প্রভাত দেব সরকারের বিনিয়োগ গল্পের দুটি প্রধান চরিত্রই হচ্ছে দুই অন্তরঙ্গ বন্ধু। সুধাংশু আর দিব্যেন্দু। দুজনেই মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। ছাত্রজীবনে সুধাংশু প্রায় প্রতিদিনই দিব্যেন্দুর বাড়ি যেত, আচ্ছা চলত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বিধবা মায়ের একমাত্র অবলম্বন ওই ছেলে দিব্যেন্দু ও মেয়ে সুনীতি। তাদের মানুষ করে তোলার জন্য আর্থিক সংকটের মধ্যেও মায়ের সংগ্রাম দিনের পর দিন সুধাংশু দেখেছে। দিব্যেন্দুর বোন সুনীতি বয়সে কচি খুকী হলে কী হবে, চেহারায় যেমন মাধুরী ছিল, তার চেয়ে ঢের বেশী মাধুর্য সে ঢেলে দিত তার গানের গলায়। এই গান শোনবার লোভেই সুধাংশু ছাত্রজীবনে দিব্যেন্দুর বাড়ি কারণে-অকারণে গিয়ে আড্ডা
জমিয়েছে।
কলেজের পাট চুকিয়ে দিয়ে চাকরির ধান্দায় কে কোথায় ছড়িয়ে পড়ল, দুই বন্ধুর মধ্যে দীর্ঘকাল আর দেখা-সাক্ষাৎ নেই।
বহু বছর বাদে অকস্মাৎ দেখা হয়ে গেল সুধাংশুর সঙ্গে দিব্যেন্দুর। খবরের কাগজে সরকারী আফিসের একটা কেরানীর কাজের বিজ্ঞপ্তি দেখে সুধাংশু দরখাস্ত করেছিল। সেই দরখাস্তের কী হল না হল তারই একটু খোঁজ-খবর নিতে গিয়ে হঠাৎ সেই অফিসের সিঁড়িতে দেখা হয়ে গেল দিব্যেন্দুর সঙ্গে। দিব্যেন্দুর চেহারা, চালচলন, সাজপোশাক সব পাল্টে গেছে, চেনবার উপায় নেই। একেবারে পাক্কা সাহেব। সুধাংশুকে প্রথমেই জানিয়ে দিলে ওরকম বাঙালী মার্কা ধুতি পাঞ্জাবি চেহারায় এ-অফিসে কেরানীর চাকরিও জোটে না। ইন্টারভিউতেই আস্মার্ট বলে নাকচ হয়ে যাবে। আরও জানিয়ে দিলে, যদিও সে সামান্য টাইপিস্টের চাকরি নিয়ে ঢুকেছিল, আজ সে বড় সাহেবের পি. এ.। আঙুল দিয়ে দেখিয়েও দিলে অদূরে দরজায় লেখা আছে ভি. মুখাজি, পি. এ.।
সুধাংশুর খোঁজ নিয়ে দিব্যেন্দু জানলে সে-এখন পাঁচ ছেলের বাবা, সামান্য মাইনের সরকারী চাকরি করে অন্যত্র। কিন্তু এ-চাকরিটা পেলে পরিশ্রম কিছুটা লাঘব হয়, তাছাড়া কাজটাও মনের মতন। সুধাংশুর যাতে চাকরিটা হয়ে যায় সে আশ্বাস দিয়ে দিব্যেন্দু বললে একদিন ওর বাড়িতে আসতে। আগের বাড়িতে নেই, নতুন বাড়িতে উঠে গেছে। বোন সুনীতির বিয়ে দেবার জন্য খুবই চেষ্টা করছে, হাজার দশ-বারো টাকা খরচ করতেও প্রস্তুত। কিন্তু বাংলা দেশে উপযুক্ত পাত্র মেলা দুরূহ বলেই বিয়ে দিতে পারছে না। বোনর বিয়ে না দিতে পারলেও নিজে কিন্তু এক বড়লোকের মেয়েকে সম্প্রতি বিয়ে করেছে, সে-কথা সুধাংশুকে জানাতে ভোলে নি দিব্যেন্দু। দিব্যেন্দুর লম্বা-চওড়া কথাবার্তা সুধাংশুর যেন ভাল লাগল না। মানুষটা যেন অন্য রকম হয়ে গেছে। তবু চাকরির আশ্বাস পেয়ে খুশি মনেই সুধাংশু চলে এল, আসবার সময় কথা দিয়ে এল একদিন ওর বাড়ি যাবে।
কিছুদিন পর এক ছুটির দিন বিকালে সত্যি সত্যিই সুধাংশু রাস্তা আর বাড়ির নম্বর খুঁজে দিব্যেন্দুর বাড়িতে এসে হাজির। ওর অনুরোধে সুনীতির জন্য একটি ভাল পাত্রের সন্ধান যোগাড় করেছে সেটা তাকে জানিয়ে আসা দরকার আর সেই সঙ্গে চাকরিটারও একটু খোজ খবর।
কড়া নাড়তেই কিছুক্ষণ পরে একটি নারীমুর্তি দরজা খুলে দেখা দিল। সুধাংশু চিনতে পারল সুনীতিকে। বয়সের স্বাভাবিক সৌন্দর্য কেমন যেন ম্লান হয়ে গেছে অনেক দিনের ফোঁটাফুল বৃস্তচ্যুত না হওয়ার মত। দিব্যেন্দুর কথা জিজ্ঞাসা করতেই জানতে পারল, শ্বশুরবাড়ি থেকে গাড়ি এসেছিল, দিব্যেন্দু বউকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে গেছে। মা গেছে কালীঘাটে, বাড়িতে
একাই আছে সুনীতি।
সুধাংশু অপ্রস্তুত হয়ে জিজ্ঞাসা করল।
তুমি তা হলে একলা আছ?
একলাই তত থাকি।
আজকাল গানটান গাও না?
শুনবে কে?
কেন, নিজে।
সব জিনিস কি নিজের জন্য হয়?
পর্দাতে আঁকা-ছবির মত স্থির নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সুনীতি। সুধাংশুর কথা ফুরিয়ে গেছে। অনেক কিছু জিজ্ঞাসা করবার ছিল, সব যেন গোলমাল হয়ে গেছে। সুধাংশু যাবার জন্যে উঠে দাঁড়াল।
সুনীতিরও বোধ হয় কিছু বলবার নেই। সুধাংশু চলে যাবার সময় আলো নিবিয়ে সদর দরজা বন্ধ করতে করতে সুনীতি যেন নিজেকে শুনিয়ে অস্ফুটে বললে, কেন মিথ্যে আপনারা চেষ্টা করছেন-আমি ভালই আছি।
সুধাংশু চমকে ফিরে তাকাল। অন্ধকারে আধভেজানো দরজার ফাঁকে দুটি সজল চোখ দেখা গেল মুহূর্তের জন্য। তার সুদীর্ঘ কুমারী জীবনের কোনও দুঃখের কথাই বোধ হয় সে বলতে চাইল। সুধাংশু সেই কথাই ভাবতে ভাবতে চলে এল।
ছমাস পরে সুধাংশুর ইন্টারভিউর ডাক এল। খুশি হলেও আর যেন চাকরিটার ওপর তেমন লোভ নেই সুধাংশুর। দিব্যেন্দুর অফিস, দু-বেলা হামবাগটার লম্বা লম্বা কথা শুনতে হবে।
তবু হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলা ঠিক নয় ভেবে ইন্টারভিউতে যাওয়াই স্থির করলে। বিদ্যে বুদ্ধি যখন তারও আছে তখন দিব্যেন্দুর মত উন্নতি সেও বা করতে পারবে না কেন?
নতুন অফিসের হাল-চাল জানবার জন্যে সুধাংশু সোজা দিব্যেন্দুর ঘরে উপস্থিত হল। কিন্তু দরজা খুলেই সুধাংশু পিছিয়ে এল, দিব্যেন্দুর জায়গায় অন্যলোক।
অপ্রস্তুতি কাটিয়ে উঠে মিঃ মুখার্জির কথা জিজ্ঞাসা করতেই ভদ্রলোক বেল বাজিয়ে চাপরাসীকে ডেকে বললেন–ডি পি-র ঘরে নিয়ে যাও।
বেরিয়ে চাপরাশীকে সুধাংশু জিজ্ঞাসা করলে, ডি পি কেন হ্যায়?
চাপরাসী বললে-বড় সাহাব আছেন, ডিরেক্টর সাহাব।
এতক্ষণে দিব্যেন্দুর নতুন পদের তাৎপর্য বুঝতে পারে সে। ডিরেকটার অব, পারশোনে। দিব্যেন্দু করেছে কি? পাঁচ শো থেকে একেবারে বানো শো?
