ভবিষ্যতে বাংলা দেশে সাহিত্যিক উপেন্দ্রনাথের কোন রচনাই যদি স্মরণীয় হয়ে না থাকে তবু তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন দুটি লেখকের আবিষ্কর্তারূপে।
একজন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, অপরজন বিভূতিভূষণ। আর এই বিভূতিভূষণের সঙ্গে উপেন্দ্রনাথের প্রথম পরিচয়ের ঘটনাটা খুবই কৌতুককর।
এইটুকু বলেই গাল্পিক বন্ধু থামলেন। এটা তাঁর বরাবরের স্বভাব। শ্রোতাদের একটা উৎকণ্ঠার মধ্যে এনেই বিরতি! আমাদের প্রতিক্রিয়াটা উপভোগ করবার জন্যই বোধ হয় একটা কর্ণরোচক গল্পের সূত্রপাত করেই থেমে গেলেন।
আমরা সবাই হাঁ হাঁ করে উঠলাম—থামলেন কেন, ঘটনাটা বলুন!
কোন উত্তর নেই। নির্বিকার চিত্তে পকেট থেকে আস্তে আস্তে নস্যির কৌটা বার করলেন। কৌটার ঢাকনিটার উপর পাকা তবলচীর মত তর্জনী দিয়ে দুবার টোকা মারলেন। সন্তর্পণে ঢাকনা খোলা হল, দু-আঙ্গুলে নস্যির টিপটি বাগিয়ে নিয়ে ঢাকনাটা বন্ধ করতে করতে বললেন—চা কোথায়?
আমি বললাম—সে আর আপনাকে বলতে হবে না। পকেট থেকে নস্থির কৌটো বার করতে দেখেই আমার বেয়ারা অমর কেটলি নিয়ে ছুটে বেরিয়ে গিয়েছে। এতদিন বৈঠকে আড্ডা দিচ্ছেন, ওর কি আর আপনাদের চিনতে বাকি আছে?
ইত্যবসরে চা এসে গেল। টেবিলের উপর রাখা কাপটার উপর উপুড় হয়ে সশব্দে চুমুক মেরেই একটা তৃপ্তির ধ্বনি ছাড়লেন।
কলকাতা বেতারে রবিবারের শিশুমহলের প্রারম্ভে পরিচালিকা তার শ্রোতাদের উদ্দেশে যখন বলেন-তোমরা সব ভাল আছ তো? তখন পাখিপড়ার মত শেখানো একদল কচিকণ্ঠের আওয়াজ ভেসে আসে—হ্যাঁ-
চায়ের কাপে দ্বিতীয়বার চুমুক মেরেই আমাদের গাল্পিক বন্ধু যখন বললেন–তা হলে গল্পটা শুরু করি। আমরা সমস্বরে বলে উঠলাম-হ্যাঁ-
গল্প শুরু হল।
বাঙালীটোলা জানেন তো? ভাগলপুরের বাঙালীটোলা? সেই বাঙালী টোলার গাঙ্গুলীরা হচ্ছে সেখানকার বিখ্যাত বনেদী পরিবার, শরৎচন্দ্রের মামাবাড়ি। শরৎচন্দ্রের শৈশব ও কৈশোর কেটেছিল ওই মামাবাড়িতে। আমাদের উপেনদা ওই গাঙ্গুলী পরিবারের ছেলে। কলকাতা থেকে আইন পাস করে উপেনদা এলেন ভাগলপুরে ওকালতি ব্যবসার উদ্দেশ্যে। কিন্তু কলকাতা অধ্যয়নকালেই সাহিত্যের নেশায় তিনি মশগুল; ভারতবর্ষ, সাহিত্য ইত্যাদি পত্রিকায় তার লেখা বেরিয়েছে, কিছু সাহিত্যিক খ্যাতিও তিনি অর্জন করেছেন।
কাবুলীওয়ালা যেমন হিংয়ের ঝুলি বাড়িতে রেখে এলেও তার গা দিয়ে হিং-এর গন্ধ বেয়োয়, উপেনদা সাহিত্যের পাট কলকাতায় চুকিয়ে দিয়ে অর্থ উপার্জনের আশায় ভাগলপুরে ওকালতি করতে এসেও একটি সাহিত্যের আড্ডা জমিয়ে তুললেন। মানুষটি একে সাহিত্য-পাগল, তায় মজলিসী। রোজ সন্ধ্যায় তার বাড়ির বৈঠকখানায় একটা জমাটি আড্ডা বসত। গান-বাজনার সঙ্গে মজলিসী গল্প, সেই সঙ্গে চলত সাহিত্য আলোচনা।
ভাগলপুরে বহুকাল থেকেই সাহিত্যের আবহাওয়া আপনা থেকেই গড়ে উঠেছিল। উপেনদার আড্ডায় সাহিত্যেৎসাহী অনেক বাঙালীই রবাহূত আসতেন-যেতেন, কেউ কিছু মনে করতেন না।
সেই সময় একটি অপরিচিত বাঙালী যুবকের উপেনদার আড্ডায় ছিল নিত্য যাওয়া-আসা! পরনে গোড়ালি ছুঁই-ছুঁই খাটো ধুতি, গায়ে ইন্ত্রি-বিহীন নিজহাতে কাচা মার্কিন কাপড়ের পাঞ্জাবি। এক হাতে লণ্ঠন, অপর হাতে লাঠি। প্রতিদিন সন্ধ্যায় আর এক কোণে সবার পিছনে সবার অগোচরে চুপচাপ বসে থাকেন, আডড়া শেষ হলে যেমন নিঃশব্দে আসেন, তেমনি নিঃশব্দে চলে যান। মানুষটি যে কে, সে পরিচয় নেবার প্রয়োজন কখনও ঘটে নি। আড্ডায় আসেন যান এইটিই তো একমাত্র পরিচয়। পূর্বপরিচয়ের প্রয়োজন কি।
শরতের পর শীত পার হয়ে বসন্তকালও চলে গেল, এল গ্রীষ্ম। ভাগলপুরের গ্রীষ্ম তো জানেন, যতক্ষণ বোদ ততক্ষণ বাইরে বেরনো যায় না, সন্ধ্যের পর লোকে একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। কোর্ট বন্ধ। উপেনদা সারাদিন ঘরে বসে নতুন উপন্যাস লিখছেন, সন্ধ্যে হলেই আড্ডার জন্য উন্মুখ হয়ে বৈঠকখানায় বসে অপেক্ষা করছেন। এমন সময় দেখা দিল ধুলো উড়িয়ে প্রচণ্ড কালবৈশাখীর ঝড়। উপেনদার মন খারাপ। এই ঝড়ের মধ্যে আজ আর কি কেউ আসবে? বু প্রতিদিনের অভ্যাসমত বৈঠকখানাঘরে বসে আছেন, ঝড়ের জন্য সেদিন দরজা জানলা বন্ধ। বাইরে অন্ধকার নেমে এসেছে, ঝড়ের দাপট কিছু কম, দু-চার ফোঁটা বৃষ্টিও পড়ছে যেন। দরজাটা খুলে বাইরের রাস্তার দিকে তাকাতেই দেখতে পেলেন দূর থেকে একটি লণ্ঠনের আলো তাঁরই বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে, সঙ্গে একটা ছায়ামূর্তি। যাক একজনকে অন্তত পাওয়া গেল, দুদণ্ড রসালাপ করে সন্ধ্যেটা তাহলে ভালই কাটবে।
ছায়ামূর্তি যখন কায়া নিয়ে তার ঘরের বারান্দায় হাজির হল, উপেনদা যেন একটু দমে গেলেন। মানুষটিকে পাঁচ ছয় মাস ধরে নোজই তাঁর বৈঠকখানায় দেখছেন বটে কিন্তু যেমন গম্ভীর তেমনি লাজুক। কথা খুবই কম বলেন, যেটুকু বলেন একেবারে রসকষহীন। এর সঙ্গে সাহিত্য নিয়ে আলোচনাই বা কী হবে, রঙ্গরসের কথা তো ছেড়েই দিলাম।
উপেনদার স্বভাব হচ্ছে সব মানুষের মধ্যেই গল্প বা উপন্যাসের চরিত্র খুঁজে বেড়ানো। মনে মনে ভেবে নিলেন এই নির্বাক মানুষটির জীবনে এমন কিছু উপাদান আছে যা তাঁর উপন্যাসের চরিত্রসৃষ্টির প্রয়োজনে লাগবে। সেই উদ্দেশ্যেই আগন্তুক নিকটবর্তী হতেই তাকে সাদর অভ্যর্থনায় ঘরে ডেকে তুললেন।
ঘরে ঢুকেই মানুষটি হাতের ছাতা লাঠি ও লণ্ঠন দেয়ালের ধারে রেখে ঘরের কোণার সেই নির্দিষ্ট বেঞ্চিতে গিয়ে বসলেন, যেখানে তিনি রোজই এসে বসেন।
