ভদ্রলোকের দুই হাত ধরে ক্ষমা প্রার্থনা করে বললাম-দেখুন, আমি আপনার ওস্তাদ ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় নই। আপনি কেন, অনেকেই এই ভুল করে থাকেন।
আমি পানের দোকানে জর্দা-পানের অর্ডার দিয়ে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি বারান্দার সেই ভদ্রলোক, সেই জায়গাতেই, বিমূঢ়ের মত আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন। বোধ হয় তখনও তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না যে আমি ভীষ্মদেব নই।
এই ঘটনা বলার পরই দেখি বিশুদা পকেট থেকে একটা আধ খাওয়া সিগারেট বার করে ঠোটে গুঁজে হাতটা টেবিলের উপর মেলে ধরে বললেন–
দেশলাই।
সিগারেট ধরালেন, ধোঁয়াটা এড়াবার জন্যে চোখ-দুটো আধবোজা অবস্থায় রেখে বললেন–চা।
এই রে! রাত প্রায় নটা বাজে, এখন আবার চা! বুঝলাম বিশুদার পেটের ভিতর একটা গল্প ভুড়ভুড়ি কাটছে, শুধু এক কাপ চায়ের অপেক্ষা।
আমার তখন একমাত্র ভাবনা, এতক্ষণে বুঝি আলাউদ্দিন খা সাহেবের বাজনা আরম্ভ হয়ে গিয়েছে।
বিশুদা চা-এর জন্য আবার তাগাদা দিয়ে বললেন–আপনাকে দেখে লোকটা ভীষ্মদেব চাটুজ্যে বলে ভুল করেছিল। কিন্তু আমি আর একটা ঘটনা জানি। শরৎ চাটুজ্যেকে দেখে একটা লোক শরৎ চাটুজ্যে বলে ভুল করেছিল। কই, চা আসুক।
হাতজোড় করে বিশুদাকে অনুরোধ জানালাম-বিশুদা, আপনার গল্প শুনতে গেলে আমার বাজনা শোনা হবে না। ওটা আসছে শনিবারের জন্য ভোলা থাক।
১৭. শরৎ চট্টোপাধ্যায়কে শরৎ চট্টোপাধ্যায় বলে ভুল
শরৎ চট্টোপাধ্যায়কে শরৎ চট্টোপাধ্যায় বলে ভুল করেছিল, এমন লোকও বাংলা দেশে আছে! কথাটাই যেন আমাদের কাছে কি রকম গোলমেলে বলে মনে হল। বিশুদার কথা তো, উদ্ভট কিছু একটা গল্পের আভাস দিয়ে আমাদের উৎকণ্ঠায় রাখা ওঁর চিরকালের স্বভাব। পরের শনিবার দপ্তরে বেলা পাঁচটার মধ্যে সবাই হাজির, বিশুদার দেখা নেই।
সব্যসাচী লেখক সুযোগ পেয়ে বললেন—বিশুবাবুর যখন আসতে দেরিই হচ্ছে তখন আসুন সময় কাটাবার জন্যে আমরা পরচর্চা শুরু করে দিই।
বৈঠকের বন্ধুদের ধারণা পরনিন্দা বা পরচর্চা হচ্ছে খই ভাজার উৎকৃষ্ট সাবসটিট্যুট। সময় কাটাতে হলে কর পরচর্চা—এটাই হল বৈঠকীবন্ধুদের স্লোগান। আর পরচর্চা হবে তাকে নিয়েই, যে বৈঠকে অকারণে অনুপস্থিত। পরচর্চার এমনই গুণ যে মারণ উচাটন বাণ-মারার মতই এ ফলপ্রসু। যে অনুপস্থিত থাকে তার মানসিক অবস্থাটা অনুমান করুন। সব সময় তার মনের মধ্যে এক যন্ত্রণা, তাকে নিয়ে কি শ্রাদ্ধটাই না করা হচ্ছে। যেখানেই সে থাকুক, হন্তদন্ত হয়ে পড়ি-কি-মরি অবস্থায় ছটফট করতে করতে তাকে ছুটে আসতেই হয়।
সব্যসাচী সাহিত্যিকের উৎসাহ পেয়ে তরুণ কবি শুরু করলেন-বিশুদা কবে একদিন রসচক্রের আসরের এক কোণায় বসবার সুযোগ পেয়েছিলেন সেই সুবাদে শরৎ চাটুজ্যেকে নিয়ে যতরাজ্যের গল্প আমাদের কাছে বলবেন।
গাল্পিক সাহিত্যিক বললেন–ওঁর ভাবখানা এমন যে, আমাদের সে-আসরে বসবার সুযোগ না-পাওয়াটা যেন মস্ত দুর্ভাগ্য।
সব্যসাচী লেখক মুখটা যতখানি সম্ভব বিকৃত করে বললেন—কে জানে ওঁর কথার কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যে।
আমি বললুম-আপনারা যাই বলুন-না-কেন শরৎবাবুর সান্নিধ্যে আসার সৌভাগ্য আমাদের মধ্যে একমাত্র বিশুদারই হয়েছে। উনি ভাল করেই জানেন শরৎবাবু সম্বন্ধে আমাদের কৌতূহলের অন্ত নেই। সুতরাং বিশুদা সে-সুযোগ ছাড়বেন কেন।
সব্যসাচী লেখক বললেন–তাই বলে উনি বেমালুম সব গাঁজাখুরী গল্প বলে যাবেন আর আমাদের তা সুবোধ বালকের মত শুনে যেতে হবে?
তরুণ কবি বললেন–বলতে দিন, পার্সেন্টেজ বাদ দিলেই হল।
–কে কার পার্সেন্টেজ বাদ দেয়। বিশুদার কণ্ঠস্বর শুনে চমকে উঠলাম।
তাকিয়ে দেখি দরজার কাছে বিশুদা গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে-ঘরে ঢুকছেন না।
আসুন, আসুন বিশুদা—আসুন-সবাই সমস্বরে সাদর অভ্যর্থনা জানালাম।
বিশুদা গম্ভীর গলায় বললেন–বলি, হচ্ছে কতক্ষণ।
—কি হচ্ছে?
–কি আবার, আমার ছেরাদ্দ। সব্যসাচী লেখক বললেন–সবে শুরু করেছিলাম, হতে আর দিলেন কোথায়।
খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন–আপনারা এমন জায়গায় অফিস করেছেন যে, আসতে গেলে রাস্তায় হাজার বাধা। ট্রামে করে বড়বাজারের মোড়ে এসেই দেখি হারিসন রোডের উপর ললাকে লোকারণ্য। ট্রাম থেকে নেমে ভিড় ঠেলে এগিয়ে দেখি রাস্তার উপরেই দুটো পুরুষ্ট, ঘাড় সিং-এ সিং লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একটার রং কালো আরেকটার সাদা। একবার কালোটা সাদাটাকে ঠেলে চার-পাঁচ গজ পিছনে হটিয়ে দিয়ে সিং-এ সিং লাগানন অবস্থায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে, আরেকবার সাদাটা কালোটাকে। ভিড়ের মধ্যে আমার পাশেই মশাই দুই মায়োয়াড়ী দুই ঘাড়ের উপর লাগাই শুরু করে দিলে।
কে একজন প্রশ্ন করল-লাগাই আবার কি?
বিশুদা বললে—জুয়া মশাই জুয়া। প্রথম মারোয়াড়ী যেই বললে—ধলা দশ, দ্বিতীয় ব্যক্তি সঙ্গে সঙ্গে বললে-কালো দশ। তারপর শুরু হয়ে গেল
–ধলা বিশ।
–কালো বিশ।
–ধলা ত্রিশ।
–কালো ত্রিশ। এদিকে দুই ষাঁড়ের কিন্তু ওই এক অবস্থা। ন যযৌ ন তস্থৌ।
লাগাই যখন একশ টাকায় উঠেছে তখন হঠাৎ আমার খেয়াল হল—এই রে, বৈঠকে তো আমার বারোটা না বাজিয়ে ছাড়বে না। যাঁড়ের লড়াইয়ের ফলাফল ফেলেই ছুটে আসতে হল।
চায়ের দোকানের ছোকরাটা এসে কয়েক কাপ চা টেবিলে রেখে গেল। বিশুদার দিকে একটা কাপ এগিয়ে দিয়ে বললাম-চটপট চা-টা খেয়ে নিন। শরৎবাবুকে নিয়ে সেই ঘটনাটা শুনবার জন্যে আমরা সবাই অপেক্ষা করে আছি।
