হঠাৎ কোত্থেকে এক বেহেড, মাতাল আমার কাছে এসে উপস্থিত। খালি গা, পরনে একটুকরো ছেড়া কাপড়। প্রায়-উলঙ্গই বলা চলে। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা হাওয়া, কিন্তু তাতে যে তার কোনরকম কষ্ট হচ্ছে বোঝা গেল না। টলতে টলতে লোকটা আমার কাছে এগিয়ে এসে বিড়বিড় করে কী যে বলল, প্রথমে বুঝতেই পারলাম না। কথা জড়িয়ে গেছে, সোজা হয়ে দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই। অনেক কষ্টে ওর কথা যখন উদ্ধার করতে পারলাম তখন বুঝলাম ও আমার কাছে টাকা চায়, আরও মদ খাবে। আমার কাছে টাকা নেই বলাতে বিশ্বাস করল না। পাঞ্জাবির বঁ হাতের পকেটটার দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললে—তুমহারা জেব মে দোঠো রুপাইয়া হয়, মুঝকো দেও, হাম শরাব পিউঙ্গা। তাজ্জব ব্যাপার। লোকটা জানল কি করে যে আমার পকেটে দুটো টাকাই সম্বল। টাকা দুটো পকেট থেকে বার করে লোকটাকে দেখিয়ে বললাম যে, দুটো টাকাই আছে বটে কিন্তু তা আমাকে কুলিদের দিতে হবে। লোকটা টাকার জন্যে আর পীড়াপীড়ি না করে শুধু বললে-অভী তুমকো বত্রিশ রুপাইয়া মিল যায় গা। তব মুঝকো দে রুপাইয়া জরুর দেনা পড়ে গা। হাম শরাব পিউলা।
মাতালের কথা! কোথায় টাকা পাব, কে আমাকে দেবে। ওকে একেবারে হেসে উড়িয়ে না দিয়ে এক কথায় ওর প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলাম। লোকটা বিড়বিড় করে কী সব বলতে বলতে টলায়মান অবস্থায় রাস্তার মোড় ঘুরে ভাঙাচোড়া বাড়ি ঘরের আড্ডালে মিলিয়ে গেল।
মিনিট দশ-ও পার হয় নি। দেখতে পেলাম স্টেশনের দিকের রাস্তা দিয়ে একটা ঘোড়ার গাড়ি এগিয়ে আসছে। গাড়ির ছাতে বাক্স-বিছানা বাঁধা। গাড়িটা আমার বাড়ির সামনেই থেমে গেল। ভিতর থেকে বেরিয়ে এল আমারই কাটিহারবাসী পরিচিত এক রুগীর পুত্র আর পুত্রবধু। প্রণাম করে বললে—ডাক্তারবাবু, আপনার কাছেই আমরা এসেছি। যাচ্ছিলাম কাটিহারে, ভাগলপুরে এসে ট্রেন আর গেল না, লাইন খারাপ। কাল সকালের আগে লাইন ঠিক হবে না।
মহা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম। আমার নিজের অবস্থা তখন শয়নং হট্ট মন্দিরে। এক রাত্রির এই অতিথি দম্পতিকে কোথায় আশ্রয় দিই। আমাকে চিন্তান্বিত দেখে ছেলেটি বললে-আমরা কিন্তু আশ্রয়ের জন্যে আপনার কাছে আসি নি। ট্রেন তো স্টেশনেই দাঁড়িয়ে আছে, ট্রেনেই থাকব সে বন্দোবস্ত করে এসেছি। ভাগলপুরে যখন কয়েক ঘণ্টা আটকা পড়েই গেছি তখন আমরা ভাবলাম আপনাকে দিয়ে আমাদের ব্লাড ও ইউরিনটা পরীক্ষা করিয়ে নিই। আমরা দুজনেই ডায়াবিটিসে ভুগছি, বাবা বহুদিন আগেই বলেছিলেন আপনাকে দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে নিতে। আজ যখন এখানে আটকা পড়েই গেলাম তখন পরীক্ষাটা করিয়ে নেওয়াই স্থির করলাম।
হায় রে কপাল। পরীক্ষা যে করব সে-যন্ত্রপাতি তত ভেঙ্গে চৌচির হয়ে ধুলোয় পড়াগড়ি খাচ্ছে। ছেলেটির বাবা ব্লাডপ্রেশারের রুগী, তার উপর নানা উপসর্গও আছে। বরাবরই আমার কাছে রক্ত ইত্যাদি পরীক্ষা করিয়ে নেন, আমার ডায়োগনসি-এর উপর তার আস্থা আছে। কিন্তু তাঁর পুত্র ও পুত্রবধুর কী একজামীন করব? ভগ্নস্তুপের দিকে দেখিয়েই বললাম–দেখ আমার অবস্থা। রক্ত পরীক্ষার যন্ত্রটা কোন রকমে উদ্ধার পেয়েছে, কিন্তু অন্যটা একেবারেই অকেজো হয়ে পড়ে আছে। সুতরাং আমি তো তোমাদের কোন কাজেই লাগব না।
ছেলেটিও নাছোড় বান্দা।
বললে—তাহলে আমাদের রক্তটাই নিয়ে রাখুন।
হতাশ হয়ে আমি বললাম—তা না হয় নিয়ে রাখলুম। রেজাল্ট তত দু-এক দিনের মধ্যে জানাতে পারব না। লেবরেটরি আবার কোথাও খাড়া করতে সময় তো লাগবেই।
ছেলেটি বললে-তা লাগুক। অবিলম্বে রেজাল্ট জানার তাড়াহুড়ো আমাদেরও তেমন নেই, এক মাসের মধ্যে রেজাল্ট আপনার কাছ থেকে পেলাম তো ভালই না পেলে তখন অন্য ব্যবস্থা করা যাবে। আপনি আমাদের রক্তটা নিয়েই রাখুন।
বলব কি ভাই, সেই দুপুর নোন্দরে ধুলো বালি ঝেড়ে টেস্ট টিউব আর oxalate বার করে কোনক্রমে দুজনের রক্ত নিয়ে ব্যাগে ভরে রাখলাম।
ওরাও ৩২ টাকা ভিজিট দিয়ে ঘোড়ার গাড়ি চেপে স্টেশনের দিকে চলে গেল।।
বনফুল থামলেন। আমার মুখের দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টি মেলে তাকালেন। অর্থাৎ এর কী ব্যাখ্যা তুমি করবে। আমি নিরুত্তর। সুবলবাবু বলে উঠলেন-টাকাটা পেয়েই মাতালটাকে দুটো টাকা দিয়েছিলেন তো?
বনফুল বললেন—আর বল কেন ভাই। সেও এক দুর্ভোগ। কুলিদের কাজ দেখা পড়ে রইল, রাস্তায় রাস্তায় খুঁজে বেড়িয়েছি সেই লোকটাকে। কোথাও তার আর দেখা পেলাম না।
ভেবে দেখলাম এর পরে আর বনফুলের কাছে বসে থাকা নিরাপদ নয়। আমার মত ঘোর অবিশ্বাসীকে প্রায় পেড়ে ফেলেছেন। এখনও পালাতে পারলে আত্মরক্ষা করলেও করতে পারব। সেকথা বলতেই বনফুল বাধা দিয়ে বললেন—উহুঁ, সেটি হচ্ছে না। তোমাকে সহজে ছাড়ছি নে। এটাকেও তুমি কাকতালীয় গোছের একটা কিছু যুক্তি দেখালেও দেখাতে পার। কিন্তু এর চেয়েও মারাত্মক ঘটনা আমার নিজের চোখের সামনে ঘটেছে, সেটা অন্তত শুনতেই হবে।
এর আগের দুটো ঘটনা আমার কাছে পাতিয়ালা পেগ-এর সামিল। একেবারে ভোম মেরে গেছি। এর উপর যদি আরেকটা স্টিফ, ভোজ পড়ে তাহলে একেবারে না হয়ে যাব। কিন্তু এ ধরনের কাহিনীর একটা মজা হচ্ছে এই যে, শ্রোতাকে শেষ পর্যন্ত এ-নেশার কাছে আত্মসমর্পণ করতেই হয়, আমিও করে বসলাম।
বনফুল বললেন–আমি তখন মেডিকেল কলেজের ছাত্র। গরমের সময় দুপুরে আমাদের একমাত্র কাজ ছিল কলেজ ফাঁকি দিয়ে মির্জাপুর আর কলেজ স্ট্রীটের মোড়ে প্যারাগন বলে যে শরবতের দোকান আছে সেখানে বসে আড্ডা দেওয়া আর ঘোলের শরবত খাওয়া। শরবতের দোকানের পাশেই ছিল একটা বোয়াক, সেখানে প্রায়ই দেখতাম একটা পাগল তার উস্কোখুস্কো চেহারা আর খোঁচাখোঁচা দাড়ি গোঁফ নিয়ে চুপচাপ বসে থাকত। চেঁচামেচি সে কখনও করত না। তার কাজই ছিল রাস্তা দিয়ে যে-সব লোক যাতায়াত করত তাদের মুখের দিকে শ্যেন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা।
