সেদিন যখন সবাই কাজের ভারটা আমার উপর চাপিয়ে দিলেন, আমি মনে-মনে প্রমাদ গনলাম। প্রথমত বনফুলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশার সুযোগ কোন দিনই আমি পাই নি। বেশীরভাগ সময়েই তিনি থাকেন কলকাতার বাইরে ভাগলপুরে। মাঝে-মাঝে দু-চার দিনের জন্য কলকাতায় যখন আসেন তখন তার কাছে যাবার পাঁয়তারা কষতে কষতেই শুনি বনফুল ভাগলপুরে ফিরে গেছেন। তাছাড়া বিখ্যাত সাহিত্যিকদের কাছে যাওয়ার ব্যাপারে আমার নিজেরই একটা সঙ্কোচ আছে, ভয়মিশ্রিত সঙ্কোচ। একে নামী ও মানী সাহিত্যিক, তদুপরি বয়সে অনেক বড়। কাছে না হয় গেলাম। কিন্তু আমার নিতান্ত নিম্নমধ্যবিত্ত বুদ্ধি আর বিদ্যা নিয়ে কী কথা বলব? কাজ তত করি যজ্ঞিবাড়ির পাচক ঠাকুরের। ভিয়েন চড়ানো আর পরিবেশন করা। দু-চার লাইন লিখবার ক্ষমতাও যদি থাকত সেই সুবাদে সাহিত্যিক-তকমা এঁটে লেখকমহলে নিশ্চিন্ত হয়ে যোরাফেরা করতে পারতাম। কিন্তু এখন উপায়? বনফুলের কাছে একলা যেতে ভরসা হয় না, যদি চিনতে না পারেন? শুনেছি কাগজের লোক আর পুস্তক প্রকাশকদের উপর নাকি ভীষণ খাপ্পা। কাশীর দশাশ্বমেধ ঘাটে গেলেই পাণ্ডারা যেমন নিমেষে প্রাণটা কণ্ঠাগত করে তোলে-কলকাতায় এলেই কাগজের লোকরা লেখার জন্য মাছির মত লেগে থাকে। আজকাল তাদের দেখলেই নাকি ব্লাডপ্রেশার চড়চড় করে বেড়ে যায়, মুখে যাচ্ছেতাই করেন। এহেন মেজাজী মানুষটার কাছে একা-একা যাই কোন ভরসায়! অগত্যা উপেন গঙ্গোপাধ্যায়ের বৈবাহিক সুবল বন্দ্যোপাধ্যায়ের শরণাপন্ন হলাম। সুবলবাবু সম্প্রতি আনন্দবাজার পত্রিকায় কাজে যোগ দিয়েছেন। দীর্ঘকাল শনিবারের চিঠি পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সেই কারণে বহু প্রবীণ সহিত্যিকের সঙ্গেই ওঁর অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। আমার সঙ্গেও সুবলবাবুর পরিচয় দীর্ঘ দিনের, উপস্থিত সে পরিচয় অনুজের প্রতি জ্যেষ্ঠের স্নেহশীল সহৃদয়তার পর্যবসিত। আমার সঙ্গে সুবলবাবুর চরিত্রগত কিছু মিল আছে, আমরা উভয়েই পানদোষে দুষ্ট। আমাদের অফিসের উল্টোদিকে ছোট্ট একটা পানের দোকান আছে। অফিসের কাজের ফাঁকে ফাঁকে দোকানে গিয়ে জর্দা দিয়ে পান খাই। আমাকে দূর থেকে দেখলেই পানওয়ালা তরিবত করে আগে ভাগেই পান সেজে রাখে, এটা এখন ওর চিরাচরিত প্রথায় দাঁড়িয়ে গেছে।
পানের দোকানে আমাকে দেখলেই সুবলবাবুরও পান খাবার নেশা চাগিয়ে ওঠে। কাজে-অকাজে সবসময় সুবলবাবু একটু ব্যস্তবাগীশ লোক। পানের দোকানে পান খেতে এলেও ব্যস্ততার অন্ত নেই, যেন এখনই ট্রেন ধরতে হবে।
একদিন দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, সুবলবাবু হঠাৎ গাড়ি চাপা পড়তে পড়তে বেঁচে গিয়ে রাস্তা পার হয়ে আমার কাছে এসেই বললেনদোকানের জর্দা খেয়ো না, বেনারস থেকে তিন হেঁচকির পাতি জর্দা এনেছি, খেয়ে দেখ।
তিন হেঁচকির জর্দা? সে আবার কি! পান-জর্দা বহুকাল ধরেই খেয়ে আসছি কিন্তু এরকম একটা উদ্ভট নাম তো কোনদিন শুনি নি।
আমাকে একটু বিস্মিত হতে দেখে সুবলবাবু পকেট থেকে একটা কৌটা বার করে বললেন।–বেনারসে পাঁচ হেঁচকির জর্দাও আছে। সে-জর্দার পিক গিললে মিনিটে পাঁচবার হেঁচকি ওঠে। এটা অনেক মাইল্ড, মিনিটে মাত্র তিন বার হেঁচকি উঠবে। খেয়েই দ্যাখ না।
ভয়ে ভয়ে আমি বললাম-খেতে রাজি আছি কিন্তু হেঁচকি তুলতে রাজি নই।
এ কথার পর সুবলবাবু যেন একটু চটেই গেলেন। বিরক্তির সঙ্গে বললেন–তোমার কথা শুনে কি মনে হয় জানো? পৃথিবীতে এক জাতের মানুষ আছে যারা মদ খায়, নেশা করে না। প্রেম করে, বিয়ে করে না। ঘোড়দৌড়ের মাঠে যায়, জুয়া খেলে না। জেনে রেখো, এরা সাংঘাতিক মানুষ। কিন্তু তার চেয়েও সাংঘাতিক হচ্ছে যারা জর্দা খায়, হেঁচকি তোলে না।
মানব চরিত্র সম্পর্কে সুবলবাবুর অভিজ্ঞতা আমার চেয়ে অনেক বেশী, কারণ উনি অনেক ঘাটের জল-খাওয়া লোক। তাই ওঁর কথায় প্রতিবাদ না করে বললাম-আমাকে একটা বিপদ থেকে উদ্ধার করে দিতে হবে।
কী বিপদ?
কাল দুপুরে বনফুলের কাছে আমাকে যেতে হবে, সঙ্গে আপনার থাকা চাই। আমাকে তো চেনেন না। শেষকালে যদি তাড়িয়ে দেন।
অভয় দিয়ে সুবলবাবু বললেন–ঠিক আছে, যাব তোমার সঙ্গে। বনফুল আমার বহুকালের পরিচিত অন্তরঙ্গ বন্ধু। আমি সঙ্গে যখন আছি তোমার কাজ হাসিল হবেই।
পরদিন দুপুরে বেলা তিনটা নাগাদ সুবলবাবুকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হলাম জোড়াসাঁকোর দক্ষিণে সি আই টি বিল্ডিং-এ। বনফুল এখানে তার বড় ছেলের ফ্ল্যাটে এসে উঠেছেন। চারতলার সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে দরজার কড়া নাড়তেই একটি কিশোরী কন্যা এসে দরজা খুলে দিল।
সুবলবাবু বললেন–কী রে, তোর বাবা বাড়ি আছেন? মেয়েটি বললে—বাবা আছেন কিন্তু ঘুমুচ্ছেন।
এ-কথার পর আমি সত্যিই ঘাবড়ে গেলাম। অসময়ে এসে ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিলে যদি ওঁর মেজাজ বিগড়ে যায়।
সুবলবাবু সে-কথায় কিছুমাত্র গুরুত্ব না দিয়ে চৌকাট পার হয়েই ভিতরে চুকে বললেন–ঘুমোচ্ছে তো কী হয়েছে। ডেকে তোেল, বল সুবল কাকা এসেছে।
ডেকে তুলতে হল না। গলার আওয়াজ শুনেই পাশের ঘর থেকে উদাত্ত কণ্ঠের আহ্বান এল
কে সুবল? এস এস, আমি জেগেই ঘুমোচ্ছি।
এই ছোট্ট কথাটির মধ্যে অন্তরঙ্গতার সুর যেন মিশে ছিল। সুবলবাবুর পিছনে আমিও ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলাম।
দক্ষিণের জানলার ধারে একটি খাটে বিশাল বপু বনফুল খালি গায়ে শুয়ে আছেন, পরনে লুঙ্গি। বলবায়ু পরিচয় করিয়ে দেবার আগেই আমি প্রণাম করে নিজের নাম বললাম। উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন বনফুল। আমার হাত ধরে বিছানার পাশে বসিয়ে বললেন–
