এপ্রিলের শেষ, দুপুরে প্রচণ্ড গরম। রাস্তার পিচ গলে এমন অবস্থা যে জুতো আটকে যায়, হাঁটতে গেলে পা খুলে বেরিয়ে আসে। জনবিরল রাস্তা, কিন্তু পাগলটা ঠিক সেই বোয়াকে চুপচাপ বসে আছে। আমরা যথারীতি শরবতের দোকানে আসর জমিয়েছি।
হঠাৎ শুনি পাগলটা কাকে যেন প্রচণ্ড ধমকে বলছে—খবরদার, ওদিকে এগোসনি, ফিরে যা। ইনসিওর করেছিস? না করে থাকলে এখুনি ফিরে গিয়ে কাছে পিঠে লাইফ ইনসিওরের অফিসে গিয়ে এক্ষুনি ইনসিওর করিয়ে পাগলটাকে প্রায়ই তো আমরা দেখি এবং চুপচাপ বসে থাকতেই দেখি। হঠাৎ ক্ষেপে গেল কেন? কৌতূহল হল। দোকান থেকে উঁকি মেরে দেখি রাস্তায় ফুটপাতে মাঝবয়সী এক ভদ্রলোক ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে আছেন আর পাগলটা কিছুতেই তাকে মির্জাপুর স্ট্রীট দিয়ে শ্রদ্ধানন্দ পার্কের দিকে যেতে দেবে না। বারবার বলছে-ওদিকে খবরদার যাবি না। ফিরে যা।
পাগলের কথা তো। ও পাড়ার দু-একজন দোকানদার পাগলটাকে ধমকে দলে, ভদ্রলোকও পাগলের পাগলামিতে কান না দিয়ে যে দিকে যাচ্ছিলেন সেই দিকেই পা বাড়ালেন।
বেশীদূর যেতে হল না। রমানাথ মজুমদার স্ট্রীট পর্যন্ত গেছেন, এমন সময় গলি থেকে ঝড়ের বেগে একটা ট্যাক্সি বেরিয়ে এসে লোকটাকে চাপা দল। হইহই চিৎকার শুনে আমরা ছুটে গেলাম, ভদ্রলোকের রক্তাক্ত দেহটা তুলে তখনি নিয়ে গেলাম মেডিক্যাল কলেজে। কলেজ পর্যন্ত পৌঁছবার মাগেই সব শেষ। ফিরে এসে পাগলটাকে ধরেছিলাম।বল তুই কী করে ঝিলি লোকটা মারা যাবে। কিছুই বলে না, গু হয়ে বসে থাকে। অনেক সাধাসাধির পর বলেছিল—লোকটার মুখ দেখেই বুঝেছিলাম। তাকিয়ে দেখি সামনের রাস্তার মোড়টায় সাক্ষাৎ যম ওর জন্যে দাঁড়িয়ে আছে। বারণ করেছিলাম, শুনলে না। আমার কী।
বনফুল থামলেন, আমি তখন বেঁহুঁশ হয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছি। সুবলবাবু বললেন—সেই পাগলটা কি তার পরেও ওখানে বসে থাকত?
বনফুল বললে—সেটা আরেক রহস্য। তারপরদিন থেকে পাগলটাকে আর কোনদিন ও তল্লাটে দেখি নি।
বনফুল আমার দিকে তাকিয়েই বললেন–কি হে, কিছু বলছ না যে। এটাকেও কি তুমি কাকতালীয় বলবে? তাহলে আরেকটা ঘটনা বলি শোন–
এবার আমি প্রায় জোর করে বিছানা থেকে উঠে পড়লাম। বললাম—বলাইদা, ঢের হয়েছে। আর নয়। পাঁচটা বাজে, অফিসে প্রচুর কাজ ফেলে এসেছি। এবারে চলি।
বলতে বলতে ঘরের বাইরে এসে যখন সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করেছি, তখনও বনফুল চিৎকার করে বলছেন—দু-চারদিনের ছুটি নিয়ে একবার ভাগলপুরে এস। অনেক ঘটনা তোমায় বলব—আমি ততক্ষণে রাস্তায় নেমে ভাগল।
আপনারাই বলুন। এর পরেও কি ভাগলপুরে যাওয়াটা আমার পক্ষে উচিত হবে?
১৪. পাঠকের দরবারে আসামীর মত
সম্পাদককেও যে লেখকরা কখনও কখনও পাঠকের দরবারে আসামীর মত হাজির করিয়ে ছাড়েন তারই এক করুণ ও তিক্ত অভিজ্ঞতা আমার একবার ঘটেছিল, যার উল্লেখ মাত্র করেছিলাম কয়েক মাস আগের এই বৈঠকে, যেদিন আড্ডার অন্যতম গল্পবাজ সভ্য বিশুদা এসে বলেছিলেন প্রভাত দেব সরকারের পূজা সংখ্যার গল্প বিনিয়োগ পড়ে জনৈক পাঠক লেখককে হাতের কাছে না পেয়ে তার দাদাকেই বেধড়ক পিটিয়েছে।
সেই সঙ্গে বিশুদা আমাকে দুশচিন্তায় ফেলে দিয়েছিলেন এই বলে যে, যেহেতু গল্পটি আমিই প্রকাশ করেছি সেই হেতু উক্ত মারকুটে পাঠক নাকি আমাকেও রেহাই দেবে না।
লেখকদেরও বলিহারি! আজকাল কোনও কোনও গল্প-লেখকদের মধ্যে কিছুকাল যাবৎ একটা প্রবণতা দেখা দিয়েছে যে, বাস্তব জীবন ও চরিত্র নিয়ে গল্প লিখতে হবে, কোনরকম কল্পনার ভেজাল তাতে থাকবে না। যা ঘটেছে এবং যা দেখেছি হুবহু তাই নিয়েই হবে গল্প। আজকালকার পাঠকরা নাকি বাস্তব ঘটনায়ী গল্প চায়, কল্পিত ঘটনায় তাদের অরুচি। আমার কিন্তু এতে আপত্তি ছিল না। আপত্তি হত না, যদি না এই বাস্তবধর্মী গল্প-প্রকাশের পরিণাম এমন মর্মান্তিক পরিহাসরূপে আমার জীবনে দেখা দিত।
বাস্তব ঘটনা নিয়ে লিখতে চান লিখুন, গল্প হলেই হল। এই গল্প হওয়াটাই হচ্ছে সবচেয়ে কঠিন কাজ এবং বাস্তব জীবনের কোনও একটি ঘটনাকে শিল্পকর্মে রূপ দেওয়াই হচ্ছে লেখকের কৃতিত্বের চরম সার্থকতা। প্রতিদিনই আমরা আমাদের চারিপাশে পরিচিত জনের জীবনে গল্পের মাল মসলা দেখতে পাই। রিয়ালিস্টিক সাহিত্যের মোহ পড়ে লেখক যদি মাল মসলাকে হুবহু লেখায় তুলে ধরেন তা কখনই গল্প হবে না, সেটা হবে রিপোর্টাজ। ফটোগ্রাফ আর শিল্পীর হাতে আঁকা ছবির যে প্রভেদ, রিপোর্টাজ আর গল্পেও সেই প্রভেদ। শিল্পী যখনই শহরের রাস্তার একটি ভিখারী বালিকার ছবি তুলির রেখায় ফুটিয়ে তুলেছেন তখনই সেই বালিকার অন্তর্নিহিত বেদনার একটি বিশেষ অভিব্যক্তিকে তিনি দর্শকের কাছে তুলে ধরার প্রয়াসী। সেই সঙ্গে শিল্পী তাঁর নিজের মনকেও সেই ছবির মধ্যে ঢেলে দেবার চেষ্টা করেন, তাঁর মনের প্রতিক্রিয়া সেই ছবির প্রতি টানে ধরা পড়ে যায়। তাকেই বলে শিল্পকর্ম। গল্প রচনার ক্ষেত্রেও এই শিল্পকর্মই হচ্ছে প্রধান কথা।
আমার যে-অভিজ্ঞতার কথা আজ আপনাদের কাছে বলতে যাচ্ছি তা আমার জীবনে কখনই ঘটত না, যদি না, প্রভাত পূজা সংখ্যায় বিনিয়োগের মৃত রিয়ালিষ্টিক গল্প না লিখত। সে-অভিজ্ঞতা বলার আগে বিনিয়োগ গল্পের সারার্থ আপনাদের কাছে না বলে রাখলে আমার এই অভিজ্ঞতার কাহিনীর মধ্যে যে বেদনা নিহিত আছে তা আপনারা উপলব্ধি করতে পারবেন না। আমি চাই, আমার সেদিনের অভিজ্ঞতা আমার এই লেখার পাঠকদের সঙ্গে আরেকবার এক পংক্তিতে বসে সমান ভাগে ভাগ করে নিতে এবং সেই জন্যেই কিছুকাল আগে এ-প্রসঙ্গের একটু উল্লেখ করে আজ সবিস্তারে বলতে বসেছি।
