গান ধীরে মহুরে শুরু হয়ে পরতে পরতে বিস্ময় সৃষ্টি করে এক উত্তেজনার শিখর থেকে আরেক শিখরে ছুটে চলেছে। আর সঙ্গে সঙ্গে সমঝদার শ্রোতারা হায় হায় শব্দে ফেটে পড়ছেন। কিন্তু রণজিৎ সিংজী সেই যে চোখ বুজে পাথরের মত স্থির হয়ে বসে আছেন তো আছেনই। ডানদিকের ঠোটটা যেন অনেকখানি স্কুলে পড়েছে, সেই সঙ্গে গোঁফও। সন্দেহ জাগল, বুড়ো গান শুনছে না ঘুমচ্ছে। গানের আসরে শ্রোতারূপে যে-রস আমি উপভোগ করছি তা আমার পাশের পরিচিত লোকটিও সমান উপভোগ করছে জানতে পারলে আনন্দ হয়। সেইজন্যে এই ধরনের আসরে কখনও কোন রকম সাড়া না পেয়ে মনটা দমে গেল। আমার আনন্দের ভাগ দেব তা হলে কাকে?
বেলা চারটের সময় আসর ভাঙ্গল। পুরো চারঘণ্টা একজনের গান এক নাগাড়ে শোনার অভিজ্ঞতা আমার সেই প্রথম। কিন্তু গায়কের চোখেমুখে ক্লান্তির কোন চিহ্ন নেই। পরম তৃপ্তির আনন্দ নিয়ে শ্রোতারা প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে-রণজিৎ সিং-এর কিন্তু উঠবার নাম নেই, ঠিক সেই ভাবেই বসে আছেন। আর সন্দেহ রইল না, বুড়ো নির্ঘাত ঘুমুচ্ছে। ডেকে তুলব কি না ভাবছি, হঠাৎ লাঠির মাথায় রাখা দুই হাতের চেটোতে ভর দিয়ে থুতনি নড়ে উঠল, সঙ্গে সঙ্গে একটা অস্ফুট ধ্বনি, একটা চাপা ক্রনের শব্দ।
–কি হল রণজিৎ সিংজী, কি হল? ওঁর গায়ে হাত দিলাম, শরীরটা থরথর করে কাপছে। শুধু বললেন–হাড় গুড়িয়ে দিলে। এই কথা বলেই আমার দিকে মুখ তুলে তাকালেন, চোখে নেশাগ্রস্ত মানুষের ঘোলাটে দৃষ্টি। চোখের জলে বৃদ্ধের দুই গাল ভেসে গেছে। বিশুদ্ধ মাতৃভাষায় শুধু বললেন—মুঝে ভগবানকো পা মিলা। যব গানা খতম হুয়ী ওহ, চলে গয়ে।
হল ছেড়ে আবার টাঙ্গায় চড়ে নিজেদের ডেরায় ফিরলাম—সারা রাস্তা রণজিৎ সিং-এর মুখে ঘুরে ফিরে শুধু একটি মাত্র কাতর বিলাপ ওহ, চলে গয়ে।
এ-কাহিনী বলার পর বৈঠকের বন্ধুদের মুখে আর কথা নেই, সবাই চুপ। আমি বললাম-তাহলে বুঝতে পারছেন সংগীতের আবেদন মানুষের অন্তরে কত গভীর।
বিশুদা কিন্তু ছাড়বার পাত্র নন। আমার কথার পাল্টা জবাবে বললেন–আপনাদের রণজিৎ সিং ছিলেন সংগীতপ্রেমীলোক। শুধু তাই নয়, সংগীত সাধকও। কিন্তু আমাদের কাছে ওস্তাদি গান শুধু কসরত বলে মনে হয়।
আসরের গাল্পিক সাহিত্যিক বললেন—ওস্তাদী গানের সমঝদার হতে হলে নিজের মধ্যে খানিকটা প্রস্তুতি থাকা চাই। এই কারণেই রবীন্দ্রনাথ গায়ক ও শ্রোতার সম্পর্ক সম্বন্ধে বলেছেনএকাকী গায়কের নহে তো গান, গাহিতে হবে দুইজনে। গায়কের সঙ্গে শ্রোতার অন্তরের তন্ত্রী একসুরে বাঁধা থাকা চাই।
সব্যসাচী লেখক বললেন–রণজিৎ সিং-এর আরও কিছু ঘটনা আমাদের বলুন।
না-লিখে-সাহিত্যিক বিশুদা বললেন—ও, গল্প লেখার খোক বুঝি জোগাড় করছেন।
আমি বললাম-সে দিনের ঘটনায় মানুষটির চরিত্রের আরেকটা দিক আমার কাছে খুলে গেল। এবার আমি ওঁর পুরোপুরি চ্যালা বনে গেলাম। কিন্তু তাঁর শাগরেদ করার সৌভাগ্য আমার বেশিদিন হয় নি।
ওঁর শরীর ক্রমশই খারাপ হয়ে পড়েছিল। একা মানুষ, তার উপর সাত্ত্বিক ব্রাহ্মণ। পাক খেতেন। শরীর ভেঙ্গে পড়ায় কিছুদিনের ছুটি নিয়ে বিশ্রামের জন্য বহরমপুর গেলেন আর ফিরলেন না। শান্তিনিকেতন ছেড়ে যাবার মাস দেড়েক বাদেই খবর এল তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
কথায় কথায় কখন যে আটটা বেজে গেছে টের পাই নি। ওদিকে রঙমহলে কনফারেন্স বোধ হয় শুরু হয়ে গেল। পথে কোন একটা পাঞ্জাবীর দোকানে ঢুকে রুটি আর মাংস-তড়কা খেয়ে সারা রাত জাগতে হবে। বৈঠকের বন্ধুরা উঠি-উঠি করেও উঠছেন না, আড্ডার এমনই মৌতাত। আমার তাড়াতাড়ি উঠবার প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও গতরাত্রে সংগীত সম্মেলনে যে-কাণ্ডটা হয়েছিল তা না বলে থাকতে পারলাম না। আমি বললাম-আপনারাই বলুন, আমার চেহারার সঙ্গে বিখ্যাত গায়ক ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের কি খুব বেশী মিল আছে?
বিশুদা জ্বজোড়া কুঁচকে চোখের দৃষ্টিতে তীক্ষ্ণতা এনে আমাকে নিরীক্ষণ করতে লাগলেন। আমি যেন চিত্র প্রদর্শনীর দেয়ালের ঝোলানো পোট্রেট আর জবরদস্ত আর্ট-ক্রিটিক বিশুদা কখনও সামনে ঝুকে, কখনও চেয়ারের গায়ে শরীরটা টান করে পিছিয়ে নিয়ে, কখনও ডান দিকে হেলে, কখনও বাঁদিকে ঝুকে, আমাকে দেখে নিয়ে বললেন–হু, তা কিছুটা মিল আছে বলেই তো মনে হয়।
আসরের গাল্পিক সাহিত্যিক বললেন–গ্রামোফান রেকর্ডের খামের উপর ভীষ্মদেব চাটুজ্যের যে ফোটো ছাপা হয় তার সঙ্গে চেহারার বেশ আদল
আমি বললাম-এ-কথা আরও অনেকেই আমাকে আগেও বলেছেন, আমি বিশ্বাস করি নি। কিন্তু বিশ্বাস করতে হল গতকাল রাত্রের এক অভাবনীয় ঘটনায়।
সব্যসাচী লেখক বললেন—কি ব্যাপার, একটা কিছু কমেডি অফ এররস ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে।
আমি বললাম-ঠিক তার উল্টো। ট্রাজেডি অফ এররস বলতে পারেন।
গতকাল রাত বারোটার সময় মুস্তাক হুসেন খাঁ আসর থেকে গান গেয়ে বিদায় নিলেন, তার পরে ছিল সরোদ বাজনা। এই অবসরে পান-জর্দা খেয়ে ঘুম তাড়াবার মতলবে অডিটরিয়ম থেকে বেরিয়ে বারান্দা ধরে এগোচ্ছি কোণার পানের দোকানের দিকে। হঠাৎ নজরে পড়ল সামনে এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে আমাকে নিরীক্ষণ করছেন। কঁচা-পাকা গোঁফ, পরনে গিলে হাতা আদ্দির পাঞ্জাবি, কাঁধে পাট করা গরম শাল, বাঁ-হাতে কেঁচানন ধুতির খুট ধরা, ডান হাতে হাতির দাঁতের বাঁট লাগানো ছড়ি। ভদ্রলোকের কাছে যখন এসে পড়েছি হঠাৎ ঢিপ করে আমাকে এক প্রণাম; একেবারে পা ছুঁয়ে প্রণাম। খুড়োর বয়েসী ভদ্রলোকের এমন অতর্কিত আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। এক লাফে বেশ খানিক পিছনে হটে গেলাম। মুখে বিগলিত হাসি এনে গদগদ ভাষায় বললেন–ওস্তাদ, ঠিক চিনতে পেরেছি। শুনেছি আপনি কলকাতায় ফিরে এসেছেন। এখন আপনার শরীর সুস্থ তো?
