দাঁড়ান মশাই। অত তাগাদা দিলে কি গল্প বেয়োয়? যে-রকম উত্তেজনা থেকে এসেছি তাতে স্নায়ুগুলোকে একটু জিরোতে দিতে হবে তো।
আমরা আর প্রতিবাদ করলাম না। কারোর দিকে না তাকিয়ে ধ্যানস্থ হয়ে আস্তে আস্তে চায়ের কাপে শেষ চুমুক মেরেই দুটো আঙুল ঈষৎ ফাঁক করে বাড়িয়ে দিলেন। অর্থাৎ ফাঁকের ভিতরে যে-কেউ একজন সিগারেট ওঁজে দিক। দেওয়া হল। বাঁ হাতটা এবার টেবিলের উপর মেলে ধরলেন অর্থাৎ দেশলাই চাই। দেওয়া হল। সিগারেট ধরিয়ে দেশলাইটা টেবিলের উপর ধরাস করে ফেলে দিলেন। যার দেশলাই সে নিজে কুড়িয়ে নিক। জলন্ত সিগারেটটা তর্জনী আর মধ্যমার গোড়ায় গুঁজে হাতটা মুঠো করে ফেললেন। বৃদ্ধাঙ্গুলী ও তর্জনীর মাঝে যে ফোকর সৃষ্টি হল সেইখানে মুখ দিয়ে একটা টান দিলেন যেন গাঁজার কল্কেতে দম দেওয়া হল। এক টানেই ছাইটা অর্ধেক নেমে এসেছে। ধোয়া নাক-মুখ দিয়ে আর আমরা বোয়োতে দেখলাম না।
সব্যসাচী লেখক আর থাকতে না পেরে বলে ফেলল—পকেটে দেশলাইসিগারেট নেই কিন্তু নেশাটি ঠিক আছে।
গাল্পিক সাহিত্যিক আধ্যাত্মিকতার গন্ধ পেলেই চাগিয়ে ওঠেন। তিনি বললেন–মূলকে ধরে রাখাই তো সাধনার সারকথা। ঈশ্বরকে যে পেয়েছে সে তাতেই বুদ হয়ে থাকে। তার কাছে তখন আর সব কিছুই অবান্তর।
এতক্ষণে বিশুদা চোখ খুললেন। ডাইনে-বাঁয়ে দুই সাহিত্যিকের দিকে চোখটা একবার ঘুরিয়ে নিয়ে মুখটা উপরের দিকে তুলে পেটের মধ্যে এক রাজ্যের জমিয়ে-রাখা ধোঁয়া ঘরের চালা লক্ষ্য করে ছাড়লেন, যেন ভিসুভিয়াসের পেট থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। অনুমান করলাম, পর্বতে বহ্নিমান ধূমাৎ। বিশুদা রেগেছেন, ফেটে পড়লেন বলে। গল্পের মাথায় ডাণ্ডা পড়ার আগেই বিশুদাকে ঠাণ্ডা করবার জন্যে বললাম-বিশুদা, ওঁদের কথায় কান দেবেন না। আপনি যে-ঘটনাটা বলবেন বলেছিলেন সেটা শুরু করুন।
বিশুদা বললেন–আমার অবর্তমানে যা হচ্ছিল, হচ্ছিল। সাক্ষাতে আর কেন। তবে হ্যাঁ। যে-ঘটনাটা আপনাদের বলতে যাচ্ছি সেটা আমার নিজের চোখে দেখা, এক বিন্দু বানানো নয়।
১৯৩৬ সাল, শরৎবাবুর মৃত্যুর দুই বছর আগের ঘটনা। আমার বাবার খুব অসুখ। এদিকে ব্লাড প্রেশার, ওদিকে ডায়াবেটিস। তার উপর কদিন ধরে পেটের গোলমালে খুবই কষ্ট পাচ্ছিলেন। একদিন দুপুরে বাড়াবাড়ি, ডায়রিয়ার লক্ষণ। তাড়াতাড়ি ডাক্তার ডেকে আনলাম। ভাল করে পরীক্ষা করে ডাক্তারবাবু একটা মিক্সচারের প্রেসক্রিপশন লিখে আমার হাতে দিয়ে বললেন—ওষুধটা তাড়াতাড়ি আনিয়ে দু-ঘণ্টা পরপর এক দাগ করে খাইয়ে যান।
তখন বৈশাখ মাস, প্রচণ্ড গরম। রাস্তার পিচ গলে চটচটে হয়ে আছে। কালীঘাট অঞ্চলের সব কটা ডিসপেনসারি ঘুরলাম, সবাই বললে এ-ওষুধ ওদের কাছে নেই। এদিকে রোদে মাথার চাঁদি ফাটার উপম, আমারও নোখ চেপে গেল ওষুধ না নিয়ে বাড়ি ফিরব না। বসা রোডের মোড়র কাছে একটা ওষুধের দোকানে প্রেসক্রিপশনটা দেখিয়ে কম্পাউন্ডারকে বললাম কি ব্যাপার বলুন তো, কালীঘাটে সব দোকান ঘুরেছি, সবাই বললে এ-ওষুধ নেই। আপনিও কি তাই বলবেন?
–তা না বলা ছাড়া আর উপায় কি। এই যে হিউলেট মিক্সচার লিখে দিয়েছেন—ওটা তো বিলিতী ওযুধ, আজকাল পাওয়াই যায় না। ওটার বদলে একটা দেশী ওষুধ বেরিয়েছে—বিসমার্ক পেপসিন কম্পাউণ্ড। বলেন তো ওটা দিতে পারি। তবে প্রেসক্রিপশনে ওটা লিখিয়ে আনতে হবে।
আমি বললুম-তা হবে না মশাই। যা লেখা আছে তাই নিয়ে যেতে হবে। এই দুপুর রোদ্দ রে ঘুরে ঘুরে হয়রান। আবার ডাক্তারের বাড়ি ছুটব?
কম্পাউণ্ডার একটু রেগেই বললেন—তাহলে সাহেব পাড়ায় ছুটুন। পেলে সেখানেই পাবেন, এখানে নয়।
-কেন, আপনারাও বিলিতী বর্জন করেছেন বুঝি। কিম্বা দেশী কোম্পানীর মাল কাটাবার জন্যে মোটা কমিশন খাচ্ছেন।
কম্পাউণ্ডার মশাই এবার খেঁকিয়ে উঠলেন—যান যান, আপনার সঙ্গে তর্ক করলে আমার চলবে না, হাতে অনেক কাজ।
—আপনার সঙ্গেও আমার তর্ক করবার প্রবৃত্তি নেই।
এই কথা বলেই তিরিক্ষি মেজাজ নিয়ে আবার আমি রাস্তায় নেমে পড়লাম। রাসবিহারী অ্যাভিনিউ দিয়ে হেঁটে চলেছি, দুপাশে ওষুধের দোকান দেখলে ঢুকি আবার বেরিয়ে আসি।
হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়েছি দেশপ্রিয় পার্কের কাছে। পার্কের পুব। দিকে একটা জনবিরল রাস্তা। সেই রাস্তার উপরে কিছু দূরেই একটা সাইনবোের্ড ঝুলছে—পার্ক ফার্মেসি। ভাবলাম, বড় রাস্তার দোকান তো অনেক দেখলাম। এবার অলি-গলির দোকানগুলিতে ঢু মারা যাক। গলির দোকানে খদ্দেরের ভিড় সাধারণত কমই হয়। সেখানে বিলিতী ওষুধের পুরনো স্টক পড়ে থাকা অসম্ভব নয়। রোদে পুড়ে তেতে গলদঘর্ম অবস্থায় দোকানের সামনের লাল ফুলে-ভরা কৃষ্ণচূড়া গাছটার ছায়ায় এসে দাঁড়ালাম একটু জিরিয়ে নেবার জন্যে।
ছোট্ট দোকান। কাঠের কাউণ্টারের ওপাশে এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক গভীর মনোনিবেশের সঙ্গে একটা বই পড়ছেন। পিছনে সার সার তিনটি আলমারিতে নানা লেবেলের পেটেন্ট ওষুধ সাজানো, ঘরের দেয়ালে দরজার পাল্লায় দেশী ও বিলিতী ওষুধের প্রচার-চিত্র ঝুলছে। দোকানে আর কেউ নেই।
ফুটপাথ থেকে দোকানের ভিতরে প্রবেশ করে একেবারে প্রৌঢ় ভদ্রলোকের সামনে এসে দাঁড়ালাম। হৃক্ষেপ নেই। এক মনে এবং একাগ্র মনে বই পড়ে চলেছেন। কৌতূহল হল। কী এমন বই যে খদ্দেরের দিকে মুখ তুলে তাকাবার ফুরসত নেই। গলাটা একটু বাড়িয়ে প্রথমে বইটা দেখে নিলাম। বিপ্রদাস। শরৎ চাটুজ্যের সাম্প্রতিক প্রকাশিত উপন্যাস। আমার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য গলা খাঁকারি দিলাম, কা কস্য। ভদ্রলোক এক ঝটকায় পাতাটা উল্টে বাঁদিকের পাতার উপরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন। বই-এর পাতা থেকে ওঁর চোখ ফেরানো অসম্ভব জেনেই প্রেসক্রিপশনটা এগিয়ে ধরে বললাম—ও মশাই, শুনছেন?
