আমি বললাম-মনে আছে বইকি। গুহা-মানবের আদিম প্রয়ুক্তি নিয়ে সেই উপন্যাস তো আমার হাত দিয়েই ছাপা হয়েছিল। কিন্তু কথা ছিল স্থাবরের দ্বিতীয় খণ্ড আপনি লিখবেন। তার কি হল?
একটু হেসে বললেন–আশা ছাড়ি নি। ওঁ গণেশায় নমঃ করে খাতায় লেখা শুরুও করে দিয়েছি, এবার ফিরে গিয়ে লেখাই হবে আমার একমাত্র কাজ। ডাক্তারী থেকে তো প্রায় অবসর নিয়েছি, এখন আমার অফুরন্ত সময়।
এমন সময় চা আর প্লেট ভরতি রসগোল্লা এসে হাজির। ভৃত্যের কাছ থেকে হাত বাড়িয়ে নিজের চিনি ছাড়া কাপটি নিয়ে বললেন–আচ্ছা, তোমাদের কাগজে জ্যোতিষ নিয়ে কে লেখেন বল তো?
নামটা বললে চিনতে পারলেন বলে মনে হল না। শুধু বললেন–রাশিফল তোমাদের কাগজে যে-ভাবে লেখা হয় তার অসুবিধা কি জানো? জ্যোতিষ সম্পর্কে পাঠকদের জ্ঞানকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে বোঝাবার চেষ্টা করা হচ্ছে না। যেমন ধর লেখা হলো ভৃগুর মতে বৃষ রাশিতে যাদের জন্ম এ-সপ্তাহে তাদের আর্থিক ক্ষতি ঘটবে। হাজার-হাজার পাঠকের বৃষ রাত্রিতে জন্ম। তাদের সকলের কি আর্থিক ক্ষতি ঘটে? অনেকের আর্থিক লাভও হয়ে থাকে। অর্থাৎ কিনা একের সঙ্গে আরের মিল হয় না। তাই বলছিলাম ওভাবে না লিখে প্রতি সপ্তাহে একটি রাশি নিয়ে গ্রহের অবস্থান সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে আলোচনা থাকলে পাঠকরা নিজেরাই তার ফলাফল গণনা করে বার করতে পারবে।
জ্যোতিষ সম্পর্কে বনফুলের এতখানি উৎসাহ দেখে বিস্মিত হলাম। জ্যোতিষে আমার নিজেরই বিশ্বাস নেই। আমি তাই আমার জন্মলগ্ন জন্মরাশি নক্ষত্র ইত্যাদি কিছুই জানি না, জানবার আগ্রহও নেই। আগ্রহ ছিল না। বলে বেঁচে গিয়েছি। যা হয়েছি তারই দুশ্চিন্তায় মাথার ঘায়ে কুকুর পাগল। তার উপর অতীতে যা হতে পারতাম আর ভবিষ্যতে যা হতে পারব সেই দুশ্চিন্তা যদি চাপে তাহলে পাগলা গারদে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। এ-রকম রাশি-নক্ষত্রের পাগল আমি দু-চারজন দেখেছি বলেই আমার এই ধারণা।
বনফুল নিজে ডাক্তার, তার উপর আজীবন বিজ্ঞানের ছাত্র। তার যে এমন জ্যোতিষের ব্যামো আছে কী করে বিশ্বাস করি। তাই ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করলাম—আপনার লেখা পড়লে বোঝা যায় যে আপনার মন বিজ্ঞানভিত্তিক। আপনি কি মানবজীবনের ভূত ভবিষ্যতে বিশ্বাস করেন?
বনফুল বললেন–দ্যাখো, মানুষের জীবনে এমন অনেক অঘটন ঘটে-যুক্তি দিয়ে যার বিচার চলে না। আমারই জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার একটা কাহিনী তোমাকে বলি।
মনিহারীতে আমাদের বাড়িতে সাধু সন্ন্যাসীর যাতায়াত আগে ছিল। সেখানে আচমকা প্রায়ই সন্ন্যাসীর আবির্ভাব ঘটত। কোথা থেকে আসেন কী তাঁর পরিচয়, কোথায় যাবেন তা জানবার কোন প্রয়োজন হত না। তাঁরা। আসতেন, একদিন বা দুদিন আমাদের বাড়িতে থেকে চলে যেতেন। বহু অনুরোধ করলেও দু-একদিনের বেশ কিছুতেই তারা থাকতেন না। এঁদের দেখলে মনে পড়ে যায় সন্ত কবিরের বিখ্যাত সেই উক্তি—বহতা পানি রমতা সাধু। এমনি এক সাধুর আবির্ভাব ঘটেছিল আমাদের বাড়িতে আমাদের চরম বিপর্যয়ের সময়ে। তুমি যদি মনিহারীতে কখনও আমার বাড়িতে আস তাহলে দেখবে গঙ্গা আমার বাড়ির প্রায় গা ঘেষেই বয়ে চলেছে। কিন্তু আমি যে দিনের কথা বলছি তখন গঙ্গা ছিল বহু দুরে, আমার বাড়ি থেকে আধমাইলের ওপর দুর দিয়ে গঙ্গা বইত। হঠাৎ গঙ্গার পাড় ভাঙতে আরম্ভ করল। দেখতে দেখতে মাস খানেকের মধ্যেই গঙ্গা একেবারে আমার বাড়ির খুব কাছে এসে পড়ল। আমার ভয় হলো যে আর দিন সাতেকের মধ্যে আমার বাড়ি গঙ্গা গর্ভে বিলীন হবে। আমাদের তখন মানসিক অবস্থা কি বোঝ। সেই সময়েই আমার পরিবারে দেখা দিল আরেক বিপদ। আমার এক ছোট ভাই, সেও ডাক্তার। তখনকার দিনে ছোট ডিস্ট্রিক টাউনে সরকারী কর্মচারীদের মধ্যে চক্রান্তের অন্ত ছিল না। আজও যে নেই তা নয়। হঠাৎ আমার ভাইয়ের নামে ট্রান্সফারের এক নোটিস এসে হাজির। আর এমন জায়গায় ট্রান্সফারের আদেশ এল যে সেখানে নতুন করে ঘর-সংসার পেতে চাকরি করা ওর পক্ষে দুঃসাধ্য ব্যাপার। এ দিকে বাড়ি যায়, ওদিকে ভাইয়ের বদলি। এই ঘোর বিপদের সময় আমাদের বাড়িতে এক সাধু এসে হাজির। আমার এক আত্মীয় আমাকে পরামর্শ দিলে, সাধুকে এই আসন্ন বিপদের কথা খুলে বলতে। সাধুর কাছে আমার বিপদের কথা খুলে বললাম। চুপ করে সাধু সব শুনলেন, কোন প্রশ্ন করলেন না। ঝোলা থেকে পাস খেলার ঘুটির মত তিনটে পিতলের পাশার খুঁটি বার করলেন, সেগুলির উপর কতকগুলি সংখ্যা লেখা। ঠিক যেমন ভাবে পাশার ঘুটি চালে, সেই তিনটি সেইভাবে মেঝেতে চাললেন। সংখ্যাগুলি যা দেখা দিল তা নিয়ে মনে মনে যেন কী হিসাব করলেন। খুব গম্ভীর আর চিন্তান্বিত মুখ সাধুর। তাহলে কি এ-বিপদ থেকে মুক্তির কোন আশাই নেই? কিন্তু অবাক হয়ে গেলাম সাধুর মুখে উজ্জ্বল হাসি দেখে। আমার মুখের উপর প্রসন্ন দৃষ্টি মেলে সাধু বললেন–গঙ্গা মাঈ যহাতক আ পেীছি উহিই ঠহর গয়ী, ঔর আগে ন বঢ়েগী।
রুদ্ধ নিঃশ্বাসে প্রশ্ন করলাম—মেরা ভাইয়া কো বদলি?
সাধু আবার মেঝের উপর ঘুটি চেলে নম্বর গুনলেন। আবার সেই চিন্তাষিত মুখ, আবার উদ্বেগ। এবারেও সাধুর মুখে সেই প্রসন্ন হাসি। তিনি বললেন—ফিক্র মত করে বেটা, তুমাহারা ভাইয়াকো বদলি ন হোগা।
সাধু সম্পর্কে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম—উনি কি তিব্বতী সাধু ছিলেন?
