হইহই করে উঠলো পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহের শ্রাতৃমণ্ডলী, আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল। বেনারসী লচাও ঠুংরির কাটা-কাটা সুক্ষ্ম কাজ, যেন থোক। থেকে একটি-একটি করে আঙ্গুর তুলে এনে রস নিঙড়ে ঢেলে দিচ্ছেন। আর কী অপরূপ গায়ন ভঙ্গিমা। কোলের কাছে তানপুরাটি সোজা দাঁড়িয়ে। চারটি তারের উপর ডান হাতের চাপার কলির মত মধ্যমা আর তর্জনী যেন নেচে বেড়াচ্ছে। বাঁ হাতটি কখনও কানের উপর চেপে ধরে সুর যাচাই করে নিচ্ছেন, আবার কখনও সামনে বিস্তৃত করে সমের মুখে পঞ্চমে সুর তুলে একটু ঝোঁক দিয়ে গেয়ে উঠছেন লাগে শ্যাম! নজরিয়া কথাটি নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে যখন ঘোট ঘোট তান তুলে নানাবিধ নকশার আলপনা আঁকছিলেন তখন তার কাজল-মাখা খঞ্জনসদৃশ চঞ্চল আঁখিতারায় যৌবনের বহু-অভ্যস্ত তির্যক চাহনি সংযমের বাঁধ ভেঙ্গে নেচে উঠছিল। সুরের মায়াজাল আর মদভরনয়নার মোহিনী শক্তি অগণিত শ্রোতাকে আবেশে বিভোর করে ফেলেছে।
গান শেষ হতেই করতালির শব্দে প্রেক্ষাগৃহ ফেটে পড়ছে। শ্রোতাদের ঘন-ঘন অনুরোধ, আরেকটা গান শুনতে চাই। বাইজী কিন্তু আর গাইলেন না। শ্রোতাদের কাছে নিবেদনের ভঙ্গিতে ছোট্ট একটি নমস্কার জানিয়ে তানপুরাটি আলগোছে সামনে শুইয়ে রেখে ধীরপদক্ষেপে স্টেজ ছেড়ে উঠে গেলেন গ্রীনরুমে। অর্ধনিঃশেষিত পানীয়র বোতলটা তখনও রাখা ছিল। একবার শুধু আড়চোখে সেদিকে তাকালেন। আর তার প্রয়োজন নেই। তারপর নিঃশব্দে বাইরে চলে এলেন অপেক্ষমান গাড়ির কাছে। তাঁকে অভিনন্দন জানাবার জন্যে সেখানে প্রচুর ভিড় কিন্তু সেদিকে তার হৃক্ষেপ নেই। জীবনে বহু প্রসংশা, বহু তারিফ বহু সমাদর তিনি পেয়েছেন, আজ তিনি সে-মোহের অনেক উর্ধ্বে। গাড়ি ছাড়বার সময় উদ্যোক্তাদের নমস্কার জানিয়ে শুধু বললেন–ম্যয় চলতী হুঁ, ফির মিলুঙ্গী।
গাড়ির চারপাশের মুগ্ধ জনতার এক প্রান্তে আমিও এসে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিলাম। গাড়ি চলে যেতেই বাইজীর কণ্ঠে প্রথম গাওয়া গজলের দুটি কলি আমার অন্তরে গুঞ্জরিত হয়ে উঠল—জিন্দগী ইউভী গুজরহী যাতি, ক্যোঁ তেরা রাহ্গুজর ইয়াদি আয়া। সে-কেন দেখা দিল রে, না দেখা ছিল রে ভাল।
বিশুদা বললেন–অব সমঝ লিয়া। এতক্ষণে বোঝা গেল কেন আপনি গান-বাজনার আসর পেলে আর সবকিছু ফেলে ছুটে যান।
অরসিককে কি করে বোঝাব যে সংগীতের আস্বাদ ঈশ্বরাষ্পদের সামিল। বিশুদার কথার প্রতিবাদ না করে শুধু বললাম-যে কোন ভালো গায়কের গান শুনতে পাওয়াটাই সৌভাগ্য। সংসারের শত কর্মে বিক্ষুদ্ধ চিত্তকে তিন চারঘণ্টার জন্য এমন একটা সুরলোকে পৌঁছে দেয় যেখানে সুরের আলো ভুবন ফেলে ছেয়ে, সুরের হাওয়া চলে গগন বেয়ে। সেই সময়টুকু রবীন্দ্রনাথেরই ভাষায় আপনার মনে হবে-সমাজ সংসার মিছে সব, মিছে এ জীবনের কলরব।
সব্যসাচী লেখক টিপ্পনী কেটে বললেন–অর্থাৎ সুর ও সুরা কথা দুটির শব্দগত মিল যতটা অর্থগত মিলও ততটাই।
আমি বললুম-শব্দগত মিল থাকলেও এ-দুইয়ের ক্রিয়ার পার্থক্য অনেক। সুরের অমৃত যতই পান করুন তৃষ্ণা ততই যাবে বেড়ে। সুরা মাত্ৰাধিক হলেই মাতাল হতে হয়।
এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল আমার ছাত্রজীবনে শান্তিনিকেতনের শাস্ত্রীয় সংগীতগুরু রণজিৎ সিং-এর কথা। রণজিৎ সিং ছিলেন বহরমপুরের লোক। তার বাপ-ঠাকুরদা ছিলেন রাজস্থান, গান বাজনা শিক্ষকতার কাজ নিয়ে বহরমপুরে এসে তারা স্থায়ীভাবে সেখানেই বসবাস করেছিলেন। বাংলা দেশে বিষ্ণুপুর যেমন ধ্রুপদের জন্য বিখ্যাত, বহরমপুর ছিল খেয়াল ও ঠুংরির জন্য প্রসিদ্ধ। মুর্শিদাবাদের নবাব ও কাশিমবাজারের মহারাজা ছিলেন শাস্ত্রীয় সংগীতের বড় পৃষ্ঠপোষক, এক সময়ে বহু গুণী ওস্তাদের সমাগম ছিল এই দুই দরবারে। রণজিৎ সিং-এর পূর্বপুরুষ কাশিমবাজারের মহারাজার আমন্ত্রণেই বহরমপুরে এসেছিলেন। এস্রাজ ও সেতার বাজনায় এই পরিবার ছিলেন বহরমপুরে বিখ্যাত।
শান্তিনিকেতনে ছাত্ররা যাতে হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সংগীত চর্চা করে সেদিকে রবীন্দ্রনাথের ছিল কড়া নজর। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে ছাত্রদের মনে হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সংগীতের ভিত পাকা না হলে রাগরাগিণী ও তাল লয়ের বোধ জাগবে না। কিন্তু আমার মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ এটাও জানতেন যে, বিদ্যালয়ের ছাত্ররা যদি তার রচিত গান ভবিষ্যতে কোনদিন একান্তভাবে চর্চা করতে চায় তাহলেও হিন্দুস্থানী সংগীতের উপর বেশ কিছুটা দখল তাদের থাকা প্রয়োজন। কেননা রবীন্দ্রসংগীতের পূর্ণ রস উপভোগ করতে হলে চাই সংস্কৃতিবান রুচিশীল মন আর হিন্দুস্থানী সংগীতের রাগরাগিণীবোধ।
এই কারণে ছোটবেলা থেকেই আমরা শান্তিনিকেতনে দেখেছি মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ভীমরাও শাস্ত্রীকে। তিনি ছিলেন একাধারে সংস্কৃত শাস্ত্রে পণ্ডিত এবং হিন্দুস্থানী সংগীত শাস্ত্রে পারঙ্গম। বাল্যকালে ওঁর কাছে আমরা বসন্তবাহারের সুরে গান শিখেছি—ক্যায়সে নিকসে চাঁদনী ইমনকল্যাণে–তুহি ভজ ভজ রে, আশাবরীতে—উন সন যায়কা হোরী ইত্যাদি গান। ভীমরাও শাস্ত্রীরই উদ্যোগে সেই সময় হিন্দুস্থানী সংগীতের স্বরলিপি সমেত দুটি চটি সংকলনগ্রন্থ শান্তিনিকেতন প্রেস থেকে বাংলা হরফে ছেলে প্রকাশিত হয়েছিল। বই দুটির নাম ছিল সংগীত পরিচয় ও সংগীত র্পণ। সে-বই ছিল শান্তিনিকেতনের সংগীত শিক্ষার্থী ছাত্রদের পাঠ্যপুস্তকের অঙ্গীভূত। বিভিন্ন রাগরাগিণীর উপর প্রচলিত বিখ্যাত হিন্দী গানগুলি অতি সযত্নে সংগ্রহ করে এই সংকলনগ্রন্থ প্রকাশ করা হয়েছিল। দুঃখের বিষয় আজ ভীমরাও শাস্ত্রী বেঁচে নেই, বই দুটিও বহুকাল ধরে পাওয়া যায় না, গানগুলিও হারিয়ে গিয়েছে।
