আমি বললাম-যদি কখনও আমার সাহায্যের প্রয়োজন হয়, জানাবেন, নিশ্চয়ই আসব।
হাঁটতে হাঁটতে হাজরার মোড় পর্যন্ত এসে ট্রামের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি। টালিগঞ্জের কত ট্রাম এসে চলে গেল আমার হুঁশ নেই। আমি শুধু ভাবছিলাম সেই বৃদ্ধার কথা, দিব্যেন্দুর কথা, ওর ভগ্নিপতির কথা। আর চোখের সামনে ভেসে উঠছিল সেই হাস্যোজ্জ্বল একটি মুখ, পরনে লাল পাড় ঢাকাই শাড়ি, সিঁথিতে সিদুর।
কিছুদিন বাদে মালা গ্রাম থেকে প্রভাত কলকাতায় ফিরে এল। খবর পেয়ে ডেকে পাঠালাম ওকে আমার বাড়িতে। ওর গল্প নিয়ে যা-ঘটেছে তা খুলে বলার পর ওকে যখন জিজ্ঞাসা করলাম এমন গল্প সে কেন লিখল। কোন উত্তর নেই। অনেক অনুরোধ-উপরোধের পর সে যা বলল তা আরেক বিরাট কাহিনী, সে কাহিনী আপনাদের বলতে আমি চাই নে। তাছাড়া তার সঙ্গে সাহিত্যের কোনও সম্পর্ক নেই বলেই এক্ষেত্রে তা নিতান্তই অপ্রাসঙ্গিক।
এই ঘটনার পর কালস্রোতে অনেকগুলি বছর পার হয়ে গেছে। পুরনো দিনের অনেক ঘটনাই স্মৃতির অন্তরালে আজ অবলুপ্ত। হাজরা রোডের একটি সন্ধ্যার সেই মর্মস্পর্শী অভিজ্ঞতাও হয়তো মন থেকে চিরকালের জন্য মুছে যেত, কিন্তু তা যায় নি একটি মর্মান্তিক খবরে।
বড় বাজারের বর্মণ স্ট্রীট ছেড়ে আমাদের অফিস উঠে এসেছে চৌরঙ্গী পাড়ায়। একদিন দুপুরে নিরিবিলি অফিসে বসে কাজ করছি, হঠাৎ টেলিফোন বেজে উঠল। বিনয় ঘোষের কণ্ঠস্বর। বললেন–একটা দুঃসংবাদ আপনাকে দিই, দিব্যেন্দুর বোনটি মারা গেছে।
স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। সঙ্গে সঙ্গে চোখের সামনে ছবির মত ভেসে উঠল একটি হাসিখুশি মুখ, ঢাকাই শাড়ির চওড়া লাল পাড় নিটোল দুটি গাল ছুঁয়ে আছে, কপালে সিঁদুরের টিপ। রিসিভারটা কানে ধরা ছিল, দুদিক থেকেই কোন কথা নেই। খানিক বাদে ওপাশ থেকে খট করে আওয়াজ হতেই সম্বিৎ ফিরে এল, বিনয় বাবু ততক্ষণে টেলিফোন ছেড়ে দিয়েছেন।
দিব্যেন্দুর বাড়ির কারুর সঙ্গেই আর কোনদিন আমার দেখা হয় নি, দিব্যেন্দু আজও আমার অপরিচিত। আমার এই কাহিনী এইখানে শেষ করার আগে পাঠকদের কাছে একটি অনুরোধ জানিয়ে রাখি। যদি আপনাদের কারুর সঙ্গে দিব্যেন্দুর অথবা তার ভগ্নিপতির কখনও কোনদিন দেখা হয় তাকে আমার অন্তরের গভীর সমবেদনা ও সহানুভূতি জানিয়ে দিয়ে শুধু এই কথাটুকু বলে দেবেন, আমি ওদের আজও ভুলি নি, কোনদিনও ভুলব না।
১৫. ভারতবর্ষ-সম্পাদক জলধর সেন
আমাদের জলধরদা, ভারতবর্ষ-সম্পাদক জলধর সেনের কথাই বলছি, তিনি ছিলেন উনবিংশ শতাব্দীর খাঁটি বাঙালী ভদ্রলোক। তাই, খাওয়াদাওয়ার নেমন্তন্ন এলে ভদ্রতা রক্ষার জন্যই তাঁকে যেতে হত, এ-কাজটাকে উনি কর্তব্য বলেই মনে করতেন। আসলে জলধরদা আর সব বিষয়েই নির্লোভ মানুষ হওয়া সত্ত্বেও তার একটিমাত্র দুর্বলতা ছিল, তিনি ছিলেন সত্যিকারের ভোজনবিলাসী। তার এই দুর্বলতার পরিচয় তাঁর সম্পাদিত পত্রিকার পাঠক ও লেখক মহলে অজানা ছিল না। যশোপ্রার্থী লেখকরা তাই ছেলের অন্নপ্রাশন, বোনের পাকা দেখা, মেয়ের জন্মদিন ইত্যাদি নানা উপলক্ষে জলধরদাকে আমন্ত্রণ জানাতেন, তাঁদের কোন সামাজিক অনুষ্ঠানই জলধরদাকে বাদ দিয়ে হত না হলে এবং লোক পরম্পরায় সে-খবর যদি জলধরদার কানে আসত, তিনি মর্মান্তিক আঘাত পেতেন, ক্ষুণ্ণও হতেন। লেখকমহলের যে-কোন পারিবারিক ক্রিয়ানুষ্ঠানে তাই জলধরদার ছিল নিত্য আনাগোনা।
সম্পাদকরূপে জলধরদার একটি মস্ত গুণ ছিল, যা সমসাময়িক বা পরবর্তী কালের পত্রিকা-সম্পাদকদের মধ্যে কদাচ দেখা যেত। যে-কোন নেমন্তন্নবাড়ি থেকে ওঁকে আমন্ত্রণ জানালে উনি কিছুতেই না বলতে পারতেন না, পাছে ফিরিয়ে দিলে ওরা মনে দুঃখ পায়।
প্রবাসী সম্পাদক রামানন্দবাবু পারতপক্ষে কোন নেমন্তন্ন-বাড়িতে যেতেন না। কত ব্যবোধে গেলেও আহারাদি করতেন না। সে-বিষয়ে উনি ছিলেন অত্যন্ত নিয়ম-নিষ্ঠ মানুষ। আর প্রমথ চৌধুরী? সামাজিক ক্রিয়াকর্মে যাওয়া তো দূরের কথা, সভাসমিতিতে সভাপতি সেজে বক্তৃতা দেওয়া পর্যন্ত ছিল ওঁর স্বভাব বিরুদ্ধ।
জলধরদা এব্যাপারে ছিলেন আশ্চর্য ব্যতিক্রম। একদিনে যদি একাধিক নেমন্তন্ন থাকে—উনি কোনোটাতেই গরহাজির থাকতেন না এবং প্রত্যেকটিতেই সমপরিমাণ আগ্রহ নিয়েই আহারাদি করতেন। নেমন্তন্ন রক্ষা করে যখন উনি বাড়ি ফিরতেন তখন দেখা যেত তার উদরের সঙ্গে গলাবন্ধ কোটের বুকপকেটটাও ফুলে ঢােল। কোনও বাড়ি থেকে ছোটগল্প, কোনও বাড়ি থেকে প্রবন্ধ, কিন্তু বেশীরভাগ রচনাই থাকত কবিযশোপ্রার্থীদের কবিতা।
এক বাড়িতে প্রচুর আহারাদির পর বিদায় নেবার সময় বাড়ির কর্তা একটি কবিতা এনে জলধরদার হাতে দিয়ে বললেন– আমার মেয়ে পটদ্য লেখে এবং ভালই লেখে। আপনি পড়ে দেখুন, আপনারও ভালই লাগবে। প্রবাসী-ট্রবাসী কাগজে পাঠালেই ছেপে দেবে। তবে আমার মেয়ের ইচ্ছে আপনার পত্রিকাতেই এটা যেন ছাপা হয়।
উল্লসিত হয়ে উঠলেন জলধরদা। যেন কী অমুল্য বস্তু হাতে পেলেন। আগ্রহের সঙ্গে লেখাঁটি হাতে নিয়েই উনি উচ্চৈঃস্বরে পড়তে শুরু করে দিলেন আর সঙ্গে সঙ্গে ডান পা দিয়ে মাটিতে তাল ঠুকতে লাগলেন, ছন্দ ঠিক আছে কিনা পরখ করবার জন্যে। পড়া শেষ হতেই প্রশংসায় মুখর হয়ে উঠলেন জলধরদা।
–অপূর্ব! অপূর্ব হয়েছে কবিতাটি। ছন্দে, ভাবে, ভাষায় অনবদ্য। লিখে যাও মা, লিখে যাও। এ ঈশ্বরদত্ত ক্ষমতা, থামতে নেই লিখে যাও।
