বিস্মিত হয়ে বিভূতিবাবু বললেন–শরৎবাবু কবিতা লিখেছেন? কই এ কথা তো আগে কখনও শুনিনি।
-কোত্থেকে শুনবেন। এ-কথা আমি ছাড়া আর জানবেই বা কে। আজও শরতের লেখা একটা কবিতার প্রথম লাইন মনে আছে—ফুলবনে লেগেছে আগুন। ভাগলপুরের এই বাড়ি থেকেই আমাদের কৈলোর জীবনে একটা হাতে লেখা পত্রিকা বার করতাম। সেই পত্রিকায় এই কবিতাটি ও লিখেছিল। তাই বলছিলাম দু-একটা ছোট খাটো লেখা এ-দিক ও-দিকে ছেপে নামটা একটু চালু করে নিয়ে উপন্যাসে নামা উচিত ছিল না কি?
কৈফিয়ত দেবার সুরে বিভূতিবাবু বললেন–অনেকদিন ধরেই ভিতরে ভিতরে একটা তাগিদ অনুভব করছিলাম আমার দেশের কথা, আমার গ্রামের কথা উপন্যাস আকারে লিখে যাব। গ্রামের ইস্কুলে মাস্টারি করতাম, অবসর ছিল, তাই লিখে ফেলেছি।
তা বেশ করেছেন। একা একা পড়ে আছেন, সময় তো কাটাতে হবে। তবে উপন্যাস লিখলেই তো হল না, কতগুলো নিয়ম-কানুন আছে। সেগুলো বজায় রেখেছেন কি? কত বড় উপন্যাস লিখেছেন?
বিভূতিবাবু বললেন–তা একটু বড়ই হবে, আমার হাতের লেখা বেশ ছোটই। তারই চারশ পাতা হয়েছে।
তা তো হবেই। একা-একা যখন আছেন তখন পাতার পর পাতা, দিস্তার পর দিস্তা, রিমের পর রিম লিখে যাওয়া ছাড়া আর কাজটা কি। আপনার উপন্যাসে পরিচ্ছেদ আছে তো?
তা আছে।
অঙ্ক মিলিয়েছেন?
অঙ্ক? উপন্যাস লেখার সঙ্গে অঙ্কের কি সম্পর্ক ঠিক বুঝতে পারলাম না।
অঙ্ক, মানে মথমেটিক। প্রথম পরিচ্ছেদে ঠিক যতগুলি শব্দ আছে, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে ঠিক ততগুলিই শব্দ থাকবে। এইভাবে তৃতীয়, চতুর্থ পঞ্চম। গুনে দেখেছেন?
আজ্ঞে না, গুনে তো দেখি নি।
আমি এখানে আছি, আপনি আমার এখানে আজ ছ-মাসের উপর আসা-যাওয়া করছেন। একবার মুখ ফুটে জানালেন না? এখন সবই পণ্ডশ্রম। কবিতার যেমন একটা ছন্দ আছে, যতি আছে, মাত্রা আছে, উপন্যাসেরও তাই। একটা পরিচ্ছেদের সঙ্গে আর একটা পরিচ্ছেদের মাত্রা ঠিক রাখা চাই। তা না রাখলে উপন্যাস বেমানান হয়ে পড়ে। বেসামাল হয়ে যায়।
হতাশ হয়ে বিভূতিবাবু বললেন—তাহলে উপায়?
–উপায় একটা আছে। তার আগে আজকেই বাড়ি গিয়ে কোন পরিচ্ছেদে কত শব্দ আছে গুনে ফেলুন। তারপর ছাঁটকাট করেই হোক অথবা বাড়িয়েই থোক এক পরিচ্ছেদের সঙ্গে আরেক পরিচ্ছেদের সামঞ্জস্য রাখতে হবে। একেবারে নিক্তির ওজনের ব্যাপার কিনা।
এ-কথার পর বিভূতিবাবু বেশ দমে গেলেন। এতদিন ধরে এত পরিশ্রম করে অন্তরের সমস্ত বেদনা ঢেলে যে-উপন্যাস লিখলেন—শুধু অঙ্কের ভুলে তা ব্যর্থ হয়ে যাবে?
উপেনদা ঝানু ঔপন্যাসিক। মানবচরিত্র নিয়ে তাঁর কারবার। বিভূতিবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি বুঝে ফেললেন ওর মানসিক অবস্থা। উৎসাহ দিয়ে বললেন–
এতে মুষড়ে পড়বার কিছু নেই। যতক্ষণ আমি আছি ভাই, তোমার লেখার লাগি কোন ভয় নাই। আপনি শুধু পরিচ্ছেদগুলির শব্দ আজ গুনে ফেলুন, আগামী কাল একটু বেলা-বেলি চলে আসবেন আর অন্যান্য বন্ধুরা হাজির হবার আগেই। তবে হ্যাঁ, উপন্যাসের পাণ্ডুলিপিটা সঙ্গে আনা চাই। আমার একবার দেখা দরকার।
এই আশ্বাসবাণীর পর বিভূতিবাবু যেন ভরাডুবির মুখে তক্তা খুজে পেলেন। এদিকে কথায় কথায় রাত্রি ঘনিয়ে এসেছে। মেঘান্ধকার রাত্রে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যেতেও হবে বহুদুর। উপেনদার কাছে বিদায় চেয়ে পকেট থেকে দেশলাই বার করে লণ্ঠনটা জ্বালালেন, তারপর ছাতা ও লাঠি বগলদাবা করে ঘর থেকে বারান্দা, বারান্দা থেকে পথে নেমে পড়লেন। রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে দেবার সময় উপেনদা বললেন–
কাল আসা চাই কিন্তু, লেখাটাও আনতে ভুলবেন না।
ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বিভূতিবাবু বিদায় নিলেন। বিভূতিবাবুর ছায়ামূর্তি আস্তে আস্তে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল-লণ্ঠনের আলোটার দিকে স্থির দৃষ্টি মেলে উপেনদা তখনও তাকিয়ে।
যে-আকাশে সূর্য-চন্দ্র বিরাজমান, সেই আকাশেই একদিন লণ্ঠনের এই ক্ষীণ আলো পথের পাঁচালী নিয়ে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্করূপে দেখা দেবে–এ–কথা কি দুরে অপহৃয়মাণ আলোকরশ্মির দিকে চোখ মেলে রেখে উপেনদা সেদিন ভাবতে পেরেছিলেন?
সে-রাত্রে বিভূতিবাবুর চোখে ঘুম নেই। শুধু উপন্যাসের পরিচ্ছেদের শব্দ-রাজি গুনেই চলেছেন। প্রথম পরিচ্ছেদে ১৬শ শব্দ, দ্বিতীয়তে হাজার। তৃতীয় আর চতুর্থ প্রায় সমান, পঞ্চম খুব ছোট আর ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ বিরাট বড়। শব্দ সংখ্যার আঙ্কিক হিসাব করতে করতে শেষ রাত্রে পরিশ্রান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।
পরদিন তাড়াতাড়ি জমিদারী সেরেস্তার কাজকর্ম চুকিয়ে প্রচণ্ড গ্রীষ্মের তপ্ত রোদ আর হাওয়ার মধ্যেই বেরিয়ে পড়লেন বাঙালীটোলার পথে। হাতে সেই লণ্ঠন আর লাঠি, শুধু ছাতার বদলে কাগজে মোড়া কয়েকটি খাতা।
বৈঠকখানায় উপস্থিত হয়েই দেখেন উপেনদা ওঁরই প্রত্যাশায় প্রস্তুত হয়ে বসে আছেন। ঘরে প্রবেশ করতেই বললেন—কই, খাতা এনেছেন।
খবরের কাগজে-মোড়া বাণ্ডিলটা উপেনদার সামনে টেবিলের উপর রেখে লণ্ঠন আর লাঠি নিয়ে অন্যান্য দিনের মত ঘরের শেষ প্রান্তের বেঞ্চিতে গিয়ে বসলেন। পাণ্ডুলিপির পাতাগুলি উল্টে-পাল্টে দেখতে দেখতে উপেনদা বললেন–
যা আশংকা করেছিলাম তাই। পরিচ্ছেদের মধ্যে তো শব্দসংখ্যার মিল নেই মনে হচ্ছে। ভাল করে গুনে দেখেছেন?
কাল সারারাত ধরে গুনেছি, আগাগোড়া গরমিল।
গালে হাত দিয়ে উপেনদা স্তব্ধ হয়ে কী যেন চিন্তা করতে লাগলেন। কী একটা বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। এমন সময় আড্ডার দু-তিনজন ঘরে প্রবেশ করতেই খাতাগুলি খবরের কাগজে মুড়ে টেবিলের ড্রয়ারে ভরে ফেলে বিভূতিবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন–আমার কাছে রইল। অবসর মত আমি একবার পড়ে দেখতে চাই।
