পারলেও তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন লয় ঠিক রেখে বড় তালের খেয়াল কি ভাবে পথ কেটে এগিয়ে চলে উদারা থেকে মুদারায়, আবার মুদারা থেকে তারায়।
দপ্তরের কাজের ফাঁকে-ফাঁকে মনে পড়েছিল বৃদ্ধ খাঁ সাহেবের সেই বেদনাক্লিষ্ট মুখ যখন তারার গান্ধারে সুরকে দৃপ্ত ভঙ্গিমায় দাড় করাবার চেষ্টা করছেন কিন্তু পারছেন না।
বিকেল হয়ে এসেছে, বৈঠকের বন্ধুরা একে-একে আবিভূত হলেন। এসেছেন সব্যসাচী লেখক, গাল্পিক কথা-সাহিত্যিক, তরুণ কবি। আর এসেছেন আমাদের না-লিখে-সাহিত্যিক বিশুদা।
ঘরে ঢুকেই বিশুদা বললেন–এ কি, আজ যে টেবিল পরিষ্কার, তাড়াতাড়ি বেয়োতে হবে বুঝি?
বললাম সংগীত সম্মেলনের কথা। আজ আবার আলাউদ্দিন খাঁ ও আলী আকবরের যুগলবন্ধ সরোদ তারপর গোলাম আলীর গান। সুতরাং যেতেই হবে এবং গতকালের মত রাতও জাগতে হবে।
তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বিশুদা বললে—কি করে যে রাতের পর রাত জেগে আপনারা কালাতি গান শোনেন বুঝে পাই না।
বৈঠকে সেদিন উপস্থিত ছিলেন আরেকজন কথাসাহিত্যিক, ইনস্যুরেন্স অফিসের বড় চাকুরে। তিনি বললেন–
আর বলেন কেন। লক্ষৌ-এ আমি এক ওস্তাদের পাল্লায় পড়েছিলাম। গিয়েছি মোটর অ্যাকসিডেন্টের একটা কেস নিয়ে। যে-হোটেলে উঠেছিলাম সেই হোটেলেই আছেন বরোদার ওস্তাদ ফৈয়জ খাঁ। আর আছেন তত আছেন, একেবারে আমার পাশের কামরাতেই।
ভারত বিখ্যাত ওস্তাদের পাশের কামরায় থাকার সৌভাগ্যে ঈর্ষা হওয়া স্বাভাবিক। আমি বললাম
শুনেছি খাঁ সাহেব রোজ সকালে তিন-চার ঘণ্টা রেওয়াজ করেন আর সে নাকি অপূর্ব। আপনি তো মশাই ভাগ্যবান।
বিরক্তির সঙ্গে বললেন—রাখুন মশাই। আমি আমার কাজকর্মের ধান্দায় সকাল নটার মধ্যেই বেরিয়ে যেতাম, ফিরতাম সন্ধ্যায়। উনি বেরিয়ে যেতেন সন্ধ্যায় আর ফিরতেন সকাল নটায়। আমার সঙ্গে দেখা হবেই বা কখন আর রেওয়াজই বা শুনব কখন? কিন্তু একদিন উনি মধ্যরাত্রে কখন ফিরেছেন জানি না। সকালে নটার মধ্যেই আমার বেরোবার প্রচণ্ড তাড়া, সেদিনই লক্ষ্মৌ-এর কাজ চুকিয়ে কলকাতায় ফিরতে হবে। পাশাপাশি দুটো কামরার একটা ছিল কমন বাথরুম। তাড়াতাড়ি তোয়ালে-সাবান নিয়ে বাথরুমে ঢুকেই ছিটকে বেরিয়ে আসতে হল। জল চৌকির উপর খালি গায়ে লুঙ্গি পরে এক বৃদ্ধ বসে, আরেকটা লোক তার গায়ে তৈল মর্দনে ব্যস্ত। চানের ঘরে ঢুকতেই বৃদ্ধ হাত নেড়ে এমন এক ধমক দিলেন যে পালিয়ে আসার পথ পাই না। লোকটা তত আচ্ছা অভদ্র! তখুনি চলে গেলাম ম্যানেজারের কাছে। তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন—সে কি মশায়, উনিই তো ওস্তাদ ফৈয়জ খাঁ। আমি বললাম-হতে পারে উনি মন্তবড় ওস্তাদ, কিন্তু আমাকে ধমক দেবার তার কি অধিকার আছে। ম্যানেজার হেসে বললেন–ওটা ধমক নয়, গমক। গমক তান ছেড়েছিলেন। আপনি তো সকাল-সকাল রোজ বেরিয়ে যান। সারারাত বাইরে কাটিয়ে সকালে ফিরে এসে বাথরুমে উনি ঘণ্টা দুই তেল মালিশ করান, সেই সঙ্গে চলে রেওয়াজ।
এ-কথায় সবাই হেসে উঠল। আমিই শুধু দুঃখ জানিয়ে বললাম-আপনি সত্যিই দুর্ভাগা। এতবড় একজন ওস্তাদকে কাছে পেয়ে হেলায় হারালেন?
সব্যসাচী লেখক সুযোগ পেয়ে টিপ্পনী কেটে বললেন—শাস্ত্রে কি আর সাধে তিনবার দিব্যি গেলে বলেছে–আরসিকেযু রসস্য নিবেদনং মা কুরু, মা কুরু, মা কুরু।
গাল্পিক কথা-সাহিত্যিক এবার মুখ খুললেন। এক সময়ে বাপ-মাকে লুকিয়ে সংগীত চর্চা করেছেন, নিধুবাবুর টপ্পার কাজ আজও ওঁর গলায় অনায়াসে খেলে যায়; লক্ষৌ-ফেরত সাহিত্যিকের পক্ষ নিয়ে বললেন–ওঁর আর দোষ কি। গানের রাজা রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত ওস্তাদদের ভয় পেতেন। শুনেছি একবার বরানগরে প্রশান্ত মহলানবিশের বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ এসে উঠেছেন। দিলীপকুমার রায় রবীন্দ্রনাথকে ধরে পড়লেন—বরোদা থেকে এক বিখ্যাত ওস্তাদ কলকাতায় এসেছেন, নাম ফৈয়াজ খাঁ। তাঁর গান শুনতেই হবে। রবীন্দ্রনাথ প্রস্তাব শুনেই আতঙ্কিত। কিন্তু দিলীপ রায় ছাড়বার পাত্র নন। গান শোনাবেনই। রবীন্দ্রনাথ নিতান্ত নিরুপায় হয়ে ভয়ে ভয়ে বললেন—মণ্টু, তুমি যখন বলছ তখন গান শোনাই যাক। কিন্তু তোমার ঐ ওস্তাদটি থামতে জানেন তো?
আমি বললাম—সে ঘটনা আমার জানা। বরানগরে একদিন সকালে দিলীপ রায় উদ্যোগী হয়ে ফৈয়াজ খাঁর গানের আসর বসালেন। পুরো একঘণ্টা তৈরীতে খেয়াল গাইবার পর যখন ঠুংরি ধরলেন বাজু বল খুল খুল যায় তখন রবীন্দ্রনাথের চোখ মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল। বেলা বারোটা বেজে গেছে, খাবার সময় উত্তীর্ণ, রবীন্দ্রনাথের হুঁশ নেই। ফৈয়াজ খাও তখন এতবড় একজন সমজদার গুণী শ্রোতাকে পেয়ে মেতে উঠেছেন। দরদী কণ্ঠে অন্তরের সমস্ত আবেগ উজাড় করে যখন একটি কলি নানা ভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পাইছেন সাবরিয়া নে যাদু ডারা তখন রবীন্দ্রনাথের ঈষৎ শিয়শ্চালন দেখেই বোঝা গিয়েছিল যে ভৈরবীর বেদনা-মধুর সুরের মূছনা তাঁকে আচ্ছন্ন করেছে।
সেদিন সকালে ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁর গান শুনে রবীন্দ্রনাথ উচ্ছ্বসিত হয়ে যে প্রসংশা করেছিলেন তা পরদিন সব খবরের কাগজে প্রকাশিত হয়েছিল।
সব্যসাচী লেখক বললেন—ফৈয়াজ খাঁর গান শোনার সৌভাগ্য আমার কখনও হয় নি। কিন্তু আরেক ওস্তাদের গান শোনার একটা ঘটনা বলি। বহুকাল আগে পূরবী সিনেমায় নিখিল বঙ্গ সংগীত সম্মেলনের অধিবেশন চলছে। বন্ধু-বান্ধবের পাল্লায় পড়ে রবিবার সকালের অধিবেশনে গান শুনতে গেলাম। সেদিনের প্রধান আকর্ষণ ছিল জ্ঞান গোঁসাই-এর গান।
