বলতে বলতে কবিতাটি ভাঁজ করে বুক পকেটে রাখলেন, পকেটটা আরেকটু ফুলে উঠল। জলধরদার ক্ষেত্রে এ-ব্যাপারটা একটা রেওয়াজে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, কিন্তু কোনদিন তিনি এরজন্য লেশমাত্র বিরক্তি প্রকাশ করতেন না।
এর উল্টো ঘটনাও ঘটেছে। ভারতবর্ষ পত্রিকার এক গ্রাহকের পিতৃশ্রাদ্ধানুষ্ঠানের নিয়মভঙ্গে আমন্ত্রিত হয়ে জলধরদা গেলেন। আরও বহু পরিচিত বিশিষ্ট ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত। প্রচুর পরিমাণে আহারাদির পর জলধরদা পরিচিতজনদের সঙ্গে শিষ্টালাপ করছেন এমন সময় মুণ্ডিত মস্তকে পরলোকগত পিতার একমাত্র পুত্র এসে বিনীতভাবে জলধরদাকে বললেন–খাওয়া-দাওয়ায় আপনার কোন অসুবিধা হয় নি তো? আমি একা মানুষ, ঠিক মত আপনাদের দেখাশুনো করতে পারি নি। কোন ক্রটি ঘটলে, মার্জনা করবেন।
ছেলেটিকে বুকের কাছে টেনে এনে জলধরদা স্নেহমাখা কণ্ঠে বললেন–পিতৃদেবের পারলৌকিক কাজে অনুষ্ঠানের কোন ত্রুটিই তুমি রাখ নি। কিন্তু আমি এতক্ষণ বসে বসে ভাবছিলুম বাড়ি ফেরার সময় হয়ে গেল, অথচ কিছুই তত দিলে না আমাকে।
ছেলেটি অপ্রস্তুত। তাই তো। জলধরবাবু নিশ্চয় ভুল করেছেন। ব্রাহ্মণভোজন আর ব্রাহ্মণ-বিদায়ের কোন ব্যবস্থাই তো সে করে নি। একটু ইতস্তত করে ছেলেটি বললে—আমার বাবা আপনার সম্পাদিত পত্রিকার একজন নিয়মিত পাঠক ছিলেন। প্রথম সংখ্যা থেকেই ভারতবর্ষর তিনি গ্রাহক এবং তা তিনি সযত্নে বাঁধিয়ে রেখেছেন। সেই কারণেই আমার বাবার পারলৌকিক কাজে আপনার উপস্থিতিই আমাদের একান্ত কাম্য ছিল। আপনি এসেছেন, আমরা ধন্য।
জলধরদা ছেলেটিকে আর বিব্রত অবস্থায় ফেলে না রেখে সহাস্যে বললেন–আমি তা জানি। তবে কি জানো, এ-ধরনের অনুষ্ঠানে যখনই আমার ডাক পড়ে তখনই বাড়ি ফেরার সময় কিছু-না-কিছু আমাকে নিয়ে ফিরতেই হয়—এই যেমন গল্প প্রবন্ধ বা কবিতা। একমাত্র এখানেই তার ব্যতিক্রম দেখে আশ্চর্য হয়ে তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম।
কথাটা জলধরদা সেদিন সরল চিত্তেই বলেছিলেন, আশপাশের লোকেরা কিন্তু কথাটা একটা মস্ত রসিকতা মনে করে হেসে উঠেছিল। আমি জানি এবং আজ মর্মে মর্মে অনুভব করতে পারছি যে, জলধরদার সেদিনের এই কথায় কি শানিত বিদ্রুপ প্রচ্ছন্ন ছিল।
এ-কাহিনী শুনে আপনাদের মনে একটা প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, পকেটভতি যে-সব লেখা তিনি নিয়ে আসতেন তার সবই কি পত্রিকার ছাপা হত?
না। তা হত না। এ-বিষয়ে জলধরদার কতকগুলো পদ্ধতি ছিল অভিনব। উদাহরণস্বরূপ ধরুন সেই মেয়ের লেখা কবিতা, যা তার বাবা জলধরদার হাতে তুলে দিয়েছিল। বেশ কয়েকমাস অপেক্ষা করার পর মেয়ের বাবা একদিন সকালে জলধৱদার বাড়ি গিয়ে হাজির।
কন্যার কবিতাটির কথা জিজ্ঞাসা করতেই জলধরদা সলজ্জ হয়ে বললেন—
আর বলেন কেন। সেদিন আপনার বাড়ি থেকে ফিরে এসে কোটটা আলনায় রেখেছিলাম। পরদিন খোঁজ করতে গিয়ে দেখি সেটা পোপাবাড়ি চলে গেছে।
এই সময়ে একটু থেমে, দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে জলধরদা বললেন–যতদিন গৃহিণী ছিলেন ততদিন পান থেকে চুনটি খসবার জো ছিল না। আর এখন? বাড়ি তো নয়, সরাইখান।
এ-কথার পর আর কোন মেয়ের বাপ চক্ষুলজ্জার মাথা খেয়ে মেয়ের কবিতার জন্য দরবার করে।
জলধরদার দ্বিতীয় পদ্ধতির কথা এ-বৈঠকে বহুকাল আগেই বলেছি, ভারতবর্ষ অফিসে লেখার খোঁজে গিয়ে প্রশ্নকারীই বিব্রত হয়ে চলে আসতেন
এই জন্যে যে, জলধরদা কানে খুবই কম শুনতে পেতেন।
নেমন্তন্নবাড়ি থেকে নিয়ে-আসা রচনার পরিণতি সম্পর্কে দীর্ঘকাল অপেক্ষার পর যদি কেউ চিঠি লিখে জানতে চাইতেন, তার উত্তরে তিনি লিখতেন-প্রেসে দিয়াছি, যথাসময়ে উহা পত্রস্থ হইবে।
যথারীতি সে-লেখা পত্রস্থ হত না। জলধরদার ভাষায় যথাসময়ের ব্যাপ্তি যে অনন্তকাল এবং প্রেস যে অবাঞ্ছিত কাগজের ঝুড়ি তা দীর্ঘকাল অপেক্ষার পর পত্ৰলেখক উপলব্ধি করতে পারতেন।
বাংলার অন্যতম সাহিত্য-পত্রিকা প্রবাসীর সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তি। তিনি ছিলেন অন্য ধাতুতে গড়া। যে-লেখায় সাহিত্যিক কোন মূল্য নেই তা তার হাত দিয়ে প্রবাসী পত্রিকায় প্রকাশ করা ছিল দুঃসাধ্য ব্যাপার। যতই খাতির থাকুক, যে-লেখা তার পছন্দ হয় নি তা তিনি সোজাসুজি জানিয়ে দিতেন, কোন লেখককে মিথ্যা স্তোক দিয়ে ঝুলিয়ে রাখতেন না। এ বিষয়ে তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্পষ্টবাদী। তার জীবনের একটি ঘটনা আপনাদের বলি।
একবার এক সাহিত্য সম্মেলন উপলক্ষে তাঁকে কাশী যেতে হয়েছিল। তিনি ছিলেন সম্মেলনের প্রধান অতিথি। তিনি স্থির করলেন প্রাতঃকালে গঙ্গাস্নান করবেন। পূণ্যলোভাতুর ছিলেন কি না জানি না। কিন্তু মণিকর্ণিকার ঘাটে দাঁড়িয়ে কাশীর গঙ্গা দেখলে যেকোন ব্যক্তির মনেই অবগাহনের বাসনা জন্মায়।
একদিন ভোরবেলায় কাউকে না জানিয়ে স্নানার্থী হয়ে মণিকর্ণিকার। ঘাটে এসে উপস্থিত। দশাশ্বমেধ ঘাটের তুলনায় মণিকর্ণিকার ঘাট অপেক্ষাকৃত জনবিরল। লোকচক্ষুর অগোচরে স্নান করতে আসার কারণও ছিল। রামানন্দবাবু সম্পর্কে একটা ধারণা প্রচলিত ছিল যে, উনি কট্টর ব্রাহ্ম। হিন্দুসমাজের প্রধান তীর্থক্ষেত্রে ওঁর এই গঙ্গাস্নান নিয়ে পাছে কোন রকম কদর্থ হয় এই কারণে একাই চুপচাপ স্নান করতে এসেছেন। জলে নেমে কিছুদুর মাত্র গিয়েছেন, হঠাৎ দেখলেন পায়ের তলায় মাটি নেই। আশ্বিনের ভরা গঙ্গার কুটিল আবর্ত তাকে টেনে নিয়ে চলেছে নিচের দিকে। আর উপায় নেই, এবার মৃত্যু অবধারিত। হঠাৎ অনুভব করলেন দুই অদৃশ্য বলিষ্ঠ বাহু তাকে জড়িয়ে ধরেছে। মুহূর্তের মধ্যে জলের উপর ভেসে উঠে বুক ভরে দম নিলেন। বুঝতে পারলেন, এ মৃত্যুর করাল গ্রাস নয়। একটি যুবক তার অসহায় দেহটাকে নিয়ে প্রাণপণ চেষ্টায় সাঁতরে চলেছে ঘাটের দিকে। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি ফিরে আসতে পারলেন। ঘাটে এসে বিদায় নেবার সময় কৃতজ্ঞচিত্তে যুবকটিকে রামানন্দবাবু বললেন–আজ নিশ্চিত মৃত্যু থেকে তুমি আমার জীবন রক্ষা করেছ, বল আমি তোমার জন্য কী করতে পারি।
