কে কার কথা শোনে। সন্দেহ জাগল ভদ্রলোক নিশ্চয় কানে কালা। আরেক ধাপ গলা চড়িয়ে বললাম—ও মশাই, বলি শুনতে পাচ্ছেন?
বই-এর পাতা থেকে চোখ না তুলে শুধু বললেন–অত চেঁচাচ্ছেন কেন। কি চাই বললেই তো হয়।
যা-চ্চলে। যা ভেবেছিলুম তা নয়। কি রকম দোকানদারি বাবা। খদ্দেরকেই ধমকানি! আমার মেজাজ তখন আসমানে চড়বার কথা। কিন্তু বই-পাগলা লোক, তার উপর শরৎ চাটুজ্যের। সুতরাং যতটা সম্ভব গলাটা মোলায়েম করে বললাম-একটা ওষুধ নিতে এসেছি। পাওয়া যাবে?
বইয়ের পাতায় চোখ নিবদ্ধ রেখেই বাঁ-হাত দিয়ে ফস করে কাগজটা আমার হাত থেকে নিয়ে বাঁদিকের কাউণ্টারের উপর প্রসারিত করে হাঁক দিলেন-প্রাণকেষ্ট।
বাঁদিকের কোণটায় একটা কাঠের পার্টিশন দেওয়া খুপরি। এক পাশে একটা কালো পর্দা ঝুলছে। পর্দার উপরের দিকে একটা পেস্ট-বোর্ড পেরেক দিয়ে মারা, তাতে ইংরিজী হরপে লাল কালিতে লেখা—নো অ্যাডমিশন।
কালো পর্দাটা একটু ফাঁক করে প্রথমে একটা মুণ্ডু দেখা দিল। মুণ্ডু দেখেই অনুমান করলাম চেহারা দেশলাইয়ের কাঠি। বয়েস চল্লিশ পার হয়েছে, চোখে পুরু কঁচের চশমা। প্রাণকেষ্ট পর্দা ঠেলে বেরিয়ে এলেন। নোগা লিকলিকে শরীরটা ধনুকের মত বেঁকে গেছে। গায়ের গেঞ্জিটা ঘামে ভিজে এমন ভাবে লেপটে আছে যে পাঁজরার হাড় গোনা যায়। প্রেসক্রিপশনটা হাতে নিয়ে দেখে বললেন—পাওয়া যাবে, তবে তৈরি করতে একটু সময় নেবে।
পাওয়া যাবে কথাটা শুনলাম এক ঘণ্টা ঘোরাঘুরির পরে। পরম তৃপ্তিতে মন ভরে গেল। হোক না দেরি। পেয়েছি এটাই অনেকখানি। জিজ্ঞাসা করলাম—কত দেরি হবে?
-এই আধ ঘণ্টা কি পঁয়তাল্লিশ মিনিট। ইচ্ছে করলে ঘুরেও আসতে পারেন।
এই রোদে আর গরমে কোথায় ঘুরব। দোকানের একটা টুল টেনে নিয়ে পার্কের দিকে মুখ করে বসে পড়ে বললাম—আমি এখানেই অপেক্ষা করি, আপনি ওষুধটা তৈরি করুন।
পর্দানশীন প্রাণকেষ্ট আবার পর্দার আড্ডালে অন্তর্ধান করলেন।
তাহলে বই-পাগলা ভদ্রলোক হচ্ছেন দোকানের মালিক, প্রাণকেষ্ট হচ্ছে তার কম্পাউণ্ডার। বেলা তখন হবে প্রায় দুটো। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড রোদ, বাইরে তাকানো যায় না। রাস্তায় লোক চলাচল নেই বললেই চলে। জনশূন্য পার্কের সোনাঝুরি গাছটার ছায়ায় একটি ভিখারিনী ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে, কোলের কাছে দুটি কঙ্কালসার উলঙ্গ শিশু বসে বসে ধুকছে। দুপুরের স্তব্ধতা ভেদ করে মাঝে মাঝে দু-একটা ট্রাম সশব্দে ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছে। আশপাশের বাড়ির আলসের ছায়ায় বসে কয়েকটা কাক মুখ হাঁ করে হাঁপাচ্ছে।
দোকানের মালিকের দিকে এবার তাকালাম। আবার বইয়ের পাতা উল্টোলেন। কালো পর্দাটার দিকে তাকালাম। প্রাণকেষ্ট কি আবার ঘুমিয়ে পড়ল? কাউণ্টারের গায়ে পিঠটা হেলান দিয়ে ক্লান্ত পা-দুটো টান করে ছড়িয়ে দিয়ে বসে রইলাম। ওষুধ যখন তৈরি হয় হোক, আমি ততক্ষণ জিরিয়ে নিই।
হঠাৎ চমকে উঠে খাড়া হয়ে বসলাম। এই কাঠফাটা নোন্দরে নিতান্ত পাগল আর আমার মত বিপদগ্রস্ত লোক ছাড়া কে রাস্তায় বেরোয়। কাকে দেখছি দোকানের সামনে! পয়ং শরৎবাবু এসে উপস্থিত। গায়ে হাফ-হাত পাঞ্জাবি, হাতে লাঠি। শুভ্র কাশের মত মাথার চুল অবিন্যস্ত। দোকানের সামনে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে চশমার ফাঁক দিয়ে একবার সাইন বোর্ডটা দেখে নিয়ে নিশ্চিন্ত হলেন।
দোকানের মালিকের দিকে তাকিয়ে আমি বিমূঢ় হয়ে গেলাম। যার লেখা বই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ভুলে পড়ছেন সেই লেখক সশরীরে তার সামনে উপস্থিত তারই দোকানের খদ্দের হয়ে অথচ ভদ্রলোকের সেদিকে কোনও নজরই নেই। যেমন পড়ছিলেন তেমনিই পড়ে চলেছেন।
শরৎবাবু একটু ইতস্তত করে ভদ্রলোকের সামনে একটা কাগজ এগিয়ে ধরে বললেন–এই ওষুধটা আমাকে দিন।
বই থেকে মুখ না তুলে ভদ্রলোক হাঁক দিলেন-প্রাণকেষ্ট, দেখ তো কি চায়।
কালো পর্দার ভিতর থেকে প্রাণকেষ্টর পুনরাবির্ভাব হল। শরৎবাবুর হাত থেকে কাগজটা নিয়ে একটা আলমারির ডালা সরিয়ে যা বার করল, তাতে বড় বড় অক্ষরে লেখা আছে ইউকোড়োল। অনুমান করলাম কোনও বিলিতী কোম্পানীর ওষুধ।
প্রাণকেষ্ট কাউণ্টারের উপর কাগজ আর ওষুধটা রেখে বললে-মেমম করে দিন। আর কোনও বাক্য ব্যয় না করে প্রাণকেষ্ট আবার কালো পর্দার ভিতরে ঢুকে পড়ল। শরৎবাবু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে প্রাণকেষ্টর আসা ও যাওয়া নিরীক্ষণ করলেন।
ভদ্রলোক বইটার পাতার উপর একটা কাচের পেপার-ওয়েট চাপা দিয়ে ড্রয়ার খুলে একটা ক্যাশমেমম বার করলেন। মুখে অত্যন্ত বিরক্তির ছাপ। খসখস করে ওষুধের নাম আর দাম লিখে কাগজটা ছিড়তে ছিড়তে বললেন—দু টাকা।
শরবাবু পকেট থেকে একটা পাঁচ টাকার নোট বার করে কাউণ্টারের উপর রাখলেন। নোটটা ড্রয়ারের ভিতর রেখে তিনটা খুচরো টাকা বার করে শরৎবাবুর হাতে দেবার সময় ভদ্রলোকের কী যে করুণা হল হঠাৎ মুখ তুলে তাকালেন। টাকাটা শরৎবাবুর হাতে দেবেন বলে হাতটা সবে বাড়িয়েছিলেন, মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। চোখেমুখে ভদ্রলোকের বিস্ময় বিমূঢ় ভাব। দু-এক সেকেণ্ডের মধ্যেই সামলে নিলেন। মেমো আর টাকা শরৎবাবুর হাতে দিতেই তিনি তা হাফ-হাতা পাঞ্জাবির পকেটে রেখে দোকান থেকে বেরোবার জন্য ঘুরে দাঁড়িয়েছেন, এমন সময় দোকানের মালিক মুখে বদান্যতার হাসি এনে বললেন–একটা কথা বলব স্যার?
বলুন কি বলবেন। শরৎবাবু ভদ্রলোকের দিকে মুখ ফেরালেন।
