এই সময় ভদ্রলোক পার্ক থেকে একাই ফিরে এলেন। স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন–কি, ওঁর কাছে আমার নিনে করা হচ্ছিল বুঝি।
আমি বললুম-তা নয়। সে দিন আমার বাড়িতে আপনি যেমন ওঁর গুণের প্রশংসা করছিলেন, উনিও আপনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
বিস্ময়ের ভান করে ভদ্রলোক বললেন—তাই নাকি, এ যে আপনি নতুন খবর শোনালেন। আমি কিন্তু চব্বিশ ঘণ্টা ওঁর গঞ্জনা শুনতে শুনতে ঝালাপালা হয়ে গেছি। একেক সময় মনে হয় দুর্ভোর বলে লোটা-কম্বল নিয়ে বেরিয়ে পড়ি।
বিনয়বাবু বললেন–থাক হয়েছে। তোমাকে আর লোটাকম্বল নিয়ে বেরোতে হবে না। উপস্থিত মা-কে একবার ডেকে দাও।
ভদ্রমহিলা বললেন–মা ওঁর জন্যে চায়ের জল চাপিয়েছেন, আমি গিয়ে এক্ষুনি ওঁকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
ভদ্রমহিলা পর্দার আড্ডালে চলে যেতেই আমি প্রমাদ গুনলাম। একটা কঠিন পরীক্ষার সামনে মুখোমুখি আমাকে দাঁড়াতে হবে! মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পরেই পর্দার ওপার থেকে এক বৃদ্ধা বেরিয়ে এলেন। স্নান বিষগ্ন মুখ, বেদনার ছাপ সারা চেহারায় পরিস্ফুট।
দাঁড়িয়ে উঠে নমস্কার করতেই বৃদ্ধা বললেন—বোস বাবা, বোস। তুমি তত বিনয়ের বন্ধু, আমার ছেলেরই মতন। কিন্তু আমার ছেলের এ কী হল? খায় না, ঘুমোয় না, কারুর সঙ্গে কথাও বলে না। আজ সাতদিন হয়ে গেল অফিস যাওয়া বন্ধ করেছে। ও যখন এতটুকু তখন এই দুটি ছেলেমেয়েকে নিয়ে আমি বিধবা হই। কি দুঃখের দিন গেছে আমার। অনেক কষ্টে ছেলেকে লেখা পড়া শিখিয়েছি, চাকরিও করছে। ভাবলুম, দুঃখের দিন পার হল। হঠাৎ এ কি হল বল তো? কি হবে? চাকরি যদি যায়, আবার আমাকে পথে দাঁড়াতে হবে। ওই ছেলে ছাড়া আমার তো আর কোন সম্বল নেই।
বলতে বলতে বৃদ্ধা ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন। আমি স্তব্ধ হয়ে বসে আছি, কি বলব ভেবে পাচ্ছি না। বিনয় বাবুর দিকে চেয়ে দেখি উনি ঘড় হেঁট করে মাটির দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।
বৃদ্ধা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে বললেন–এই দেখ না। ছেলেকে কত করে বললাম থাকতে। বেরিয়ে গেল। কত রাত্রে ফিরবে কে জানে। এ রকম করলে ও-যে পাগল হয়ে যাবে। কান্নায় বৃদ্ধার কথা রুদ্ধ হয়ে এল।
আমার স্নায়ুর উপর এতটা চাপ পড়বে আমি কল্পনা করি নি। ইচ্ছে হচ্ছিল ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে যাই। মনে মনে অভিসম্পাত দিচ্ছিলাম প্রভাতকে, যে আমাকে আজ এমন একটা অসহনীয় পরিস্থিতির মধ্যে এনে ফেলেছে। পরিচিত বন্ধুকে নিয়ে যদি বাস্তব গল্পই লিখতে গেল তবে পরিণতিতে এভাবে কল্পনার কালি ঢালতে গেল কেন! এ অবস্থায় আর চুপ করে থাকা যায় না, কিছু একটা বলতেই হয়। কিন্তু আমার দিক থেকে বলবার-কীই বা থাকতে পারে। তবু এই বৃদ্ধার ব্যাথাতুর অন্তরে যদি কিছু সান্ত্বনার প্রলেপ দিতে পারি এই আশায় আমি বললাল—যা হবার তা তো হয়েই গেছে। এ নিয়ে আর দুঃখ করে লাভ কি। আমার দিক থেকে এটুকু অন্তত বলতে পারি যে, আমাদের পত্রিকায় যে-গল্প প্রকাশিত হয়েছে তার সত্যতা সম্বন্ধে আমি বিন্দুবিসর্গ জানতাম না। আজ আমি আপনাদের মতই বেদনা বোধ করছি, কিন্তু এখন তো আর প্রতিকারের কোন পথ নেই। আপনাদের কর্তব্য এই গল্প নিয়ে যাকিছু ঘটেছে তা মন থেকে নিঃশেষে মুছে ফেলা। আপনারা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবার চেষ্টা করুন, দেখবেন আপনার ছেলেও আগের মতনই আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। আমার শুধু একটি অনুরোধ, আপনার ছেলেকে বলবেন যেন এক মাসের একটা ছুটির দরখাস্ত করে দেয় আর যে ঘটনা ওর অফিসে ঘটেছে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে একটা চিঠিও যেন দেয়। তাহলে আমার বিশ্বাস চাকরি সম্পর্কে আর কোন গোলযোগ হবে না।
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলি বলে একটা দমবন্ধ আবহাওয়া থেকে যেন মুক্তি পেলাম। বৃদ্ধার চোখ দিয়ে তখনও অঝোরে জল ঝরছে, থান ধুতির আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বললেন–বাবা, সবই তো বুঝি কিন্তু মন মানে না। আমার ছেলেকে যদি তুমি একটু বুঝিয়ে বলতে পারতে ভাল হত।
বিনয়বাবু বৃদ্ধাকে ভরসা দিয়ে বললেন–আপনি ভাববেন না। দিব্যেন্দুকে আমিই বুঝিয়ে দরখাস্ত দুটো কালই পাঠাবার ব্যবস্থা করব।
এমন সময় সেই মেয়েটি দু হাতে দু কাপ চা এনে মায়ের সামনে ধরে বললেন–মা, চা-টা ওঁদের এগিয়ে দাও।
ছোট একটি কাপে চা, পিরিচে দুটি বিস্কুট বসানো। মেয়ের হাত থেকে কাপটা নিয়ে যে-আঁচলে চোখ মুছছিলেন সেই আঁচলেই পিরিচের তলাটা মুছে আমার সামনে ফুলের নকশা ভোলা টেবিলক্লথটার উপর রাখলেন। চায়ের প্রতি তখন আমার একটা বিবমিষা দেখা দিয়েছে। মনে হচ্ছিল এ তো চা নয়, এক পেয়ালা চোখের জল যেন আমার সামনে ধরে দেওয়া হলো। কিন্তু বৃদ্ধার এই সস্নেহ আতিথেয়তা আমি সেদিন উপেক্ষা করতে পারি নি। গলা দিয়ে চা নামতে না চাইলেও তা নিঃশেষ করে বিদায় চাইলাম। বৃদ্ধা বললেন–আরও একটু বোস বাবা, আমার ছেলে হয়তো এখুনি এসে যাবে।
বিনয়বাবু আমার মানসিক অবস্থাটা অনুমান করে আমাকে উদ্ধার করলেন, বললেন–রাত হয়ে এসেছে, ওঁকে আর আটকে রাখা ঠিক নয়। আমি বরঞ্চ এখন থেকে যাই, দিব্যেন্দুকে যা বলবার আমিই বুঝিয়ে বলব।
সদর দরজা খুলে যখন বাইরে এসেছি, বিনয়বাবু আর দিব্যেন্দুর ভগ্নিপতি রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে দেবার জন্যে সঙ্গে এলেন। রাস্তায় নেমে দিব্যেন্দুর বোনকে নমস্কার জানিয়ে বিদায় চাইলাম। প্রতি নমস্কার করে প্রসন্ন হাসির আভা ছড়িয়ে বললেন–বাড়ি তো চিনে গেলেন, আবার আসবেন।
