ছেলেটি বললে–এ আর কি এমন কাজ করেছি যার জন্যে আপনি এত সঙ্কোচ বোধ করছেন। আপনারা কাশীর গঙ্গায় ডুব দিয়ে পূণ্য করেন, আমরা পূণ্য করি ডুবে যাওয়া মানুষদের ডাঙায় তুলে।
রামানন্দবাবু বললেন—তা কি হয়? তুমি আমার প্রাণ রক্ষা করেছ, প্রতিদানে আমারও তো একটা কর্তব্য আছে। বল, তোমার জন্য কী আমি করতে পারি।
যুবকটি এবার যেন একটু কষ্ট হয়েই বললে-ভারি তো একটা তুচ্ছ জীবনকে ডুবজল থেকে ডাঙ্গায় টেনে তুলেছি। তার জন্য পুরস্কার নিতে হবে? আমাকে কি আপনি পুরীর স্বর্গদ্বারের নুলিয়া ঠাওরেছেন?
রামানন্দবাবু এবার একটু থমকে গেলেন। তবু বললেন–আমার জীবনটা তুচ্ছ হতে পারে। কিন্তু আজকের এই ঘটনাটা আমার কাছে তুচ্ছ নয়। অন্তত তোমার পরিচয়টা জানতে পারি কি?
যুবকটি এবার গর্বের সঙ্গে বুক ফুলিয়ে বললে—আমরা হচ্ছি কাশীর ঝাণ্টু ছেলে। জল থেকে টেনে তোলার কাজ আমাদের হরবখত করতে হয়। বলব কি মশাই, কলকাতার লোকগুলো কাশীয় গঙ্গাকে ভাবে কালীঘাটের বুড়িগঙ্গা।
প্রায়ই ডোবে আর আমাদের চুলের মুঠি ধরে টেনে তুলতে হয়। বাড়ফাটাইয়ের আর জায়গা পায় না।
রামানন্দবাবু বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন-ওই যে কথাটা বললে তার অর্থ তো বুঝলাম না।
বাড়ফাট্টাই? নোয়াব মশাই, নোয়াব। কলকাতার রকবাজদের ভাষায়।
আরও অবাক হয়ে রামানন্দবাবু জিজ্ঞাসা করলেন-বোয়াব কথাটারই বা অর্থ কি।
যুবকটি এবার একটু তাচ্ছিল্যের সুরে বললেও, আপনি দেখছি কিস জানেন না। কোলকাতার নন বুঝি?
রামানন্দবাবু বললেন—এখন আমি কলকাতারই লোক। যে-বয়সে ওসব ভাষা জানবার বুঝবার ও শিখবার কথা সে বয়েসটা আমার কেটেছে এলাহাবাদে।
তাই বলুন। তবে আর এসব কথা জানবেন কোত্থেকে। বাঙালরা যাকে বলে ফুটানি, ঘটিরা যাকে বলে বোয়াব কাশীতে তাকেই বলে বাড়ফাটাই।
আর কালক্ষেপ না করে কোটের পকেট থেকে নোটবুক তুলে এনে এক পাতায় শব্দ দুটি টুকে নিলেন। উদ্দেশ্য বোধ হয় আভিধানিক রাজশেখর বসু অথবা ভাষাতান্ত্রিক সুনীতি চাটুজ্যের কাছ থেকে শব্দ দুটির উৎপত্তিগত অর্থ জেনে নেওয়া। অপর পাতায় নিজের নাম ও প্রবাসী কার্যালয়ের ঠিকানা লিখে পাতাটা ছিড়ে ছেলেটির হাতে দিয়ে বললেন—আমার নাম ঠিকানা দেওয়া রইল। ভবিষ্যতে যদি কোন দিন আমি তোমার কোন প্রয়োজনে সাহায্য করতে পারি নিজেকে কৃতার্থ মনে করব।
এই ঘটনার পর মাস ছয় পার হয়ে গেছে। একদিন দুপুরে প্রবাসী অফিসের দোতলার ঘরে বসে রামানন্দবাবু গভীর মনোনিবেশ সহকারে কড়া সম্পাদকীয় মন্তব্য লিখছেন। বিষয় হচ্ছে সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা। টেবিলের উপর সেন্সস রিপোর্ট, ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়র ইত্যাদি ইতস্তত ছড়ানো। এমন সময় একটি যুবকণ্ঠের আওয়াজ কানে এল—আসতে পারি স্যার?
লেখার প্যাড থেকে চোখ তুলে দেখলেন একটি বলিষ্ঠদেহ যুবক দরজার চৌকাঠটার ওপারে দাঁড়িয়ে।
যুবকটি বিনয়জড়িত হাসি হেসে বললে-চিনতে পারলেন স্যার? সেই কাশীর মণিকর্ণিকার ঘাট?
বিলক্ষণ, চিনতে পারব না? গঙ্গায় ডুবে যাচ্ছিলাম, তুমিই তো আমাকে উদ্ধার করেছিলে। ওখানে দাঁড়িয়ে কেন? এস এস, ভিতরে এস। উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন রামানন্দবাবু।
সন্তর্পণে ঘরে ঢুকে টেবিলের পাসে ছেলেটি সসম্ভ্রমে দাঁড়িয়ে রইল, চেয়ারে বসতে বলা সত্ত্বেও বসল না।
রামানন্দবাবু বললেন—আমি খুব খুশী হয়েছি তুমি এসেছ। এবার বল আমি তোমার জন্য কী করতে পারি।
যুবকটি যেমন সন্তর্পণে ঘরে ঢুকেছিল ততোধিক সন্তর্পণে বুক পকেট থেকে একটি ভাজ করা কাগজ বার করে রামানন্দবাবুর হাতে দিল।
রামানন্দবাবু ভাবলেন নিশ্চয় চাকরির দরখাস্ত, একটা রেকমেণ্ডেশন বা কার্যাক্টার সার্টিফিকেট চায়। এ আর এমন কি কাজ, প্রয়োজন হলে সঙ্গে করে নিয়েও যেতে পারি। একথা ভাবতে-ভাবতে কাগজের ভাজ খুলেই চম্কে উঠলেন। বলা ভালো আঁতকে উঠলেন, যেমন ওঠে পায়ের কাছে আচমকা সাপ দেখলে। সেই হর্ষোৎফুল্ল মুখ নিমেষের মধ্যে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। অপটু হস্তাক্ষরে লিখিত একটি কবিতা, নাম—এক নৌকোয় তুমি আর আমি।
গম্ভীরমুখে আদ্যোপান্ত কবিতাটি পড়লেন। পড়ার পর ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন ছেলেটির দিকে। অবশেষে করুণকণ্ঠে বললেন—এ-কবিতা তো ছাপতে পারব না। তার চেয়ে যে-গঙ্গা থেকে আমাকে তুমি উদ্ধার করেছিলে সেই গঙ্গায় আবার আমাকে ফেলে দিয়ে এস।
ভারতবর্ষ-সম্পাদক জলধর সেন ও প্রবাসী-সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের নামে প্রচলিত দুটি গল্প আপনাদের শোনালাম। এ-ঘটনা সত্যি কি না আমার জানা নেই। শোনা-গল্পই আপনাদের কাছে বললাম। সত্যি যদি না-ও হয় ক্ষতি নেই। বাংলার সাময়িক পত্রিকার দুই দিকপাল সম্পাদকের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরাই এ কাহিনীর উদ্দেশ্য।
১৬. শনিবার দিন দপ্তরে এসেছি
শনিবার দিন দপ্তরে এসেছি একটু বেলা করেই। তার একটা কারণও ছিল। শুক্রবার সারারাত জেগে গান শুনেছি। আলাউদ্দীন সংগীত সমাজের তিন রাত্রিব্যাপী জলসার প্রথম রাত্রি কাটিয়ে বাড়ি ফিরেছি বেলা আটটায়। দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর একটু বিশ্রাম করেই দপ্তরে এসেছি, কোনরকমে তাড়াহুড়ো করে কাজকর্ম সেরেই ছুটতে হবে রূপবাণী চিত্ৰগৃহে, আবার অহহারাত্র জাগরণ। বড় বড় ওস্তাদদের আসর, না শুনতে পেলে জীবনটাই যেন বৃথা। রামপুর থেকে এসেছেন অশীতিপর বৃদ্ধ ওস্তাদ মুস্তাক হুসেন খাঁ। এক সময়ে তার কণ্ঠের খেয়াল গান শুনবার জন্য লোকে পাগল হত। আজ বৃদ্ধের কণ্ঠে সাতটি সুর সাতটি পোষ পাখির মত আর খেলা করে না। যৌবনের সতেজ করে সে দাপট নাই, সাপট তানের সেই ফুলঝুরি-বাহার আজ স্তিমিত। হলক আর গমক তান দমের অভাবে তিন সপ্তক পর্যন্ত ছুটোছুটি করতে পারে না। তা না পারুক, তবু মরা হাতির দামও লাখ টাকা। গত সন্ধ্যায় ঢিমা লয়ে শুধ, কল্যাণের খেয়াল যখন ধরলেন তখন চমকে উঠেছি রাগের বিস্তার আর তার চলন শুনে। মনে হল কতকালের হারানো সম্পদ যেন ফিরে পেলাম। নবীন যুবা কাশীনাথের দলে বুড়া বরজলাল শ্রোতাদের হাততালি কুড়োতে
