দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, সেই সঙ্গে জনযুদ্ধের জোয়ারে আমাদের আড্ডার একদল ভেসে গেল অন্যদিকে। সাহিত্য ছেড়ে তখন আজ্ঞায় রাজনীতি নিয়ে শুরু হয়ে গেল তুমুল তর্ক-বিতর্ক, তার ফলে দেখা দিল মতান্তর। মতের পার্থক্য ক্রমশ এত ব্যাপক হয়ে পড়ল যে আড্ডাই গেল ভেঙ্গে, কে-কোথায় ছিটকে পড়ল।
মতান্তর ঘটলেও মনান্তর কখনও আমাদের মধ্যে ঘটে নি। রাস্তায় ঘাটে, সাহিত্যের সভাসমিতিতে দেখা হলে আমাদের পুরনো বন্ধুত্বের জের টেনেই ঘনিষ্ঠভাবে আলাপ করেছি। কিন্তু আমাদের সাহিত্যিক সার মধ্যে সেদিন এমন একটা ব্যবধান তখন সৃষ্টি হয়ে গিয়েছে যে, পুরনো আচ্ছা আর দানা বাঁধতে পারে নি। রাজনীতির এমনই প্রভাব।
সেই বিনয় ঘোষ টেলিফোন করে বললেন–ব্যাপার গুরুতর।
প্রথমটা বুঝতেই পারি নি কী হল। জনযুদ্ধের রাজনীতি ততদিনে থিতিয়ে এসেছে, সে উন্মাদনাও আর নেই। তা হলে?
বিনয় ঘোষ বললেন—আপনাদের পূজা সংখ্যায় প্রভাতের গল্প নিয়ে যে-কাণ্ড হয়েছে আপনি তা শুনেছেন?
আমি বললাম—সবই শুনেছি, আমি তো প্রভাতের অপেক্ষায় বসে আছি। সে তো মালা গ্রামে গা ঢাকা দিয়েছে।
দুঃখভরা কণ্ঠে বিনয়বাবু বললেন–তার ফলে কি কাণ্ড হয়েছে জানেন? উত্তেজনার বশে দিব্যেন্দু ওর অফিসের কর্মচারী প্রভাতের দাদাকে মেরেছে। এই নিয়ে সারা অফিসে হুলস্থুল।
দিব্যেন্দুর উপর ডিসিপ্লিনারী অ্যাকশন নিতে পারে। শুধু তাই নয়, আজ কিছুদিন ধরে ও অফিসে যাচ্ছে না, বাড়িতেও থাকে না, খাওয়াদাওয়া বন্ধ করেছে, পাগলের মত অবস্থা। ওর বৃদ্ধা মা দিনাত কাঁদছেন, পরিবারে এই নিয়ে ভয়ানক অশান্তি। দিব্যেন্দু আমারও বন্ধু, আমি ওকে অনেক বোঝাবার চেষ্টা করেছি যে, যা হবার হয়ে গেছে। এর তো আর চারা নেই। কিন্তু কিছুতেই ওকে শান্ত করতে পারছি না। আশঙ্কা হচ্ছে সত্যি সত্যিই না পাগল হয়ে যায়।
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলি বলে বিনয়বাবু থামলেন। আমি স্তম্ভিত। এর কি উত্তর দেব? কি প্রতিকার আমি করতে পারি। প্রভাতের রিয়ালিস্টিক গল্প লেখার যে এই পরিণাম হবে আমিই বা তা জানব কি করে?
আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে বিনয়বাবু আবার বললেন–আমি বুঝতে পারছি আপনি খুবই অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছেন, কিন্তু আপনার একটু সাহায্য আজ একান্তই প্রয়োজন।
দিব্যেন্দুকে আমি চিনি না, জানি না। তবু বিনয়বাবুর মুখে ওর এই অবস্থার কথা শুনে ওর প্রতি সহানুভূতি হল, সমবেদনায় মন ভরে উঠল। আমি বললাম-বলুন বিনয়বাবু, এই অবস্থায় আমি কি করতে পারি।
বিনয়বাবু বললেন—আপনাকে শুধু ওদের বাড়িতে একবার যেতে হবে।
ওদের বাড়িতে? আমি যাব? বলেন কি! না বিনয়বাবু, তা হয়। এরকম পরিস্থিতির সামনে গিয়ে দাঁড়ানো আমার পক্ষে অসম্ভব। আর যা কিছু বলুন, এ-অনুরোধ আমাকে করবেন না।
দুঃখের সঙ্গেই বিনয়বাবু টেলিফোন ছেড়ে দিলেন। ছাড়বার আগে শুধু বললেন—আপনি যখন নিতান্তই যেতে চান না তখন আর আপনাকে বিব্রত করব না। ওদের এই দুঃখের দিনে আপনি গেলে ওরা একটু সান্ত্বনা পেত। দেখি, আমি কি করতে পারি।
বিনয়বাবুর টেলিফোন পাবার পর মন এত দমে গেল যে অফিসের কাজে আর উৎসাহ নেই, দুশ্চিন্তায় রাত্রে ঘুম হল না।
পরদিন বিকেলে বিশুদা হন্তদন্ত হয়ে আমার অফিসে এসেই বললেন–থানায় ডায়েরী করিয়েছেন?
ডায়েরী! আমি থানায় ডায়েরী করতে যাব কোন দুঃখে। সে তো করবে প্রভাত। একেই তো বিনয় ঘোষের সঙ্গে টেলিফোনে কথা হওয়ার পর থেকে মন-মেজাজ খিচড়ে আছে তার উপর বিশুদার গুলতাপ্পি। একটু রেগেই বললাম
দেখুন বিশুদা, এসব ইয়ার্কি আর ভাল লাগছে না।
অভিমানের সুরেই বিশুদা বললেন–ইয়াকি হল? যা আমার আর কি। খবরটা শুনে আপনার জন্যে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম বলেই অফিসের পর লোকের ভিড় ঠেলে ছুটতে ছুটতে আসা।
বিশুদার মুখে আবার কি খবর? ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করতেই বললেন–আমার পাড়ার সেই ছেলেটা, যে প্রভাতের দাদার অফিসে কাজ করে, সে আজ সকালে এসে বলে গেল যে পকেটে মস্ত এক ছোরা নিয়ে সে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে। তাই বলছিলাম থানায় ডায়েরী করে রাখুন।
বিশুদাকে আর এক ধাপ রাগাবার জন্যে হেসে বললাম-যুদ্ধের সময়ের গুজবে কান দিবেন না পোস্টারগুলো এখনো কলকাতার দেয়াল থেকে উঠে যায় নি। আপনার এ-কথায় তাই আর কান দিলাম না।
বিশুদা ততোধিক গম্ভীর হয়ে বললেন—কান দেওয়া-না-দেওয়া আপনার ইচ্ছা। কথাটা যে আপৎকালে গ্রাহ্য হবে না আমি তা জানতুম। আমার কর্তব্য আমি করে গেলাম।
মহৎ কর্তব্য সমাধা করে, অর্থাৎ আমার মনে আরও খানিকটা ভয় ঢুকিয়ে দিয়ে বিশুদা কেটে পড়লেন। তবু ভরসা করে বলতে পারলাম না যে একই পাড়ায় যখন থাকি একসঙ্গে বাড়ি ফেরা যাক, যদি আমার মানসিক অবস্থা ওঁর কাছে ধরা পড়ে যায়।
পরদিন সকালে আমার বাড়ির তিনতলা ফ্ল্যাটের দক্ষিণ-ঘরের খাটের তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে অর্ধ শায়িত অবস্থায় খবরের কাগজ পড়ছি। অগ্রহায়ণের শেষ, আসন্ন শীতের মিঠে নোদর জানালা দিয়ে পিঠে এসে পড়েছে। গৃহিণীকে এককাপ গরম চায়ের ফরমাশ দিয়ে পত্রিকার সম্পাদকীয় স্তম্ভে মনোনিবেশ করেছি, এমন সময় দরজার কড়া নাড়ার শব্দ পেলাম। গৃহিণী এসে বললেন–একজন ভদ্রলোক তোমার সঙ্গে দেখা করতে চান, একে আগে কখনও দেখি নি।
সাহেবী পোশাক-পরা কেউ নয় তো?
না, একেবারে খাঁটি বাঙ্গালী।
