একদিন দুপুরে দপ্তরে বসে আছি। তখন আনন্দবাজার রবিবাসরীয় বিভাগ আর দেশ-এর দপ্তর ছিল একই ঘরে, পাশাপাশি টেবিলে। সুবোধবাবু তখন রবিবাসরীয় বিভাগে কাজ করেন, তিনিও বসে আছেন। এমন সময় প্রেস থেকে লাইনো বিভাগের ইন-চার্জ একটা পাণ্ডুলিপি হাতে ঘরে এসে উপস্থিত।
ঘরে ঢুকেই তিনি বোমার মত ফেটে পড়লেন—এই লেখকের লেখা এত দুর্বোধ্য যে, কোন অপারেটর কম্পোজ করতে চায় না। এই লেখককে কেন আপনারা বলেন না, আরেকটু ধরে ধরে সুস্পষ্ট করে লিখতে–এই বলে সুবোধবাবুর উপন্যাসের কপি শূন্যে তুলে ধরলেন।
আমি তো হতবাক। আরক্তিম মুখে সুবোধবাবু আমার দিকে তাকিয়ে। সুবোধবাবুর লেখক-খ্যাতি তখন ব্যাপক ছিল না এবং লাইনো বিভাগের লোকেদের তখন জানবার কথাও নয় কে সুবোধ ঘোষ।
এই অস্বস্তিকর অবস্থার যবনিকা টানবার জন্য আমি তাড়াতাড়ি সুবোধবাবুর দিকে দেখিয়ে বললাম-এই যে, এই ইনিই লেখক, এরিই নাম সুবোধ ঘোষ।
সঙ্গে সঙ্গে অপারেটর ভদ্রলোক লজ্জায় কাচুমাচু। এক গাল হেসে কিন্তু কিন্তু করে বললেন—এই বুঝেছেন কি না, আমি ঠিক বুঝতে পারি নি
অপারেটরকে সঙ্কোচ থেকে উদ্ধারকল্পে বললাম-আমাদের কাগজের সম্পাদক বঙ্কিমবাবুর হাতের লেখা যদি কম্পোজ করতে পারেন তাহলে সুবোধবাবুর হাতের লেখা কেন পারবেন না?
-বঙ্কিমবাবু বহু বছর ধরে লিখছেন, পুরনো অপারেটাররা ওর লেখার ধচি এতদিনে বুঝে ফেলেছে।
অমি বললাম-সুবোধবাবুও বহু বহু বছর ধরেই লিখবেন। ততদিনে ওঁর। হাতের লেখার ধাঁচও আপনার অপারেটাররা বুঝে ফেলবে।
এই ঘটনার বেশ কিছুকাল পরে সুবোধবাবু যখন আনন্দবাজার পত্রিকার সহযোগী সম্পাদক, নিয়মিত সম্পাদকীয় লেখেন তখন প্রেস-এর একজন লইনো অপারেটার কী কারণে খবর না দিয়েই ডিউটি থেকে ডুব মারে। পরদিন ডিউটিতে আসামাত্র সেই লাইনো-ইনচার্জ ভদ্রলোক খুব খানিকটা বকাবকি করে বললেন–ফের যদি এরকম হয় তাহলে তোমার চাকরি থাকবে
বলে দিচ্ছি।
উত্তরে সে লোকটি গম্ভীর হয়ে বললে-সুবোধবাবুর যতদিন এখানে চাকরি আছে ততদিন আমার চাকরি মারে কে।
বহু বছর পরে এই লাইনে ইনচার্জ পুজা সংখ্যায় সুবোধবাবুর একটি গল্প শেষ মুহূর্তে পেয়ে অলৌকিক কার্যক্ষমতার পরিচয় দিয়েছিলেন, সে-গল্প বারান্তরে আপনাদের বলব।
বৈঠকের গাল্পিক সাহিত্যিক গল্প শুনতে এবং গল্প বলতে খুবই ভালবাসেন। কিন্তু তার একটা অভ্যাস হচ্ছে টু দি পয়েন্ট থাকা। অর্থাৎ যে-প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনার শুরু সে-প্রসঙ্গ যদি গল্পের তোড়ে ডালপালা বিস্তার করতে করতে প্রসঙ্গান্তরে চলে যাবার চেষ্টা করে তাকে আবার মূল কাণ্ডে ফিরিয়ে আনা। তাই বিরক্তির ভাব প্রকাশ করে বললেন–যে কথা শুরুতে হচ্ছিল সেই কথাই হোক। রাবীন্দ্রিক হাতের লেখার যে বিরাট পাণ্ডুলিপিটার উপর আপনি এতক্ষণ হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলেন সে-বস্তুটি কী জানতে পারি?
ভ্রমণ-কাহিনী।
আমার কথা শুনে সব্যসাচী সাহিত্যিক গাল্পিক-সাহিত্যিককে একটু ভরসা দেবার সুরে বললেন–
যাক, বেঁচে গেলেন। উপন্যাস তো নয়। উপন্যাস হলেই ভয়—আবার একজন প্রতিদ্বন্দ্বী দেখা দিল।
আমি বললাম-না-ই বা হল উপন্যাস। এ-লেখার জাতি-পাঁতি স্বতন্ত্র। উপন্যাস এর ধারে কাছে লাগে না।
দশ জোড়া বড় বড় চোখে একরাশ বিস্ময়ভরা প্রশ্ন জেগে উঠল–লেখকটি কে?
—আপনারা চিনবেন না। সৈয়দ দা।
আবার প্রশ্ন—সৈয়দ দা, তিনি আবার কে?
আমি বললুম—ডক্টর সৈয়দ মুজতবা আলী। শান্তিনিকেতনের প্রাক্তন ছাত্র। সেই সুবাদে আমার সৈয়দ দা।
সব্যসাচী লেখক বললেন–তাহলে তো আর কিছু বলা যাবে না। একে রাবীন্দ্রিক হস্তাক্ষর তদুপরি শান্তিনিকেতনিক। এ-লেখা তো অবশ্য প্রকাশিতব্য।
আমি বললাম—আগামী সপ্তাহ থেকেই লেখাঁটি প্রকাশিত হবে। আপনারাই তখন বিচার করবেন লেখাঁটি প্রকাশিতব্য কিনা। তবে এটুকু আপনাদের বলে রাখছি, এই এক বই লিখেই ইনি বাংলা সাহিত্যে পাঠকচিত্ত জয় করবেন।
গাল্পিক বন্ধু বললেন—আচ্ছা, বেশ কিছুকাল আগে পরিচয় পত্রিকায় ভাষাতত্ত্ব নিয়ে এর একটি প্রবন্ধ পড়েছিলাম মনে পড়ছে। তিনি কি ইনি?
আমি বললাম-আপনি ঠিকই ধরেছেন তিনিই ইনি। সেখানে তিনি পণ্ডিত। কিন্তু এ লেখায় পাণ্ডিত্যের সঙ্গে সাহিত্যরসের অপূর্ব যোগাযোগ দেখতে পাবেন।
এই এক লেখাতেই বাংলা সাহিত্যজগতে সৈয়দ মুজতবা আলীর আসন পাকা হয়ে গেল। আজ তিনি সর্বশ্রেণীর পাঠকদের প্রিয় লেখক। তাঁর নিজের লেখা সম্বন্ধে তাকে প্রশ্ন করলে তিনি আনাতোল ফ্রাসের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে বলতেন, If you wish to travel more, travel light.—তোমার লেখাকে তুমি যদি সর্বত্রগামী করতে চাও, হালকা হয়ে লেখ, পণ্ডিতী ফলিও না।
আলোচনা প্রসঙ্গে বৈঠকে সেদিন কথা উঠল সাম্প্রতিক কালে প্রথম প্রকাশিত লেখায় কোন্ কোন্ লেখক স্বনামধন্য হয়েছেন।
বৈঠকের গাল্পিক বন্ধু আলোচনার বিষয় একটু গুরুগম্ভীর হয়ে পড়লে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন—এই বুঝি তর্কবিতর্ক শুরু হল, সেই সঙ্গে গলার শিরা ফুলিয়ে চিৎকার। তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন-যে-যাই বলুন বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম উপন্যাস পথের পাঁচালী নিয়ে আর্বিভাব একটি চিরস্মরণীয় ঘটনা। সেই সঙ্গে যিনি কে আবিষ্কার করেছিলেন, বিচিত্রা-সম্পাদক উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে আমরা চিরকৃতজ্ঞ।
