বিকালে বড়বাজার থেকে চার নম্বর বাসে চড়ে ঠিক ছটার সময় হাজরার মোড়ে নেমেই দেখি গেরুয়া পাঞ্জাবি পরে বিনয় ঘোষ আমারই জন্যে অপেক্ষা করছেন।
আমাকে দেখতে পেয়ে বিনয়বাবু আশ্বস্ত হয়ে বললেন–যাক, আপনি এসেছেন, আমি নিশ্চিন্ত হলাম। এই একটু আগেই ওদের বাড়ি থেকে আসছি। ওদের বলে এসেছি যে আপনি ছটার সময় আসছেন, শুনে সবাই খুশী শুধু দিব্যেন্দুই একটু লজ্জা পাচ্ছিল আপনার সঙ্গে দেখা করতে। আমি বিশেষ করে বলে এসেছি ও যেন থাকে, বেরিয়ে না যায়।
আমি বললাম–সে কি, আমি আরও উল্টোটাই শুনেছি। সে নাকি পকেটে ছোরা নিয়ে হন্যে হয়ে আমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। আমার অপরাধ, প্রভাতের গল্প আমি ছেপেছি।
বিনয়বাবু দুঃখের সঙ্গে বললেন–ছি ছি ছি, তা কখনও সম্ভব? দিব্যেন্দু উত্তেজনার বশে একটা অন্যায় কাজ করে ফেলেছে, তার জন্যে অনুশোচনার শেষ নেই। কোন লজ্জায় তাদের কাছে মুখ দেখাবে বলে অফিস যাওয়া বন্ধ করেছে, আর ঠিক একই কারণে সে আপনার সামনেও উপস্থিত হতে লজ্জা পাচ্ছে। তবু আমি অনেক করে বুঝিয়ে বলে এসেছি যে আপনি আমাদেরই একজন, আপনার কাছে লজ্জা পাবার কিছু নেই।
হাজরা রোড ধরে পশ্চিম দিকে কথা বলতে বলতে আমরা এগিয়ে চলেছি, হঠাৎ বাঁদিকের একটা রাস্তায় মোড় নিয়েই বিনয়বাবু বললেন–আমরা এসে গিয়েছি, এই যে এই বাড়ি।
রাস্তার উপরেই সদর দরজা, ছোট্ট একতলা বাড়ি। বিনয়বাবু কড়া নাড়তেই দরজা খুলে গেল, হাসিমুখে সেই ভদ্রলোক আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন। পরনে মালকোচা দেওয়া ধুতি, গায়ে আস্তিনগোটানো শার্ট। মুখে সেই সরল আন্তরিক হাসি।
রাস্তা থেকে সিঁড়ি দিয়ে উঠেই ছোট একটি ঘরে প্রবেশ করলাম। ঘরের মাঝখানে একটা সাদা পর্দা টাঙানো, পর্দার এ-পাশে অর্থাৎ রাস্তার দিকে ছোট্ট একটি টেবিল আর খান দু-তিন চেয়ার পেতে বসবার ঘর করা হয়েছে। আসবাবপত্রর বাহুল্য কিছুই নেই, সাধারণ গৃহস্থঘরের প্রয়োজনীয় যেটুকু সে-টুকুই আছে। বসবার ঘরের এক পাশে একটা কেরোসিন-কাঠের শেলফ এ পকেটবুক এভিশানের কিছু ইংরিজী বই, কিছু বাংলা বইও আছে আর আছে একতাড়া পত্রপত্রিকা ও খবরের কাগজ।
মেয়েলী-হাতের ফুললতাপাতার নক্শা ভোলা টেবিলক্লথ তোরঙ্গ-ঢাকনি। দেয়ালে অমাবশ্যা-পূর্ণিমা-একাদশী নির্দেশিত বাংলা ক্যালেণ্ডার।
ঘরে ঢুকেই বিনয়বাবু একটা চেয়ারে বসলেন, ওঁর গা ঘেষেই পাশের চেয়ারে আমি বসে পড়লাম। বিনয়বাবু বললেন–কই, দিব্যেন্দুকে দেখছি না কেন? পালিয়েছে বুঝি।
ভদ্রলোক বিনয়বাবুকে বললেন–আপনিও বেরিয়েছেন, মিনিট পনেরো বাদে সিগারেট কিনবার নাম করে ও বেরিয়েছে। ফেরে কিনা সন্দেহ। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—ওকে আমি কত বললাম যে আপনার কাছে লজ্জা পাবার কোন কারণ নেই, তবু বেরিয়ে গেল।
ভদ্রলোকের কথা শেষ হতে না হতেই সাদা কাপড়ের পার্টিশনটা সরিয়ে একটি তরুণী আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। উজ্জ্বল গৌরবর্ণ, নিটোল স্বাস্থ্য, ধীর স্থির দুটি কালো চোখের চাহনিতে যেন স্বপ্ন মাখানো। চওড়া লাল-পাড়ের সাদা শাড়ি সাধারণ ভাবে পরা। মাথার মাঝখান থেকে ঘোমটাটি এমনভাবে টেনে আনা যেন লাল-পাড়ের ফ্রেম-এর মাঝে পটে আঁকা একখানি ছবি। দা-ভিঞ্চির মোনালিসা-র হাসি আপনারা সবাই দেখেছেন। সে-হাসির অর্থ নিয়ে দুই শতাব্দী ধরে অনেক গবেষণাই রসিক সমালোচকরা করেছেন, আজও করছেন, তবু সে-হাসির রহস্য অজানাই থেকে গিয়েছে। আমার সামনে মূর্তিমতী যে নারী এসে দাঁড়ালেন তার মুখের স্মিতসুন্দর হাসির ব্যাখ্যা করা আমার কলমের সাধ্য নয়। শুধু মনে হয়েছিল মোনালিসার সেই অপার রহস্যময়ী হাসির জীবন্তরূপ নিয়ে তিনি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। . বিস্ময়ের ঘোর কাটল যখন, তখন ভদ্রলোক বললেন—এই হচ্ছে দিব্যেন্দুর বোন, আমার ইয়ে
ভদ্রমহিলা খিলখিল করে হেসে উঠলেন, বললেন—আহা, পরিচয় করিয়ে দেবার কি ছিরি। স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন–যাও তো, হাজরা পার্কে গিয়ে একবার খুজে এস। দাদা নিশ্চয় পার্কে বসে আছে।
ভদ্রলোক দিব্যেন্দুর খোঁজে বেরিয়ে যেতেই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—জানেন, দাদাকে নিয়েই আমাদের যত মুশকিল। বাড়ি থাকতে ভাল লাগে না, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। রাত্রে ঘুমোত পারে না, এই হিমের মধ্যে পার্কে গিয়ে বসে থাকে রাত বারোটা পর্যন্ত। শেষকালে এই ভদ্রলোককেই গিয়ে পার্ক থেকে দাদাকে ধরে আনতে হয়। আমি তো দাদাকে সব সময় বলছি—তুমি এবার বিয়ে কর, এসব ব্যক্তি তোমার বউ এসেই সামলাক। মা বুড়ো মানুষ, কেবল চিন্তা ছেলে বুঝি পাগল হয়ে গেল। আমার কর্তাটির কথা আর বলবেন না। বিশ্বকুঁড়ে। আপনার কাছে যেতে কি চায়? আমিই তো জোর করে সেদিন সকালে আপনার বাড়ি পাঠিয়ে ছিলাম। কি বিনয়দা, ঠিক কথা কি না বলুন।
ভদ্রমহিলার স্বতঃস্ফুর্ত ও সপ্রতিভ কথাবার্তায় আমার আড়ষ্টতা কেটে গেছে। বিনয়বাবু কিছু বলবার আগেই আমি বললাম-এটা ঠিক যে, উনি সেদিন সকালে আমার বাড়ি না গেলে এখানে আসার আমি কোন উৎসাহই পেতাম না। ওঁর একটা মস্ত গুণ, অল্প আলাপেই অচেনাকে চির-চেনা করে ফেলতে পারেন।
ভদ্রমহিলা কপট কোপ প্রকাশ করে চোখ ঘুরিয়ে বললেন–ই, গুণ না ছাই। আচ্ছা পেলে বিশ্বসংসার ভুলে যান, আমি তো কোন ছার। এই নিয়ে আমার সঙ্গে নিত্যি খটাখটি লেগেই আছে।
আমি বললাম—ভাগ্যিস খটাখটি লাগে, তা না হলে জীবনটা আলুনি তরকারির মত স্বাদহীন হয়ে যেত।
