উপেন গাঙ্গুলীর সঙ্গে। তিনি এখনও আসেন নি। আপনার যা দরকার কোণের ভদ্রলোকটিকে বলে গেলেই চলবে। এক নিশ্বাসে কথাগুলি আগন্তুকের উপর ছুড়ে মেরে বক্তা আবার পূর্ব আলোচনার সূত্রে ফিরে গিয়ে বললেন–যাই বলুন অমলবাবু, ডি. এইচ. লরেন্সকে নিয়ে একদল ছোকরা-লেখক যে-রকম মাতামাতি করছে
এমন সময় উপেনদা এসে হাজির। দরজার কাছে যে-লোকটি এতক্ষণ ফিরে যাব-কি-যাব না ইতস্তত করছিল তাকে প্রায় জড়িয়ে ধরে ঘরে টেনে এনে বললেন—
কী খবর বিভূতিবাবু। কবে কলকাতায় এলেন? ভাগলপুরের সব খবর ভাল তো? বসুন, বসুন।
সোফায় সমাসীন যে-ভদ্রলোক তাকে এজেন্ট ঠাউরেছিলেন তার পাশেই জায়গা ছিল বসবার। বিভূতিবাবু বসলেন না। দাঁড়িয়ে থেকেই বললেন–আজই সকালে কলকাতায় এসে পৌঁছেছি, রাত্রেই গ্রামে চলে যাব। হাতে একটু সময় ছিল, তাই আপনার সঙ্গে দেখা করে গেলাম।
তা এসে ভালই করেছেন। আপনাকে সুখবরটা দিই, আগামী সংখ্যা থেকেই আপনার উপন্যাস বেরোচ্ছ।
এতক্ষণ যারা তর্কে ঘর সরগরম করে রেখেছিলেন তারা এবার একেবারে চুপ। বার বার তারা অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছেন বিভূতিবাবুর পা থেকে মাথা, মাথা থেকে পা।
বিভূতিবাবু আর মুহূর্তমাত্র না বাড়িয়ে প্রায় ছুটে বেরিয়ে এলেন রাস্তায়। সেদিনের কলকাতা শহরের সন্ধ্যার আনন্দ তিনি কোনদিন ভোলেন নি। পরবর্তী জীবনে প্রায়ই আমাদের বলতেন—দ্যাখ, কলকাতা শহর আমার কোনদিনই ভাল লাগে না। গ্রামে আর অরণ্যেই আমি শান্তি পাই। তবে হ্যাঁ, সেদিন সন্ধ্যায় বিচিত্রা অফিস থেকে রাস্তায় বেরিয়ে কলকাতা শহরটাকেও আমি ভালবেসেছিলাম।
একটানা গল্প বলে আমাদের বৈঠকের গাল্পিক বন্ধু থামলেন। পথের পাঁচালীর প্রকাশের কাহিনী তন্ময় হয়ে আমরা শুনছিলাম আর ভাবছিলাম বাংলা দেশের দুর্ভাগ্য বিচিত্রা-র মত পত্রিকাও উঠে গেল, উপেনদার মত সম্পাদকও আমরা আর পেলাম না। আর বিভূতি বন্দ্যোপাধ্যায়? বাংলাসাহিত্যে বিভূতিভূষণের মত মানবদরদী ও প্রকৃতিপ্রেমী কথাসাহিত্যিক কি আর দেখা দেবে?
গাল্পিক সাহিত্যিক ইত্যবসরে দম ভরে আরেক টিপ নস্যি নিয়ে বললেন–পরের মাস থেকেই বিচিত্রায় পথের পাঁচালী বের হতে লাগল। সাহিত্যরসিক মহলে সাড়া পড়ে গেল—কে এই লেখক?
হঠাৎ একদিন শনিবারের চিঠির সম্পাদক সজনীকান্ত দাস খোঁজখবর নিয়ে বিভূতিবাবুর কাছে এসে হাজির। নব্বই-টা টাকা তার হাতে গুতে দিয়ে বললেন–পথের পাঁচালী বই আকারে আমি ছাপব।
অবাক হয়ে গেলেন বিভূতিবাবু। ন-ব্ব-ই-টা-কা!! এ-যে কল্পনাতীত।
এইটুকু বলেই গাল্পিক বন্ধু চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন। আমরা অধৈর্য হয়ে বললাম—সে কী! উঠে পড়লেন যে? পথের পাঁচালীর কাহিনী তো শুনলাম। কিন্তু মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘটনাটা তো বললেন না?
দরজার দিকে চলতে চলতে গাল্পিক বন্ধু বললেন–রাত কত হল খেয়াল আছে? অতসী মামী গল্প প্রকাশের ঘটনাটা আরেক দিন হবে।
এতক্ষণে আমাদের হুঁশ হল। রাত সাড়ে নটা কখন বেজে গেছে টেরও পাই নি।
১৩. এতদিন ধরে আমাদের বৈঠকে
এতদিন ধরে আমাদের বৈঠকের পুরনো কাহিনীই আপনাদের নিয়ে এসেছি, এবার বলি হালফিলের একটা ঘটনা।
আনন্দ পুরস্কার কমিটি স্থির করলেন অনিন্দবাজার পত্রিকার তরফ থেকে সুরেশচন্দ্র মজুমদার স্মৃতি পুরস্কার দেওয়া হবে স্বৰ্গত উপেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলীকে, যার কথা ইতিপূর্বে আপনাদের শুনিয়েছি। দেশ পত্রিকার তরফ থেকে প্রফুল্ল কুমার সরকার স্মৃতি পুরস্কার দেওয়া হবে বনফুলকে, তার সাহিত্যকর্মে সামগ্রিক দানের কথা বিবেচনা করেই।
আনন্দ পুরস্কার কমিটির একজন প্রধান সদস্য বললেন–বনফুলকে আনন্দ পুরস্কার দেবার সিদ্ধান্ত করে সমীচীন কাজই হয়েছে এবং এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশী খুশী হয়েছি আমি। কিন্তু কিছুকাল যাবৎ লক্ষ্য করেছি সাহিত্যিকদের সরকারী পুরস্কার দেওয়াটাকে বনফুল তীব্র ভাষায় তিরস্কার করে আসছেন নানা সভা সমিতির বক্তৃতায়। সুতরাং আনন্দ পুরস্কারের এই সিদ্ধান্ত পত্রিকায় প্রকাশের আগে তার একটা মৌখিক অনুমতি নিয়ে রাখা উচিত। যদি প্রত্যাখান করেন?
অপর একজন সদস্য এ-কথার মৃদু প্রতিবাদ করে বললেন—আমাদের এই পুরস্কার তো সরকারী পুরস্কার নয়, নিতান্তই বেসরকারী। তা ছাড়া এই পত্রিকার তিনি একজন নিয়মিত লেখক, পত্রিকা প্রকাশের প্রথম আমল থেকে আজও লিখে আসছেন। তা ছাড়া যার স্মৃতিবিজড়িত এই পুরস্কার তার সঙ্গেও বনফুলের ছিল দীর্ঘদিনের প্রীতির সম্পর্ক। আমাদের তো মনে হয় না এ-পুরস্কার তিনি প্রত্যাখান করবেন।
প্রধান সদস্য বললেন–সবই তো বুঝলাম। তবুকথায় বলে সাবধানের মার নাই। তার সম্মতিটুকু জেনে নিয়ে ঘোষণা করলে দোষ কি?
অন্যান্য সদস্যরা অত্যন্ত ভাবিত চিত্তে মাথা নেড়ে সায় দিলেন সেটা চিন্তার বিষয়। সম্মতি নিলে দোষটা কি?
এক বাক্যে যখন স্থির হল সম্মতি নিয়েই ঘোষণা করা উচিত, তখন আমার উপর ভার পড়ল পরদিনই বনফুলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তার অনুমোদন আদায় করে আনা চাই। সম্প্রতি বনফুল কলকাতায় তার ছেলের বাড়িতে আছেন, দু-একদিনের মধ্যেই ভাগলপুর চলে যাবেন।
বনফুলের সঙ্গে পত্ৰযোগে আমার পরিচয় বিশ বছরের কিন্তু সাক্ষাৎ পরিচয় ছিল না বললেই চলে। বর্মণ-স্ট্রীটের অফিসে থাকতে যখন স্থবির উপন্যাস ধারাবাহিক প্রকাশের কথা পাকাপাকি স্থির হলো তখন পাণ্ডুলিপি নিয়ে সেঅফিসে একবার এসেছিলেন, দু-চার মিনিটের মামুলী কথাবার্তার পর চলে গেলেন। এর পর দীর্ঘ বছর পার হয়ে গেছে। চিঠিপত্রেই আদান প্রদান চলে চাক্ষুষ সাক্ষাৎ আর হয় নি।
