বনফুল বললেন–ওঁর চোস্ত হিন্দী জবানী শুনে তিব্বতী বলে তো মনে হল না। কিন্তু তিব্বতী বলে তোমার ধারণা হল কেন?
আমি বললাম-সম্প্রতি একটি ইংরেজী বইয়ে পেয়েছি এই ধরনের গণনা পদ্ধতির প্রচলন তিব্বতী জ্যোতিষীদের মধ্যেই বেশী।
বনফুল বললেন—এমনও হতে পারে যে কোন তিব্বতী গুরুর কাছ থেকেই উনি এই ক্ষমতা লাভ করেছিলেন। আমি তো আগেই বলেছি যে এসব সাধুর পূর্বপরিচয় পাওয়া দুঃসাধ্য। যাক, যে-কথা বলছিলাম। তারপর কি হল জান? সত্যি সত্যি গঙ্গা অজি যেখানে রয়েছে সেদিন থেকে সেখানেই থেকে গেল। এত বছর পার হয়ে গিয়েছে, এক ইঞ্চি আর এগোয় নি। যদি কখনও মনিহারীতে আমার বাড়ি আস তুমি নিজেই দেখে বিস্মিত হবে।
অবিশ্বাসীর মন নিয়েই আমি বললাম-ও রকম কাকতালীয় ব্যাপার প্রায়ই হয়। ভৌগোলিক কারণেই গলা আপনার বাড়ি পর্যন্ত এসে তার গতি পালটেছে।
বনফুল সাধুসন্ন্যাসীতে বিশ্বাসী হলে কি হবে। যুক্তিবাদী মনটা যাবে কোথায়। আমার কথাকে সরাসরি উড়িয়ে না দিয়ে বললেন–মানলুম সে কথা। ওটা কাকতলীয় ব্যাপার হলেও হতে পারে। কিন্তু পরদিন সকালেই টেলিগ্রাম এল, ভাইয়ের বদলির অর্ডার ক্যানসেলড। এটাকেও কি তুমি কাকতলীয় বলে উড়িয়ে দিতে চাও?
এ-কথার পর মচকালেও ভাঙ্গি নি। তাই বললাম—এ ঘটনার পিছনেও অন্য কোন কার্য-কারণ ছিল, অনুসন্ধান করলেই জানতে পারতেন।
বনফুল বললেন–তা-ও কি আর জানি নি, জেনেছি। ব্যাপারটা কি হয়েছিল শোন। ভাইয়ের বদলির আদেশ দিয়েছিলেন ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান। কিন্তু তখন এক সিভিল সার্জন ছিলেন বাঙালী। তাঁর সঙ্গে চেয়ারম্যানের তেমন বনিবনা ছিল না। তিনি বললেন, ডাক্তারকে বদলি করবার মালিক আমি, আপনি নন। আমি যখন কাউকে বদলি করতে বলব তখন আপনি তার ব্যবস্থা করবেন। তার আগে নয়। এখনই বদলি নাকচ করে টেলিগ্রাম করে দিন।
সেই টেলিগ্রাম এল কি না সাধুর গণনার পরের দিন সকালে। সাধুকে আমি প্রণামী হিসেবে কিছু টাকা ও কাপড়চোপড় দিতে চাইলাম, কিছুতেই গ্রহণ করলেন না। বিকেলেই উনি আমার বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন। সেদিনের পর আজ পর্যন্ত সেই সাধুর কোনও সন্ধান আমি পাই নি।
এবার সত্যিই আমার অবাক হবার পালা। বনফুল আমার বিমূঢ় অবস্থা দেখে বললেন–কি, আর যে তর্ক করছ না। শুনে অবাক হয়ে গেলে তোত? এ আর কি শুনলে? এর চেয়েও অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটেছে আমার জীবনে।
ধীরে ধীরে কী যেন একটা নেশা আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। সেটা কি বনফুলের মুখে গল্প শোনার নেশা? না কি অলৌকিক ঘটনা শোনার নেশা যা যুক্তি আর বুদ্ধিকে আস্তে আস্তে অবশ করে ফেলে। আমি শোনবার জন্যে উদগ্রীব হয়ে উঠতেই বনফুল বললেন–
বিহারের ভূমিকম্প যেবার হয়েছিল সে-সময় ভাগলপুরে আমি ছোট্ট একটা একতলা বাড়িতে থাকতাম। ছোট সংসার। স্ত্রী, একটি মেয়ে, একটি ছেলে। ছেলেটি তখন কোলের শিশু। সামনের ঘরে ছিল আমার ল্যাবরেটরি, ডাক্তারী যন্ত্রপাতি সব থাকত। পিছনে থাকতাম আমরা। ভূমিকম্প যেদিন শুরু হল সেদিনটি আজও আমার চোখের সামনে ভাসছে। দুপুরবেলা হঠাৎ শুরু হল প্রচণ্ড কম্পন। দরজা জানলা খাট টেবিলগুলোকে যেন কোন এক অদৃশ্য হাত আছড়ে ভাঙতে চাইছে। তৎক্ষণাৎ স্ত্রী, কন্যা আর শিশুপুত্রটিকে নিয়ে একেবারে যাকে বলে একবস্ত্রে ছুটে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম সামনের ফাকা মাঠে। সেখানে কম্পনের তীব্রতা এত বেশী যে দাঁড়িয়ে থাকার উপায় নেই, আছড়ে ফেলে দেবে। তাই মাটি আঁকড়ে পড়ে রইলাম সেই মাঠে, আর চোখের সামনে দেখলাম আমার বাড়িটা ফেটে চৌচির হয়ে ভেঙে পড়ল, একেবারে ভগ্নস্তুপে পরিণত হল। নতুন দামী যন্ত্রপাতি কিনে সবে প্যাথলজির লেবরেটরি করেছিলাম তা ইটের স্তপে চাপা পড়েছে। আমার নতুন তৈরী লেবরেটরিটা গেল, সেইটিই আমার দুঃখ। আমার স্ত্রীর দুঃখ তার গয়না থেকে শুরু করে সংসারের যাবতীয় জিনিস ইটের তলায় হয়তো তছনছ হয়ে গেছে। সমস্ত ভাগলপুর শহরটাই মুহূর্তের মধ্যে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল, চারিদিকে কান্নার রোল আর হাহাকার। স্ত্রী-পুত্রকে নিয়ে কোনরকমে রাতটা আমার এক পরিচিত বন্ধুর আস্তানায় কাটিয়ে পরদিন সকালেই বেরিয়ে পড়লাম কুলির সন্ধানে। ভূমিকম্পের সময় যে-পাঞ্জাবিটা গায়ে ছিল তার পকেটে ছিল মাত্র দুটি টাকা। সেই দুটি টাকাই ছিল আমার শেষ সম্বল। পোস্টাফিস ভেঙেচুরে একাকার, উপায় ছিল না টাকাকড়ি তুলবার। টাকা যোগাড় করব কোথায়? সকলেরই তো এক অবস্থা, শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই পেলেই যথেষ্ট। সেই দুটি টাকার করে জন চার কুলি সংগ্রহ করলাম আমার বাড়ির সেই ভগ্নস্তুপ থেকে জিনিসপত্র উদ্ধারের জন্য। বাড়ির কাছেই ছিল একটা ছোেট্ট ক্যালভার্ট। কুলিরা কাজ করছে, আমি ক্যালভার্টে বসে তদারক করছি। মাঘ মাসের শীত, হাড়-কাঁপানো ঠাণ্ডা। কনকনে সেই ঠাণ্ডা হাওয়া গায়ের চামড়ায় ছুচের মত বিধছে। অনেক কষ্টে রক্তপরীক্ষার যন্ত্র মাইক্রসকোপ, আর কোলোরিমিটারটা অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা গেল কিন্তু মল-মূত্র পরীক্ষার ইলেকটিক সেন্ট্রিফিউজ যন্ত্রটা ভেঙে চুরমার। পাঁচ শ টাকা দিয়ে যন্ত্রটা নতুন আনিয়েছিলাম। চুপচাপ বসে আছি। দুপুর বেলা, রাস্তায় লোক চলাচল কমে এসেছে। কুলিরা এক-এক করে জিনিসপত্র উদ্ধার করে আনছে আর আমি সেই ভাঙাচোরা জিনিসগুলোর দিকে শ্মশানবৈরাগ্যের দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছি।
