যথারীতি আড্ডা জমে উঠল। বিভূতিবাবু নীরব শ্রোতা হয়ে যেমন বসে থাকেন তেমনি বসে রইলেন। বৈঠক শেষে লণ্ঠন জ্বালিয়ে ধীর পদক্ষেপে ফিরে গেলেন ওঁর ডেরায়।
দিন আসে দিন যায়। উপেনদা সেই পাণ্ডুলিপির কথা কিছুই বলেন না, বিভূতিবাবুও আর জিজ্ঞাসা করেন না। এইভাবে মাস দুই কেটে যাবার পর বৈঠক ভাঙবার মুখে উপেনদা বিভূতিবাবুকে বললেন–আপনি চলে যাবেন না, কথা আছে।
বিভূতিবাবুর মন সংশয় দোলায় দুলে উঠল। কী জানি কি বলবেন! আসরের সবাই একে একে প্রস্থান করলে উপেনদা বিভূতিবাবুকে তাঁর টেবিলের উল্টোদিকের চেয়ারে এসে বসতে বললেন। কাছে এসে বসতেই ড্রয়ার থেকে খাতাগুলি বার করে বললেন–আমি আগাগোড়া পড়েছি। আপনার হবে। হবে কেন? হয়েছে।
আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল বিভূতিবাবুর মুখ। সু দ্বিধাভরে জিজ্ঞাসা করলেন-কিন্তু অঙ্ক?
-অঙ্কে বেশ কিছু গরমিল অবশ্য আছে। তবে তাতে কিছু যায়আসে না। ওটা আমি একটু কাটছাট করে ঠিক করে দেব। তাছাড়া সব লেখা কি অঙ্ক দিয়ে বিচার করলে চলে? না বিচার করা উচিত? ব্যতিক্রমও তো ঘটতে পারে। আচ্ছা, উপন্যাসটা আপনি কোথাও প্রকাশের কথা চিন্তা করেছেন কি?
বিভূতিবাবু কিছুক্ষণ মাটির দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলেন। সেই ভাবেই একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন–কলকাতায় থাকতেই প্রবাসী পত্রিকায় দিয়েছিলাম। এখানে চাকরি নিয়ে চলে আসবার সময় খোঁজ নিতে গিয়ে ফেরত পেলাম।
গুম্ হয়ে গেলেন উপেনদা। মজলিশী মেজাজের হাসিখুশী মানুষটা এক মুহূর্তে পাথরের মত স্তব্ধ হয়ে গেলেন। ঘরের আবহাওয়াও যেন ভারী হয়ে উঠল। কিছুক্ষণ নীরবতার পর উপেনদা গভীর গলায় বললেন–আপনি ভাববেন না। এই উপন্যাস প্রকাশের ব্যবস্থা আমিই করব। ধরে নিন, আপনি আপনার একমাত্র সন্তানকে আমার হাতে সমর্পণ করে গেলেন। এর ভার আজ থেকে আমিই নিলাম। আপনি নিশ্চিন্ত হয়ে বাড়ি যান।
কৃতজ্ঞতায় বিভূতিবাবুর মন ভরে গেল। বিদায় নেবার সময় ধুলোততি কেঁাচার খুট দিয়ে চোখের কোণ মুছে আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন–আমার এই লেখা প্রকাশ হোক আর নাই থোক, মনে আর কোন খেদ নেই।
আরও মাস দুই পার হবার পর উপেনদা একদিন বিভূতিবাবুকে নিভৃতে ডেকে বললেন–আমি ভাগলপুর ছেড়ে আবার কলকাতায় চলে যাচ্ছি। একথা আজ্ঞার আর কাউকে বলবেন না, বাগড়া দেবে। বিভূতিবাবু অবাক হয়ে উপেনদার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
উপেনদা হেসে বললেন–অবাক হচ্ছেন তো? তবে শুনুন। কলকাতায় গিয়ে আমি একটা মাসিক পত্রিকা বার করছি।
আপনি? সে তো শুনেছি অনেক টাকার ব্যাপার।
টাকার ভাবনা আমার জামাইয়ের। বুঝেছেন, আমার জামাইয়ের কোলিয়ারী-টোলিয়ারী আছে। অনেক টাকা। ভজিয়ে-ভাজিয়ে তো এ-লাইনে নামতে রাজি করিয়েছি। এখন রবীন্দ্রনাথ আর শরৎচন্দ্রকে একসঙ্গে নামাতে পারলেই কেল্লা ফতে। আমি কথা দিয়ে যাচ্ছি, আপনার উপন্যাস আমিই ছাপব।
সত্যি সত্যিই উপেনদা ভাগলপুরের পাট গুটিয়ে চলে গেলেন কলকাতায়। তার কয়েক মাস পরেই মহা সমারোহে প্রকাশিত হল বিচিত্রা। প্রকাশ বললে ভুল হবে, বলা উচিত আবির্ভাব। প্রথম সংখ্যা যেদিন বেরলল, তার আগের রাত্রে টালা-টু-টালিগঞ্জ-কলকাতার দেয়াল বিচিত্রার পোস্টারে ছেয়ে গেল। পত্রিকার কর্মকর্তারা ট্যাক্সি করে অধিক রাত পর্যন্ত সারা কলকাতা ঘুরে দেখলেন পোস্টার কেমন দেখতে লাগছে। সুতরাং খরচের বহরটা এই থেকেই অনুমান করে নিন। যাকে বলে এলাহি কারবার, ঢালোয়া ব্যাপার। সে ইতিহাস কারও অজানা নয়।
ওদিকে ভাগলপুরের নির্জনে বসে বিভূতিবাবু আশা নিয়ে মাস গুনছেন, উপন্যাস আর বেয়োয় না। চিঠি লেখেন না, পাছে উপেনদা বিরক্ত হন। কিন্তু ধৈর্যেরও তো একটা সীমা আছে।
কী একটা উপলক্ষ্যে বেশ কিছুদিনের ছুটি থাকায় বিভূতিবাবু কলকাতা যাওয়া স্থির করলেন।
ফড়িয়াপুকুর লেন-এর দোতালার একটি ঘরে জোর আড্ডা বসেছে। সোফাসেট-টিপয় সজ্জিত প্রকোষ্ঠে জন পাঁচেক সুটেড-বুটেড, ভদ্রলোক চায়ের পেয়ালায় ঝড় তুলে তর্ক করে চলেছেন সাহিত্যে শ্লীলতা আর অশ্লীলতা নিয়ে। সকলের মুখেই সিগারেট জ্বলছে, ধোঁয়ায় ঘর অন্ধকার। সেন্টার টেবিলে দামী ব্র্যাণ্ডের সিগারেটের টিন, চায়ের কাপ ইতস্তত ছড়ানো। ঘরের এক কোণে ধুতি-পাঞ্জাবি পরা একটি যুবক টেবিলের উপর একরাশ প্রুফ নিয়ে নিবিষ্ট চিত্তে কাজ করে চলেছেন, বিতর্কে বিগতস্পৃহ। ইনিই বেদের লেখক অচিন্ত্যকুমার।
এমন সময় দরজার সামনে এক ভদ্রলোক উঁকি মারতেই পাচ-জোড়া চোখ তার উপর পড়ল। এত বাঙালী সাহেব-সুবো দেখে আগন্তুক খানিকটা ঘাবড়ে গিয়ে দরজার ওপারেই দাঁড়িয়ে রইলেন, ঘরে আর ঢুকলেন না। আধময়লা ধুতি, তাও প্রায় হাঁটুর কাছাকাছি। জুতোর চামড়া ব্ল্যাক না ব্রাউন কলকাতার পথের ধুলোয় চেনবার উপায় নেই। গায়ে পাঞ্জাবি, তার দু-চার জায়গায় রিপুকর্মের চিহ্ন প্রকট। হাতে রয়েছে চটের থলি।
ঘর থেকে কে-একজন তাচ্ছিল্যের ভাব দেখিয়ে বললেন–
কী চান এখানে? আপনি কি এজেন্ট? কোথাকার এজেন্ট? আপনাকে কিন্তু দশ কপির বেশি পত্রিকা দিতে পারব না। ভয়ানক ডিমাণ্ড। যান্ ওই কোণের ভদ্রলোকের কাছে টাকা জমা দিন।
আমি এজেন্ট নই।।
তবে কি লেখক? কবিতা লিখেছেন? নাম ঠিকানা সমেত ওই কোণার ভদ্রলোকের কাছে জমা দিয়ে যান।
আমি লেখকও নই, কবিতা দিতেও আসি নি। আমি এসেছি পত্রিকার সম্পাদকের সঙ্গে দেখা করতে।
