প্রবল আপত্তি জানিয়ে উপেনদা বললেন—আপনি অত দূরে গিয়ে বসলেন কেন, সামনের চেয়ারটায় বসুন।
আগন্তুক সলজ্জ কণ্ঠে বললেন–আজ্ঞে আরও অনেকেই তো আসবেন, ওদের জায়গায় আমার বসাটা কি ঠিক হবে?
অভয় দিয়ে উপেনদা বললেন—আপনার সঙ্কোচের কোন কারণ নেই, ঝড় বৃষ্টি মাথায় করে আজ আর কেউ আসবে না। আপনি এগিয়ে এসে বসুন।
অত্যন্ত সংকোচের সঙ্গে উপেনদার সামনের টেবিলটার বিপরীত দিকের চেয়ারে এসে বসতেই উপেনদা বললেন–আমাদের আড্ডায় আপনার নিত্য যাওয়া আসা অথচ আপনার পরিচয়টাই নেওয়া হয় নি। এই আড্ডায় পরিচয়ের তো প্রয়োজন হয় না, মুখচেনা হলেই চিরচেনা। আপনার নামটা জানতে পারি?
—আজ্ঞে আমার নাম বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
–এখানে কী করা হয়?
–কলকাতা থেকেই এখানে এসেছি চাকরি নিয়ে।
–কলকাতা থেকে ভাগলপুরে এসেছেন চাকরি নিয়ে? কলকাতায় কি কিছু জুটল না?
প্রশ্নটার মধ্যে হয়তো উপেনদার নিজেরও কলকাতা ছেড়ে ভাগলপুরে ওকালতি করতে আসার জন্য একটা প্রচ্ছন্ন ক্ষোভ মিশে ছিল। কলকাতার সাহিত্যজীবন ছেড়ে নিছক অর্থের অন্বেষণে ভাগলপুরে এসে, মক্কেল নিয়ে পড়ে থাকাটায় ওঁর অন্তরের সায় ছিল না। সান্ত্বনার সুরে তাই আবার বললেন—
কলকাতায় একটু চেষ্টা করলেই তো একটা-না-একটা কাজ জুটে যেত।
–আজ্ঞে, মাস্টারি একটা জুটেছিল কিন্তু পোষালো না। অগত্যা এখানে খেলাত ঘোষেদের জমিদারী সেরেস্তায় নায়েবের কাজ নিয়ে চলে এসেছি।
–খেলাত ঘোষের জমিদারি? সে তো অনেক দূর। এখান থেকে চার পাঁচ মাইল তো হবেই। তাছাড়া গভীর জঙ্গলের মধ্য দিয়ে যেতে হয় না?
-হ্যাঁ, মাইল দু-তিন পথ জঙ্গল পার হতে হয়।
একথা শুনে উপেনদা একেবারে থ হয়ে গেলেন। বিস্ময়ের ঘোরটা কেটে যেতে বললেন–
এই জঙ্গলে রাস্তা পার হয়ে রোজ আপনি এখানে আসেন! আপনার ভয় করে না? শুনেছি ওই জঙ্গলটায় হিংস্র জন্তুজানোয়ার থাকে, সাপখোপেরও অভাব নেই।
বিভূতিবাবু একটু সলজ্জ হাসি হেসে বললেন—ভয় পাবার কী আছে? জন্তু জানোয়ার থাকলেই বা কি? ওদের আক্রমণ না করলে ওরাও আমাকে কিছু করবে না। তাছাড়া জঙ্গলের একটা মোহ আছে, মায়া আছে যা আমাকে সবচেয়ে বেশী আকর্ষণ করে। আর সাপখোপের কথা বলছেন? ওই যে দেখছেন লাঠি, ওঠা যতক্ষণ হাতে থাকে ততক্ষণ আর কোন কিছুর ভয় আমার থাকে না।
উপেনদা মনে মনে খুশী হয়ে উঠলেন একটি অদ্ভুত চরিত্রের মানুষকে পেয়ে। বললেন—
আচ্ছা, প্রতিদিন আপনি এই দীর্ঘপথ হেঁটে আসেন, আড্ডায় এসে চুপচাপ বসে থাকেন তাও লক্ষ্য করেছি। কিন্তু কেন? কিসের টানে?
-কিসের টানে? আপনাকে কী করে বোঝাব বলুন। ভাগলপুরে আসবার আগেই বাঙ্গালীটোলায় আপনাদের বাড়ির কথা অনেক শুনেছি। শুনেছি শরৎচন্দ্র এই বাড়িতেই মানুষ হয়েছিলেন, এইখানেই তাঁর সাহিত্যসাধনার উৎস। তাছাড়া অনুরূপা দেবী, কেদার বন্দ্যোপাধ্যায় আরও অনেক নামকরা সাহিত্যিকই এই বাড়িতে সাহিত্যের আসর জমিয়েছেন। এ-বাড়ি তো আমার কাছে তীর্থক্ষেত্র। তার উপর রয়েছেন আপনি। আপনার বাড়ির সাহিত্যিক আড্ডার খবর আমি কলকাতা থেকে শুনে এসেছিলাম।
যা আশা করে উপেনদা এই মানুষটির সঙ্গে আলাপ জমিয়েছিলেন এখন দেখলেন এ-অন্য ধাতুতে গড়া। এর কথাবার্তার মধ্যে একটি শিল্পীমন লুকিয়ে আছে তার খানিকটা আভাস যেন উপেনদার কাছে ফুটে উঠল। আগ্রহের সঙ্গে উপেনদা বললেন–
আপনার গোপনে সাহিত্যচর্চার বাতিক আছে নাকি?
না এমন কিছু নয়, এই একটু আধটু—
লাজুক মানুষ তাই বলতে সঙ্কোচ। উপেনদা তাই সাহস দিয়ে বললেন–
আহা লজ্জার কি আছে। কবিতা-টবিতা নিশ্চয়ই দু-একটা লিখেছেন। আর যখন অরণ্যের নির্জনতায় আপনি দিনের পর দিন কাটাচ্ছেন তখন আলবত কবিতা আপনি লিখেছেন। যদি এখনও না লিখে থাকেন, লিখতে হবে এবং আমাকে দেখাতেই হবে।
এ-কথার পর বিভূতিবাবু বুকে বল সঞ্চয় করে বললেন—অভয় যদি দেন, উৎসাহ যদি পাই, তাহলে আপনাকে একটা কথা নিবেদন করি।
–তাহলে অনুমান ঠিকই করেছি। নিশ্চয় কবিতা আপনি লিখেছেন এবং পকেটে করে নিয়েও এসেছেন দেখে শুনে দেবার জন্যে। লজ্জার কিছু নেই, এ-রকম অনেকেই আমার কাছে এসে তাদের লেখা কয়েক্ট করিয়ে নিয়ে যায়। চটপট বার করুন, আমি পড়ে দেখতে চাই।
–আজ্ঞে কবিতা নয়। আমি একটা উপন্যাস লিখেছি।
–উপন্যাস? আ-আ-আপনি? লিখে ফেলেছেন? বিস্ময়ে বিমূঢ় উপেনদা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন বিভূতিবাবুর দিকে।
রাত হয়ে গিয়েছে। বাইরের জমাট অন্ধকার বৃষ্টিভেজা ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে মিশে ঘরের জানলা-দরজা দিয়ে এলোমেলো প্রবেশ করতে লাগল। ঘরের ভিতরে একটা থমথম আবহাওয়া। বিভূতিবাবু মাথা নিচু করে বলে আছেন—যেন মস্ত একটা অপরাধ করে ধরা পড়ে গিয়েছেন। ওদিকে উপেনদার চোখে মুখে তখনও বিস্ময়ের স্তব্ধতা, যেন এ-মানুষ কখনই অপরাধ করতে পারে না।
এই অস্বস্তিকর নিস্তব্ধ দুজনকেই পীড়া দিচ্ছিল। অগত্যা উপেনদাই কথা বললেন—খানিকটা স্বগোতোক্তির মত।
–হাতে খড়ি হল না, একেবারে উপন্যাস!
এবার বিভূতিবাবুর অবাক হবার পালা। তিনি বললেন—হাতে খড়ি। সে আবার কি।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, হাতে খড়ি। এর আগে কোন পত্রিকায় আপনার কোন লেখা-টেখা কিছু বেরিয়েছে? যেমন, কোন কবিতা বা গল্প? নিদেন পক্ষে কোন প্রবন্ধ?
আজ্ঞে না।
তবে? হাতে খড়ি হল না, আপনি কি-না উপন্যাস লিখে ফেললেন? এই আমার কথা ধরুন না। সাহিত্য জীবন শুরু করেছিলাম কবিতা লিখে। পরে গল্প-উপন্যাসে চলে গিয়েছি। আমি কেন। কে নয়। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম রচনা কবিতা। প্রকাশ করেছিলেন ঈশ্বর গুপ্ত তার সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায়। সেই তার প্রথম হাতে খড়ি। রবীন্দ্রনাথের কথা আর নাই বললাম। এমন কি আমার ভাগ্নে শরৎচন্দ্র সেও প্রথম জীবনে কবিতা লিখেই সাহিত্য চর্চা শুরু করেছিল।
