তা হলে পাঠিয়ে দাও।
এই বলে আমি কৃষ্ণের কপট নিদ্রার মত অধশায়িত অবস্থাতেই খবরের কাগজের কপট পাঠক সেজে দৈনিক পত্রিকাটা মুখের উপর মেলে ধরলাম। ভাবখানা যেন ঝানু সাংবাদিক আমি, সংবাদের নির্যাস নিতে বড়ই ব্যস্ত। আগন্তুক ঘরে ঢুকতেই আড়চোখে তার মুখের দিকে তাকিয়েই কাগজ ফেলে রেখে উঠে টান হয়ে বসলাম। ভদ্রলোককে আগে কখনও দেখি নি, কিন্তু মুখের সরল বিনম্র হাসিটির মধ্যে যে-আন্তরিকতা ফুটে উঠেছিল আমাকে তা আকর্ষণ করল। পরনে মাল-কেঁাচা-মারা ধুতি, গায়ে ঘি-রঙের পপলিন শার্ট, হাতের আন্তিন গোটানো। বয়েস অনুমান করলাম প্রাক্-তিরিশ হবে।
যুবকটি দাঁড়িয়েই ছিলেন। বসবার জন্য অনুরোধ করতে কুণ্ঠিতচিত্তে চেয়ারে বসে বললেন–সকাল বেলায় আপনাকে বিরক্ত করতে এসেছি, অপরাধ নেবেন না। না-এসেও আমার উপায় ছিল না, তাই বিনয় ঘোষের কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে আমিই চলে এলাম আপনার বাড়ি। আপনার অফিসে তো আর এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যায় না।
আমি শঙ্কিতচিত্তে জিজ্ঞাসা করলাম–আপনিই কি দিব্যেন্দু?
আজ্ঞে না, আমি তার ভগ্নিপতি। বছর দুই হল ওর বোনকে আমি বিয়ে করেছি। আমরা থাকি বাংলাদেশের বাইরে। আমার স্ত্রী শাশুড়ীর একমাত্র মেয়ে, তাই অনেক করে লিখেছিলেন পুজোর ছুটিতে কলকাতায় আসতে। এক মাসের ছুটি নিয়ে এসেই তো এই অশান্তির মধ্যে পড়ে গেছি। সবই তো শুনেছেন বিনয়বাবুর কাছে।
আমি সবই শুনেছি, শুনে খুব দুঃখও পেয়েছি। বিনয়বাবু আমাকে আপনাদের বাড়ি নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আপনিই বলুন, এরকম একটা অবস্থা যেখানে, সেখানে কোন মুখ নিয়ে আমি তাদের কাছে উপস্থিত হব, কী-ই বা সান্ত্বনা তাদের দিতে পারি।
ভদ্রলোক দু হাত জোড় করে অনুরোধ জানিয়ে বললেন—তবু আপনাকে একবার যেতে হবে সাগরবাবু, এ আমার একান্ত অনুরোধ আপনার কাছে। কেন বলছি জানেন? আমি আমার শাশুড়ীকে শ্যালককে অনেক বুঝিয়েছি। একটা গল্পের মধ্যে কে-কি লিখেছে তা গায়ে মাখবার দরকার কি। তার শুধু এক কথা—আমার বোনকে নিয়ে, আমাকে নিয়ে প্রভাত যে জঘন্য ইঙ্গিত করেছে তার জ্বালা আমি সইতে পারছি না। আমি ওকে বলি, এসব গায়ে
মাখলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। ওর না হয় বোন, আরে সে তো আমারও স্ত্রী। আমি তো ওর মতন উন্মাদ হয়ে যাই নি।
ভদ্রলোকের কথায় আমি বিস্ময় বোধ করলাম। এ-ক্ষেত্রে এমন মানসিক স্থৈর্য আশাই করা যায় না। তবু কৌতূহলবশে জিজ্ঞাসা করলাম
আচ্ছা, আপনার স্ত্রী এ-বিষয়ে কী বলেন?
আমার স্ত্রী আমার চেয়েও বেশী নির্লজ্জ। গল্পটা পড়ে তো হেসেই বাঁচে। সব সময় আমাকে ঠাট্টা করে বলে–কী গো, রামচন্দ্রের মত তুমিও বলবে না কি-সমাজরঞ্জন তরে সুনীতিরে বিসর্জন দিব।
একথা বলেই ভদ্রলোক উচ্চৈঃস্বরে প্রাণখোলা হাসি হাসলেন, আমিও যোগ দিলাম। হাসতে হাসতেই বললেন–আমার স্ত্রী কিন্তু এই ব্যাপারটা খুব স্পাের্টিংলি নিয়েছেন। খুব হাসি-খুশি মানুষ কি না।
কথাটা বলেই ভদ্রলোক লজ্জায় পড়ে গেলেন। আমার সামনে স্ত্রীর প্রশংসায় প্রগলভ হয়ে পড়েছেন-এইটেই ওঁর সঙ্কোচ। আমি কিন্তু মনে মনে খুব খুশী হলাম এই ভেবে যে, প্রভাত বিনিয়োগ গল্প লিখে এই দুটি মানুষের সুখী দাম্পত্যজীবনে বিঘ্ন ঘটাতে পারে নি।
ভদ্রলোক এবার নিজের সঙ্কোচ কাটিয়ে উঠে সানুনয় কণ্ঠে বললেন–অনেক বাজে কথা বলে আপনার সময় নষ্ট করলাম, অথচ যে-জন্যে আসা সেটাই বলা হল না। আপনাকে কিন্তু আমাদের ওখানে একবার যেতেই হবে। আমি কথা দিচ্ছি, আপনার কোনরকম অসম্মান বা অপ্রস্তুতে পড়বার কোন কারণ ঘটবে না। আর কিছুর জন্যে নয়, আমার শাশুড়ীর কথা ভেবেই আপনাকে এই অনুরোধ করছি। ছেলের এই অবস্থা দেখে দিনরাত কান্নাকাটি করছেন, তার কষ্টই আমাদের বড় বেশী বিচলিত করেছে। আপনি শুধু একবার গিয়ে দুটো সান্ত্বনার কথা বললেই উনি মনে অনেকখানি জোর পাবেন। আপনি কথা দিন আপনি আসবেন।
ভদ্রলোকের অমায়িক কথাবার্তা ও ব্যবহারে আন্তরিকতার কোন কার্পণ্যই ছিল না, আন্তরিকতা আপনা থেকেই গড়ে উঠেছিল। তাই আর দ্বিরুক্তি না করে কথা দিলাম। যতই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি হোক, মুখখামুখি হয়ে। দেখাই যাক না কি হয়।
আমি বললাম-বলুন কবে যেতে হবে।
খুশিতে উচ্ছ্বসিত হয়ে ভদ্রলোক বললেন—আপনার যেদিন সুবিধা আসুন। বিনয়বাবু আমাদের বাড়ি চেনেন, তিনি আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করে আপনাকে নিয়ে আসবেন।
স্থির হল রবিবার সন্ধ্যা ছটায় ওঁদের বাড়ি যাব।
সে-সময় রবিবার আমাকে অফিসে যেতে হত। ছুটির দিনে অফিসে লোক জনের সমাগম কম হয় বলে সন্ধ্যার পর আটকা পড়ার সম্ভাবনা থাকে না। সুতরাং রবিবার দুপুরে বিনয়বাবু যেন অফিসে টেলিফোন করে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে নেন।
কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ভদ্রলোক বিদায় নিলেন। মনে হল ওর মন থেকে মন্তবড় একটা বোঝা নেমে গেল। আমিও অনুভব করলাম যে আমারও মন যেন হালকা হয়ে গেছে। দুঃখের দিনে মানুষকে খুশী করতে পারার মধ্যে তৃপ্তি আছে, আমার দিক দিয়েও তো আমি কম লাভবান হই নি।
রবিবার দিন দুপুরে অফিসে একা বসে কাজ করছি, টেলিফোন বেজে উঠল। বিনয়বাবুর কণ্ঠস্বর।
–আজ সন্ধ্যায় আসছেন তো?
–নিশ্চয় যাব। কিন্তু আপনার সঙ্গে কখন কোথায় দেখা হবে?
বিনয় ঘোষ বললেন–আমি তো হাজরা রোডের কাছেই থাকি আর আপনাকে এদিকেই আসতে হবে। কেন না ওদের বাড়ি এ-পাড়াতেই। সুতরাং আমি উজান বেয়ে আপনার অফিসে না গিয়ে সন্ধ্যা ছটা নাগাদ আপনি হাজরা নোড আর বসা রোডের উত্তর-পূর্ব কোণের পানের দোকানটার সামনে আমাকে পাবেন। ওখান থেকে দু-মিনিটের রাস্তা।
