আরে, তোমার চেহারা যে অনেক পাল্টে গেছে। বহু বছর আগে তোমাকে দেখেছিলাম পাতলা চেহারা, এখন মোটা হয়ে গেছ।
এ কথার পর বনফুল সম্বন্ধে আমার ভয় কেটে গেল, ধারণাও বদলে গেল। বিছানায় শুয়েই তিনি আলাপ জুড়ে দিলেন, যেন কত কালের . চেনা মানুষ আমি। বনফুলের বিশাল দেহের দরাজ হৃদয়ের অর্গল একে একে খুলে যেতে লাগল।
হঠাৎ আলাপ থামিয়ে ব্যস্ত-সমস্ত হয়ে গেলেন-এই দ্যাখো, কথায় কথায় আসল কথাই ভুলে গেছি। কী খাবে বল?
আমি প্রতিবাদ জানিয়ে বললাম-অসময়ে খাওয়ায় আমার উৎসাহ নেই। সুতরাং ওর জন্য ব্যস্ত হবেন না।
অবাক হয়ে বললেন—সে কি হে, সংবাদ পত্রের আপিসে তো শুনেছি এনি টাইম ইজ টা টাইম। এক পেয়ালা চা তো অন্তত খাবে।
সুবলবাবু বললেন—ও ব্যাপারে আমরা কখনও না বলি না। তবে তা খাবার আগে যে জন্য আপনার কাছে এসেছি, সেটা বলে নেওয়াই ভাল।
বনফুল বললেন–তাই তো হে, কিছু একটা মতলব নিয়ে দুজনে আমার কাছে এসেছ, সেটা তো আগেই আমার বোঝা উচিত ছিল।
তা মতলব টা কী শুনি?
আনন্দ পুরস্কারের বিষয়টা সবিস্তারে বুঝিয়ে বলার পর তাকে অনুরোধ জানিয়ে বললাম—এই পুরস্কার আপনাকে গ্রহণ করতে হবে এবং বৈশাখের প্রথম সপ্তাহে সাহিত্যিকদের এক বিশেষ সমাবেশে উপস্থিত হয়ে পুরস্কার গ্রহণ করতে হবে।
কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে কী যেন ভাবলেন। আমি সশংকিত চিত্তে উৎকণ্ঠিত হয়ে আছি, এই বুঝি রক্তের চাপ বাড়ল। আমার সমস্ত উৎকণ্ঠা দূর করে দিয়ে বললেন–
এ-পুরস্কার আমি গ্রহণ না করে কি পারি? আমি তো ভাগলপুর চলে যাচ্ছি। কখন আসতে হবে আমাকে চিঠি দিয়ে জানিয়ে, আমি নিশ্চয় আসব।
একথার পর সুবলবাবু বললেন, যাক, একটা দুর্ভাবনা ঘুচল। তাহলে এবার শুধু চা নয়, মিষ্টিও চাই।
বনফুল সহাস্যে বললেন–মিষ্টিমুখ না করিয়ে কি তোমাদের ছেড়ে দেব? যাও, তোমার বউদির কাছে খবরটা দাও আর তোমার মিষ্টির আবেদনটাও পেশ কর।
সুবলবাবু পাশের ঘরে চলে যেতেই বনফুল আমাকে বললেন–জানো, আনন্দবাজারের সুরেশবাবু, ছিলেন সাহিত্যিকদের পরম হিতাকাঙ্খী বন্ধু। শুধু আমার জীবনেরই একটি ছোট্ট ঘটনা শুনলেই বুঝতে পারবে যে সাহিত্যিকদের তিনি কতখানি ভালবাসতেন। আমার বড় মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে। ব্যাঙ্কে যা-কিছু সঞ্চয় ছিল তা প্রায় নিঃশেষ করেই বিয়ের বাজার করেছি। তখন এক সিনেমা কোম্পানী আমার একটা গল্প নিয়েছিল, কথা ছিল আমার মেয়ের বিবাহের আগেই দু-হাজার টাকা দিয়ে যাবে। তাদের কথার উপর নির্ভর করে আমি মেয়ের জন্যে একটা নেকূলে-এর অর্ডার দিয়ে নিশ্চিন্ত আছি, নির্দিষ্ট দিনে টাকাটা পেলেই নেকলেসটা নিয়ে আসব। কিন্তু এমনই দুর্ভাগ্য, যে-দিন দেবার কথা সেদিন তারা এসে অত্যন্ত কাতরভাবে জানালে যে টাকাটা যোগাড় করে উঠতে পারে নি। আরও কিছু দিন দেরি হবে। আমার তখন অবস্থাটা বোঝ। চার দিন বাদে মেয়ের বিয়ে, নেকলেস-এর অর্ডার দিয়ে বসে আছি, সেদিনই কথা ছিল নিয়ে আসার। আমি মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লাম। সে তো আজকের কথা নয়, বহু বছর আগের ঘটনা। তখন বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে এমন কেউ ছিল না, যে একসঙ্গে দু-হাজার টাকা বার করে দিতে পারে। তখন কলকাতায় সজনীই ছিল আমার একমাত্র অন্তরঙ্গ বন্ধু যাকে আমার সুখদুঃখের কথা সবসময় অকপটেই বলে থাকি। সুবলও তা জানে। সজনী সব শুনে বললে-টাকার জন্যে মেয়েকে বিয়েতে নেকলেস দিতে পারবে না, সে কি হতে পারে? আমাদের সুরেশদা থাকতে তুমি ভাবছ কেন। তুমি নিজে সুরেশদার সঙ্গে দেখা করে সব বল, ব্যবস্থা একটা কিছু হবেই।
সুরেশবাবু তথন থাকতেন দেশবন্ধু পার্কের উত্তরে। সজনীর কথামত পরদিন সকালেই চলে গেলাম ওঁর কাছে।
সব শুনে সুরেশবাবু বললেন–আপনার কত টাকা প্রয়োজন?
আমি বললাম প্রয়োজন আমার দু হাজার টাকার। আপনি যদি আমাকে এক হাজার অত দিতে পারেন বাকি এক হাজার আমি আমার বইয়ের প্রকাশকদের কাছে থেকে চেয়েচিন্তে যোগাড় করে নিতে পারব।
সুরেশবাবু বললেন–কী দরকার আপনার টাকার জন্য আবার এখানে ওখানে ঘোরাঘুরি করার। দু-হাজার টাকায় আপনার হবে তত? প্রয়োজন হলে আরও কিছু নিয়ে রাখুন। মেয়ের বিয়ে, কখন কি দরকার হয়।
মানুষটির প্রতি কৃতজ্ঞতায় মন ভরে গেল। দু-হাজার টাকাই আমার প্রয়োজন ছিল। তিনি আমাকে একটু বসতে বলে বাড়ির ভিতরে চলে গেলেন, কোথায় কার কাছে লোক পাঠিয়ে আধ ঘণ্টার মধ্যেই ক্যাশ দু-হাজার টাকা এনে আমার হাতে দিলেন। টাকাটা দিলেন, কিন্তু কোনও রসিদ চাইলেন না। আমার মনে খটকা লাগল। টাকাটা যে আমি ধার হিসেবে নিয়েছি দান হিসেবে নয়, সেটা তো আমার জানিয়ে দেওয়া দরকার। আমি তাই ওকে বললাম—টাকাটার বদলে একটা হাওনোট আপনাকে লিখে দিই।
এ-কথার উত্তরে সুরেশবাবু কি বললেন জানো? বললেন–বলাইবাবু, আপনার হাতই আমার হাণ্ডনোট। যে-দিন খুশি লিখে শোধ দেবেন।
কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন বনফুল। হয়তো সেদিনের সেই ঘটনা স্মৃতির সমোবরের স্তব্ধতাকে আন্দোলিত করেছে, আর্দ্র কণ্ঠে তিনি আবার বললেন–সেদিনের ঘটনার পর আমি মনে মনে স্থির করে ফেললাম যে এমন একটা নতুন বিষয় নিয়ে লিখতে হবে যা বাংলা সাহিত্যে এর আগে আর কেউ লেখে নি এবং সেটাই হবে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ-সাহিত্য কীতি। প্রস্তুতির জন্যে পড়াশুনোয় ডুবে রইলাম, বই কিনলাম প্রচুর। তারপর লিখলাম স্থাবর উপন্যাস, যা দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে বেরিয়েছিল। তোমার তো মনে থাকবার কথা।
