এবারে আমি বিনিয়োগ গল্পের শেষ কটি লাইন লেখকের ভাষায় হুবহু তুলে দিচ্ছি যাতে মারপিটের উত্তেজক কারণটি কোথায় নিহিত তা আপনাদের ধরতে সুবিধা হয়।
সুধাংশু ভাবলে এখানে চাকরি করার চেয়ে সরে পড়াই যেন ভাল। ওই দিব্যেন্দু এ-অফিসের কর্তা, নিয়োগ-বদলির দণ্ডমুণ্ড।
বড় সাহেবের দরজার সামনে এসে সুধাংশু দাঁড়াল, বিদ্যুৎস্পৃটের মত একটা সন্দেহ তার মাথায় খেলে গেল-দিব্যেন্দুর এই পদোন্নতিতে নারী-রূপরস-সুরের কোন পরোক্ষ হাত নেই তো? মিস্টার শিবলিঙ্গ কি দিব্যেন্দুকে এমনি সুনজরে দেখেছিল? কিসের বিনিময়ে এসমৃদ্ধি দিব্যেন্দুর? সেদিন সুনীতির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে এর যেন আভাষ সুধাংশু পেয়েছিল। আপনারা মিথ্যে চেষ্টা করছেন, আমি ভালই আছি-মানে কি?
ডিরেক্টর সাহেবের কামরার একটা পাল্পা ফাঁক করে চাপরাসীটা তখনও অপেক্ষা করে।
ঠিক এই মুহুর্তে বন্ধুকে সম্বর্ধনা করা উচিত হবে কি না ভেবে ঠিক না। করতে পেরেই বোধ হয় সুধাংশু পা-পা পিছিয়ে যায়। ভয়ে।
গল্পের এইখানেই শেষ।
গল্পটা পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত হবার আগে প্রভাত নিজেই প্রথম প্রুফ দেখে দিয়েছিল। মেক-আপ প্রুফ আমরাই দেখে দিয়েছি, পরের দিন সকালে প্রেস-এ ফর্মা ছাপতে যাবে। হঠাৎ সন্ধ্যেবেলা টেলিফোনে প্রভাত বললে যে, সে প্রফটা আরেকবার দেখতে চায়, দু-একটা শব্দ অদল-বদল করতে হবে।
সেদিন সন্ধ্যায় আমার একটু তাড়াতাড়ি বেরোবার তাড়া ছিল, তাই মেকআপ, ম্যানকে বলে গেলাম প্রভাত এলে প্রুফটা ওকে আরেকবার দেখাতে।
পরদিন সকালে অফিসে গিয়ে দেখি ফর্মা যেমন-কে-তেমন পড়ে আছে, ছাপাখানায় যায় নি। মে-আপ ম্যান প্রভাতের দেখা প্রফগুলি আমার টেবিলে হাজির করে বললে-কী করে ফর্মা যাবে বলুন? সব গল্পটা তো আবার কম্পোজ করতে হবে।
মানে? পেজ-প্রুফের উপর তাকিয়ে দেখি লেখক সুধাংশুর বন্ধুর নামটা বদলে আগাগোড়া দিব্যেন্দু করে রেখেছে। গল্পের প্রতি লাইনেই সুধাংশুর বন্ধুর উল্লেখ, এবং তা বদলাতে গেলে সবটা পুনর্বার কম্পোজ করা ছাড়া উপায় নেই। লাইনো যন্ত্রের অনেক সুবিধার মধ্যে ওই-একটি মস্ত অসুবিধা হচ্ছে যে, লাইনের একটি কমা বা দাড়ি বদলাতে হলে পুরো লাইনটাই আবার কম্পোজ করতে হয়।
একবার ভাবলাম ফর্মা না আটকে রেখে যেমন আছে তেমনি ছেড়ে দিই।
কিন্তু আগাগোড়া রি-কম্পোজ হবে জেনেও প্রভাত যখন নামটা পালটেছে তখন নিশ্চয় কোন বিশেষ কারণ আছে মনে করেই সংশোধন করতেই বলে দিলাম।
তখন কি আর জানতাম যে রিয়ালিষ্টিক গল্প লিখতে গিয়ে প্রভাত দিব্যেন্দুক চাকুরি ক্ষেত্র, তার বাড়ির পরিবেশ এমনকি তার পৈত্রিক নামটাও সে হুবহু রেখে দিয়েছে! শেষ মুহূর্তে শুভবুদ্ধির উদয় হতে শুধু নামটুকু পালটে দিয়ে আইনকে হয়তো ফাঁকি দিয়েছে কিন্তু যাকে নিয়ে গল্প তার কাছে তো ধরা পড়তেই হবে এবং আইন যে সে আবার নিজের হাতেই নিয়ে বসবেগল্প লেখার নেশায় বোধ হয় সেদিন প্রভাতের সে হুঁশ ছিল না।
দিব্যেন্দুর আসল নামটা ওই একই কারণে আপনাদের কাছে আমি প্রকাশ করতে অপারগ, সুতরাং প্রভাতের দেওয়া নামেই আমি একাহিনী বলছি।
পূজা সংখ্যা প্রকাশিত হল মহালয়ার আগের দিন বিকেলে, মহালয়ার পরের দিন বিকেলে দুমুখ বিশুদা দুঃসংবাদ নিয়ে এসে আমার মধ্যেও ভয় ঢুকিয়ে দিলেন। পরদিন সকালেই সাতদিনের ছুটি নিয়ে চলে গেলাম শান্তিনিকেতন, কাজ কি এসময় কলকাতায় থেকে।
সাত দিন পর কলকাতায় ফিরেই প্রথম খোঁজ করলাম প্রভাতের। কেন ও এ-গল্প লিখে ওর বন্ধুকে এমন বে-ইজ্জত করল, আর কেনই বা মাঝখান থেকে প্রভাতের নিরীহ দাদা মার খেল। তাছাড়া দিব্যেন্দু এখনও ক্ষেপে আছে কি-না সেটাও জানা দরকার। যণ্ডামার্কা চেহারা হলে কি হবে। শুনলাম প্রভাত এক মাসের ছুটি নিয়ে তার পৈত্রিক ভিটে বজবজের কাছে মালা গ্রামে চলে গিয়েছে।
প্রভাতের মত দশাসই চেহারার মানুষটার মনেও কি মার খাবার ভয় ঢুকেছে? তা হলে আমি তো কোন ছার। রীতিমত চটে গেলাম প্রভাতের উপর। একবার সামনে পেলে হয়। অগত্যা ক্রোধটা মনে মনেই পুষে রেখে প্রভাতের পুনরদয়ের দিন গুনছি।
দিব্যেন্দুকে আমি চিনি না। প্রভাতের অন্যান্য বাল্যবন্ধুদের মধ্যে যাদের সাহিত্যের নেশা আছে তাদের অনেকের সঙ্গেই আমার পরিচয় আছে। দিব্যেন্দুর সঙ্গে আমার কোন পরিচয়ই নেই। গল্প পড়ে ওর চেহারার একটা আন্দাজ করে রেখেছিলাম, সুটেড-বুটেড টিপটপ সাহেব, হাতে সিগারেটের টিন। সুতরাং অফিসে যাওয়া-আসার পথে সাহেবী পোশাকপরা যুবকদের দিকে সন্দেহের দৃষ্টি রেখেই চলা-ফেরা করতাম। বলা তো যায় না, জনারণ্যের মধ্যে থেকে হয়তো সাহেবী পোশাকধারী দিব্যেন্দু আমার ঘাড়ে অতর্কিতে লাফিয়ে পড়তে পারে। একদিন দুপুরে অফিসে বসে আছি, টেলিফোন বেজে উঠল।
হ্যালো, কে কথা বলছেন?
আমি বিনয় ঘোষ।
কি খবর বিনয় বাবু, ভাল আছেন তো? কী ব্যাপার?
গম্ভীর গলায় বিনয় বাবু বললেন–ব্যাপার খুবই গুরুতর।
বিখ্যাত ঐতিহাসিক প্রাবন্ধিক বিনয়বাবু আমাদের বহুকালের বন্ধু। এক সময়ে আনন্দবাজার পত্রিকার রবিবাসরীয়র উনি ছিলেন নিয়মিত লেখক। ১৯৪০-৪১ সালের কথা। প্রতিদিন সন্ধ্যায় অফিসের পর আমরা দল বেঁধে আড্ডা দিয়েছি। সুবোধ ঘোষ, মন্মথনাথ সান্যাল, অরুণ মিত্র, স্বর্ণকমল ভট্টাচার্য, বিজন ভট্টাচার্য আর প্রভাত দেবসরকার ছিলেন আমাদের সেদিনের আড্ডার নিত্য সঙ্গী। একেকদিন একেকজনের আস্তানায় আমাদের আড্ডা বসত, গল্প বা প্রবন্ধ পাঠ হত, আর তাই নিয়ে চলতে চুলচেরা আলোচনা, গভীর রাত পর্যন্ত। আমাদের মধ্যে বিনয় ঘোষ ছিলেন প্রভাতের পুরনো বন্ধু। এক পাড়ায় ওরা থাকত, এক কলেজেই পড়েছে।
