জ্ঞান গোঁসাই স্টেজ-এ এসে যখন বসলেন সঙ্গে সঙ্গে একটা ঘরোয়া পরিবেশ দেখা দিল। শিষ্য শাগরেদ পরিবৃত হয়ে মাঝখানে বসে পরিচিত জনদের সঙ্গে নমস্কার বিনিময় হল, কুশল সংবাদ জিজ্ঞাসা করলেন। অবশেষে জৌনপুরীতে গান ধরলেন ফুলবনকো মৈ তো। ঠেকা চলেছে-তবলায় ধা, ধিন ধিন্ না। পিছন থেকে দু-দুটো তানপুরা ছাড়ছে সুর, অপর পাশে সম ফাঁক তাল লক্ষ্য রেখে হারমোনিয়াম বাজিয়ে চলেছে অপর এক শিষ্য। জ্ঞানবাবুর দরাজ ও বলিষ্ঠ কণ্ঠের গানে গমগম করছে আসর। সবেমাত্র একটা কঠিন তান তুলে সমে এসে ছেড়েছেন, এমন সময় ওঁর বিশেষ পরিচিত এক ব্যক্তি স্টেজের উপর এসে বসলেন। ভদ্রলোককে নজরে পড়া মাত্র জ্ঞানবাবু হাতজোড় করে মুখে হাসি এনে ঘাড়টা ডানদিকে কাত করলেন, অর্থাৎ ভালো তো?
আগন্তুকও তদ্রূপ ভঙ্গিতেই জানিয়ে দিলেন ভালো আছি।
তবলায় ঠেকা তখন ফাঁক দেখিয়ে সমের কাছাকাছি প্রায় এসে পড়েছে। এক ঝটকায় মুখটা আগন্তুকের দিক থেকে তবলচীর দিকে ফিরিয়ে ডান হাতে শূন্যে এক প্রচণ্ড থাপ্পড় মেরে বলে উঠলেন—হঃ। বুঝলাম তবলচীকে সমের মুখে জানান দিলেন যে, উনি তালে ঠিক।
গাইয়ে-বাজিয়েদের মেজাজ শরীফ না থাকলে আসর বরবাদ হয়ে যায়। এ-অভিজ্ঞতা আমার কিছু আছে, কারণ গান-বাজনার মহফিল-এর খবর পেলেই বাহুত গিয়ে আসরের এক কোণায় আসন নেওয়া আমার বহুদিনের অভ্যেস। আমি তাই বললাম—
গান-বাজনার আসরে ওস্তাদদের মেজাজ খুশ, না থাকলে গান জমে না। সেইজন্যে সব আসরেই একদল সমঝদার থাকেন যাদের কাজই হচ্ছে মাথা নেড়ে ওস্তাদদের তারিফ করা। ওস্তাদ যদি একটা সূক্ষ্ম কাজ করলেন অমনি পার্শ্বচর শ্রোতাদের মধ্যে হইহই রব উঠল-কেয়া বাত, কেয়া বাত্। তুনে তো গজব কর দিয়া? মাহ্শাল্লা। হায় হায়। এ ছাড়া ওস্তাদের সামনেই তারা এমন প্রশস্তি শুরু করে দিলেন যেন জীবনে আর কখনও এরকম গান তারা শোনেন নি। প্রত্যেকটি তারিফকে সেলাম জানিয়ে ওস্তাদরা সম্মানিত করেন। এটাই মহফিল-এর প্রচলিত রীতি।
ওস্তাদদের মেজাজের কথা বলছিলাম। একবার কলকাতার এক সংগীত সম্মেলনের উদ্যোক্তারা বেনারসের বিগতযৌবনা এক বিখ্যাত ঠুংরি-গাইয়ে বাইজীকে আমন্ত্রণ জানালেন। তার সঙ্গে লিখিত চুক্তি হল রেলভাড়া আর হোটেল খরচ সমেত হাজার টাকা, অলিখিত চুক্তি ছিল আসরে গান গাইতে বসার আগে এক পাইন্ট স্কচ হুইসকি। উদ্যোক্তারা লিখিত চুক্তি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন কিন্তু তালেগোলে অলিখিত চুক্তির কথাটা গিয়েছিলেন বেমালুম ভুলে। বিখ্যাত বাইজীর গান শোনার লোভে সেদিন প্রেক্ষাগৃহ লোকে লোকারণ্য। যথাসময়ে বাইজীকে হোটেল থেকে নিয়ে আসা হল, মাইক্রোফোন-এ ঘোষণা হয়ে গেল—কিছুক্ষণের মধ্যেই উনি আসরে গান গাইবেন। গ্রীনরুমে বসে তানপুরা বাঁধা হল, তবলা বাঁধা হল, শারেঙ্গী বাধা হল। এবার আসরে গিয়ে বসলেই হয়। হঠাৎ বাইজী বেঁকে বসলেন ময় তো গাঁউঙ্গী নহী। এদিকে অধীর আগ্রহে শ্রোতা অপেক্ষা করছে, ওদিকে বাইজীর ঐ এক কথা গাউদী নহী। এমন সময় উদ্যোক্তাদের মধ্যে একজনের মনে পড়ে গেল অলিখিত শর্তের কথা। কপাল চাপড়ে বলে উঠলেন, এই র্যা, নটা বেজে গেছে, এখন তো কোন দোকানও খোলা পাব না যে দৌড়ে গিয়ে কিনে আনব। এখন উপায়? উপায় একটা হল। সম্মেলনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন এক মাভোয়ারী ভদ্রলোক। বাইজীর আসরে আসতে দেরি হচ্ছে কেন খোঁজ নেবার জন্যে গ্রীনরুমে গিয়ে শুনলেন বাইজীর মেজাজ নেই, মেজাজের বন্দোবস্ত না হলে উনি গাইবেন না। প্রেসিডেন্ট বললেন—ইয়ে বাত? মুঝে কিউ নেহি বোলা? সঙ্গে সঙ্গে ড্রাইভারকে ডেকে বাড়ি পাঠিয়ে এক বোতল মেজাজ আনিয়ে ফেললেন। বোতলটা হাতে দিতেই বাইজীর মুখে হাসি ফুটল। সোডা আর গেলাসের কথা জিজ্ঞাসা করতেই বললেন–কোই জরুরত নহী। বোতলের ছিপিটা অভ্যন্ত পাকা হাতে খুলে ঢকঢক করে গলায় ঢাললেন। আধ বোতল যখন নিঃশেষ, বোতলে আবার ছিপি আঁটলেন। হাণ্ডব্যাগ থেকে আয়না বার করে চোখের কাজল আর গালের রঙ ঠিক আছে কিনা দেখে নিলেন, রুমাল বার করে কপালের ঘাম আলতো ভাবে মুছে নিয়ে বললেন–ববালিয়ে কৌন গান গাঙ। গজল ইয়া ঠুংরি। উদ্যোক্তারা হাফ ছেড়ে বাঁচলেন, বাইজীর মেজাজ শরীফ। ওদিকে প্রেক্ষাগৃহে জনতা বিলম্বে অধৈর্য। ঘোষণা হল এবারে উনি আসরে এসে বসছেন। প্রথমে গাইবেন গজল, পরে ইংরি। হর্ষোৎফুল্ল শ্রোতাদের ঘন ঘন করতালির মধ্যে নীলাম্বরী শাড়ি পরে, মাথায় ঘোমটা দিয়ে, আসরে এসে প্রথমে ধরলেন গজল–
জিন্দগী ইউঁভী গুজরহী যাতি
ক্যোঁ তেরা রাহ,গুজর ইয়াদি আয়া।
গাল্পিক সাহিত্যিক এই সময় বললেন—গানটার প্রথম দুই কলির সুরের একটু আন্দাজ দিতে পারেন?
গানের আরম্ভের সুর আমার মনে গেঁথে গিয়েছিল। গুনগুন করে গেয়ে শোনাতেই বিশুদা বললেন—গানের অর্থটিও তো জানা দরকার।
বললাম—অর্থ অতি সহজ। জীবন তো এভাবেও কোনমতে কেটে যেত, তবু কেন তোমার সঙ্গে আবার দেখা হল?
সব্যসাচী লেখক কানের কাছে মুখ এনে চাপা স্বরে জিজ্ঞাসা করলেনবাইজীর বয়েসটা জানতে পারি?
আমি বললুম—বাইজীর বয়েস পঞ্চাশোর্ধ। কিন্তু যৌবনকালে যে অপরূপ সুন্দরী ছিলেন তা আজও তাঁর দেহসৌষ্ঠব, গায়ের রং আর চোখমুখের নিখুত গড়নেই বোঝা যায়। গজল শেষ করে ঠুংরি ধরলেন— পিয়া তেরা তিরসি নজরিয়া লাগে শ্যাম।
