে চাকরকে পাঠিয়ে দিলেই তো পারতেন।
শরৎবাবু বললেন–দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার ঘণ্টা খানিক বাদেই পেটে একটা যন্ত্রণা শুরু হয়। নতুন একটা ওষুধ বেরিয়েছে, এইটা খেলে একটু আরাম বোধ করি। ভেবেছিলাম ওষুধটা আনতে চাকরকেই পাঠাব। ব্যাটা কাল সারারাত কোথায় কাটিয়েছে কে জানে, দুপুরে নাক ডাকিয়ে ঘুমুচ্ছে। তাই নিজেই বেরিয়ে পড়লাম। এ কথা বলেই শরৎবাবু বাড়ির দিকে রওনা হলেন, আমিও দোকানে ফিরে এলাম। . বিশুদার কথা থামতেই আসরের গাল্পিক লেখক বললেন—বাংলা দেশে জীবদ্দশায় পাঠক-ভাগ্য শরৎবাবুর মত আর কারোর হয় নি। অথচ শরৎবাবুর পাঠকভীতি সর্বজনবিদিত। এই কারণে কোন সভাসমিতিতে ওঁকে নিয়ে যাওয়া ছিল কষ্টসাধ্য ব্যাপার। আর বক্তৃতা? নৈব নৈব চ।
এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল বার্নার্ড শ-র সম্বন্ধে একটা বিখ্যাত গল্প। বার্নার্ড শর তখন খুব নাম-ডাক। একদিন লণ্ডনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, এক ভদ্রমহিলা হাইহিল জুতোর খুটখুট খুটখুট দ্রুত শব্দ তুলে বার্নার্ড শর পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গিয়েই বার বার ঘুরে ঘুরে শ-কে দেখছেন। বার্নার্ড শ লম্বা লম্বা পা ফেলে ভদ্রমহিলার কাছে এসে বললেন–ম্যাডাম, আপনি ঠিকই অনুমান করেছেন। আমিই জর্জ বার্নার্ড শ।
