ছাত্রসংখ্যা যখন ক্রমশই বাড়তে লাগল তখন ভীমরাও শাস্ত্রীর পক্ষে আর একা গান শেখানো সম্ভব হয়ে উঠছিল না। রবীন্দ্রনাথ তখন এমন একজন গুণী ওস্তাদের সন্ধান করছিলেন যিনি গান তো শেখাবেনই সেই সঙ্গে এস্রাজ, সেতার, তবলাও শেখাতে পারবেন। সৌভাগ্যক্রমে পেয়েও গেলেন। রবীন্দ্রনাথের পরম সুহৃদ কাশিমবাজারের মহারাজা প্রমথ চৌধুরীর কাছে খবর পেয়ে রণজিৎ সিংকে পাঠিয়ে দিলেন শান্তিনিকেতনে।
এক পুজোর ছুটির পর রণজিৎ সিং এসে উঠলেন লাইব্রেরী-ঘরের পিছনে খড়ের চালা বাড়ির একটা ঘরে। বয়স পঞ্চাশের উপর, সুতী নাকের নীচে একজোড়া গোঁফ ঠোটের দুপাশ দিয়ে থার্ড ব্রাকেটের মত ঝুলে পড়েছে। বাঁ-পাটা পঙ্গু, লাঠি ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে চলেন। অপূর্ব এস্রাজ বাজাতেন রণজিৎ সিংজী। সেতার ও তবলায় সমান দক্ষতা তাঁর ছিল কিন্তু গানের গলা ছিল কিছুটা কর্কশ। গান শেখানোর পদ্ধতি তিনি ভালই জানতেন। রণজিৎ সিংজীর আরেকটি গুণের পরিচয় পেয়েছিলাম বেশ কিছুদিন পরে। তিনি ছিলেন দক্ষ কারিগর। সেতার এস্রাজ ঘরে বসে নিজের হাতে বানাতেন। অবসর সময়ে যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করছেন, শিরীষ কাগজ দিয়ে কাঠ ঘষছেন, বার্নিশ লাগাচ্ছেন। রণজিৎ সিং মানুষটি ছিলেন আমাদের পরম বিস্ময়ের, ততোধিক বিস্ময়ের ছিল তার হাতুড়ি বাটালি বঁাদা নিয়ে যন্ত্র বানাবার পদ্ধতি।
রণজিৎ সিং-এর ঘরে ছিল আমাদের অবাধ গতি। কখনও আপন মনে এস্রাজ বাজাচ্ছেন, কখনও যন্ত্রপাতি নিয়ে সেতার বানাচ্ছেন আবার কখনও আমাদের সঙ্গে গল্প করছেন বহরমপুরের, কখনও রাজস্থানের। ভাঙ্গা-ভাঙ্গা হিন্দীমিশ্রিত বাংলা বলতেন বিকৃত উচ্চারণে, তাতে চন্দ্রবিন্দুর প্রয়োগ থাকত প্রয়োজনাতিরিক্ত।
জ্ঞান গোস্বামীর তখন খুব নাম ডাক। ওঁর গানের রেকর্ড তখন প্রতি ঘরে-ঘরে। তিনিও বহরমপুরের লোক। একদিন জ্ঞান গোস্বামীর কথা তার কাছে পাড়তেই বললেন—
গেনুর কথা বলছ? ওতো আমাদের বাড়ির ছেলের মত ছিল। ওর যখন তেরো-চৌদ্দ বছর বয়েস তখন আমার বাবার কাছে তালিম নিয়েছে, আমার কাছেও নিয়েছে।
বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করি—সে কি! আপনার কাছেও গান শিখেছেন?
হাঁ, শিখেছে বই কি। কত খাতির করত আমাকে। পায়ের জুতো নিজের হাতে কতবার খুলে দিয়েছে। তবে হ্যাঁ, মাথা ছিল ওর। একটা তান একবার দেখিয়ে দিলে চট করে তুলে ফেলত।
জিজ্ঞাসা করলাম–আপনার সঙ্গে আজকাল দেখা হয়?
কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বেদনা মিশ্রিত কণ্ঠে বললেন–গেনু আজকাল কি রকম বদলে গিয়েছে। নাম যশ টাকা হলে মানুষ বদলে যায়। মাঝে-মাঝে বহরমপুর আসে, খবরও পাই, দেখা হয় না।
একদিন বললাম-রণজিৎ সিংজী, হিন্দুস্থানী গান ভাল করে শিখবার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু আমার তো সে-রকম জ্ঞান নেই, শুনেছি দশ বারো বছর সময় লাগে। তাই আর সাহস করে এগোই নি।
রণজিৎ সিং বললেন–বুট, বিলকুল বুঢ় বাত। রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে সরগম্ সাধনা কর, যেমন করে মানুষ সকালে ঘুম থেকে উঠে ভগবানের নাম করে। মনমে সুর এসে গেলে কঠে আসতে কতক্ষণ। আর কণ্ঠে সুর এসে গেল তো ভগবানকে মিলে গেল। তখন প্রেমসে যত গান করবে, ভগবানের আশীর্বাদ ভি তো মিলবে।
১৯৩২ সালের কথা। শান্তিনিকেতন থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের একটি দল গিয়েছিল লক্ষে রবীন্দ্রনাথের একটি গীতিনাট্য অনুষ্ঠানের জন্য। সেই দলে রণজিৎ সিং ছিলেন, আমিও কি এক অছিলায় ভিড়ে গিয়েছিলাম। উপলক্ষটা ছিল লক্ষৌ ম্যারিস কলেজের বাৎসরিক অনুষ্ঠান। ম্যারিস কলেজের প্রশস্ত হল-এ তিনদিন ধরে হিন্দুস্থানী সংগীত সম্মেলনও চলছে, উত্তর ভারতের বহু গুণী ও বিখ্যাত ওস্তাদ এসেছেন। সুতরাং আমার কাছে লক্ষে আসাটা তীর্থক্ষেত্রে আসার সামিল। দলের অন্যান্যরা লক্ষে শহর ঘুরে দেখতে ব্যস্ত, আমি ও রণজিৎ সিংজী কনফারেন্সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে আছি। সময় কী ভাবে কোথা দিয়ে কেটে যাচ্ছে টেরও পাচ্ছি না।
দ্বিতীয় দিন প্রাতঃকালীন অধিবেশনের সর্বশেষ প্রোগ্রাম ছিল ভারত বিখ্যাত ধ্রুপদীয়া ওস্তাদ নসীরুদ্দিন খাঁ সাহেবের ধ্রুপদ গান। আমি আর রণজিৎ সিংজী তাড়াতাড়ি খাওয়া-দাওয়া সেরে একটা টাঙ্গা নিয়ে বেলা ১১টার মধ্যে হলে-এ এসে হাজির। তখন সাখাওয়াৎ হুসেন-এর সরোদ বাজনা চলছে। ঠিক বেলা বারোটার সময় আসরে এসে বসলেন ওস্তাদ নসীরুদ্দিন খা। যেমন বিশাল বপু তেমনি রাজকীয় তাঁর সাজপোশাক। খাঁ সাহেবের মত অতবড় ধ্রুপদীয়া তখন ভারতে দ্বিতীয় আর কেউ নেই। ইন্দোরের বিখ্যাত ঘরানার বংশধর তিনি। পিতা আল্লাবন্দে খাঁ, প্রপিতা বৈরাম খা, যাদের নাম উচ্চারণ করবার সময় আজও ওস্তাদের নাকে কানে হাত দিয়ে প্রণাম জানায়।
খাঁ সাহেব চোখদুটি মুদ্রিত রেখে সুর ছাড়লেন। মনে হল জোয়াবিদার কণ্ঠনিঃসৃত সুরের অনুরণন প্রেক্ষাগৃহের দেওয়ালে যেন কী খুজে বেড়াচ্ছে। কখনও বাঘের মত আওয়াজ পরমুহুর্তে বীণাধ্বনি। দীর্ঘ আলাপের পর যখন লয়ের কাজ শুরু হয়ে গেল তখন গমগম করছে আসর, যেন মেঘের গুরুগুরু আওয়াজ। কণ্ঠে কত রকম ছন্দে কত রকম ধ্বনি। নাদব্রহ্ম কথাটা শুধু শুনেই এসেছি, সেদিন প্রত্যক্ষ করলাম।
মাঝে মাঝে তাকিয়ে দেখছি রণজিৎ সিং-এর দিকে। যেন আফিং-এর নেশায় বুদ হয়ে বৃদ্ধ ঝিমোচ্ছে। দুই পায়ের মাঝখানে রাখা লাঠিটার ঘোড়ামুখখা বাটে দুই হাত রেখে তার উপর থুতনিটা ঠেকিয়ে চোখ বুজে বসে আছেন রণজিৎ সিংজী। কোন সাড়াশব্দ নেই।
