রাবীন্দ্রিক ধাঁচের হাতের লেখার পাণ্ডুলিপি কি না, তাই এত মনোযোগ। আমাদের দিকে আর চোখ তুলে তাকাবার ফুরসত হচ্ছে না।
আড্ডার গাল্পিক লেখক বললেন—রাবীন্দ্রিক হাতের লেখার প্রতি আশ্রমিকদের কেমন যেন একটা দুর্বলতা আছে। কোন পাণ্ডুলিপি যদি রবীন্দ্রনাথের হাতের লেখার ধাঁচে হয়, তাহলে আর তা পড়ে দেখারও প্রয়োজন হয় না। সে-লেখা সরাসরি প্রেস-এ চলে যায়। রবীন্দ্রনাথের মত হাতের লেখা যখন, তখন লেখার হাত থাকতেই হবে।
আমাকে একটু কটাক্ষ করেই সব্যসাচী লেখক বললেন–ওঁর ভাবটা হচ্ছে প্রহলাদের মত। হাতে খড়ির সময় ক লিখতে গিয়ে কৃষ্ণ বলে কেঁদে আকুল।
তরুণ কবি বললেন–আপনারা কী বলতে চান। এই পত্রিকায় মাঝে মাঝে আমার কবিতা প্রকাশিত হয়, সেটা কি শুধুই আমার রাবীন্দ্রিক হাতের লেখার জন্যে? রচনার গুণে নয়?
সব্যসাচী লেখক সুযোগ পেলেই তরুণ কবিকে একটু বেকায়দায় না ফেলে ছাড়েন না। বললেন, সত্যি কথা বলতে কি, ফিফটি-ফিফটি।
ফিফটি-ফিফটি! তার মানে? কবির কণ্ঠে একটু উষ্মর আভাস।
হাতের লেখা পঞ্চাশ আর দুর্বোধ্যতা পঞ্চাশ।
এই বাক-বিতণ্ডা থেকে তরুণ কবিকে উদ্ধার করা প্রয়োজন, আর প্রয়োজন এই অভিযোগ থেকে আত্মপক্ষ সমর্থনের। পাণ্ডুলিপি একপাশে সরিয়ে রেখে বললাম-পরীক্ষার্থী ছাত্র আর যশঃপ্রার্থী লেখকদের হাতের লেখা পরীক্ষক ও পত্রিকা সম্পাদকের উপর কিছুটা প্রভাব বিস্তার করে বই কি! তা বলে ভাল রচনা হাতের লেখার দোষে পরীক্ষায় কম নম্বর পেলেও পত্রিকার সম্পাদক বাতিল করে দেবেন, এমনটা কদাচিৎ ঘটে।
সব্যসাচী লেখক বাধা দিয়ে বলে উঠলেন—হাতের লেখার দোষে যে ভাল লেখা সম্পাদকের দপ্তর থেকে বাতিল হয়ে যায় তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আমার আছে।
আমরা সবাই উৎসুক হয়ে উঠলাম নতুন কিছু খবর শোনার লোভে।
সব্যসাচী লেখক বললেন–১৯৩৬ সালের কথা। নবশক্তি পত্রিকা। তখন পার্ক সার্কাস থেকে বেরোয়। প্রেমেন্দ্র মিত্র নামে সম্পাদক, পত্রিকা। প্রকাশের দায়িত্ব একা অদ্বৈত মল্লবর্মণের ঘাড়ে। আমি মাঝে-মাঝে লেখা নিয়ে যাই। মিষ্টভাষী এই ক্ষীণকায় মানুষটির বিনয়নম্র স্বভাব আমাকে খুবই আকর্ষণ করত। কিন্তু যখনই গিয়েছি, দেখেছি কাজের চাপে অত্যন্ত বিব্রত। এক হাতে তাকে সব কিছুই করতে হয়। জমিয়ে বসে গল্প করার ইচ্ছে উভয়ের থাকা সত্ত্বেও দু-চার কথার পর বিদায় নিয়ে চলে আসতাম। কিছুদিন বাদে অফিসের পর বিকেলে নবশক্তির কার্যালয়ে গিয়ে দেখি অদ্বৈত বাবু নেই। তার জায়গায় বসে আছেন একটি নব্য ছোকরা। পরনে মিহি খদ্দরের ধুতি-পাঞ্জাবি, কাধের উপর পরিপাটি ভঁজে ইস্ত্রি করা একটি কালোপাড়ের মাদ্রাজী সাদা চাদর। ঘরে ঢুকতেই নব্য ছোকরা গম্ভীর গলায় জিজ্ঞাসা করলেন—কি চাই?
—অদ্বৈতবাবুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম।
তিনি এক মাসের ছুটি নিয়ে দেশে গেছেন। কিছু প্রয়োজন আছে?
আপনারাই বলুন। এরকম কাঠখোট্টা মেজাজের লোকের কাছে এয়োজনের কথা বলবার প্রবৃত্তি হয়? খামটা পকেটেই ছিল পকেটেই থেকে গেল। তবু একটু অন্তরঙ্গতা দেখবার জন্য বললুম—একটু জল খাওয়াতে পারেন?
অপেক্ষা করতে হবে। বেয়ারাটা কাগজ নিয়ে ডাকঘরে গেছে, এই এল বলে।
মনে মনে ভাবলুম, ভদ্রতার খাতিরে অন্তত দু-চারটা কথা বলবেন।
কিন্তু ছোকরা সাজ-পোশাকে খদ্দর-মার্কা হলে হবে কি, আমার দিকে দ্বিতীয়বার ফিরেও তাকাল না। টেবিলের উপর ডান হাতের কাছে এক বাণ্ডিল খালি খাম, বাঁ দিকে একতাড়া খাম ভর্তি ডাকে-আসা গল্প-প্রবন্ধ। বাঁ দিক থেকে একটা খাম তুলে আলোর দিকে মেলে ধরে খালি অংশটুকু ফড়াৎ করে একটানে ছিড়ে ফেললেন। বেরিয়ে এল একটি কবিতা। কবিতার নাম ও লেখকের নামের উপর একবার চোখ বুলিয়েই বলে উঠলেন—আহা, কী কবিতার নাম। সুমিতাকে। সুমিতাকে নিয়েই যদি কবিতা লিখবি সেটা সুমিতার হাতেই দিয়ে এলে পারতিস। আমাদের জ্বালানো কেন।
বলার সঙ্গে সঙ্গে ডানদিকের খালি খামের বাণ্ডিল থেকে আরেকটা খাম তুলে তার মধ্যে কবিতাটা ভরে খস্ খস্ করে লেখকের নাম-ঠিকানা লিখে ফেললেন।
আবার বাঁ দিকের খামে হাত। আবার ফড়াৎ শব্দে হেঁড়া। এবার বেরিয়ে এল একটি গল্প। সঙ্গে সঙ্গে স্বগতোক্তি হল-যেমন হাতের লেখা, তেমনি গল্পের আকার, তেমনি লেখকের নাম।
ডান হাতের খাম উঠে এল। গল্পটি তার মধ্যে কবরস্থ হতেই আমি উঠে পড়লাম। চোখের সামনে লেখার উপর এমন কসাইগিরি আর কতক্ষণ সহ করা যায়! ভদ্রলোকের তখন ক্ৰক্ষেপ নেই যে একজন আগন্তুক জল খেতে চেয়ে না খেয়েই বেরিয়ে যাচ্ছেন। দরজার চৌকাঠ পার হয়ে রাস্তার সিঁড়িতে পা দেবার আগে আমার এই নিঃশব্দে চলে যাওয়াটা ওঁর নজরে পড়েছে কি না জানবার জন্যে পিছন ফিরে তাকালাম। তিনি তখনও আপন মনে ছিড়ছেন আর তরছেন, ছিড়ছেন আর ভরছেন। যেমন আসা তেমনি যাওয়া।
এ পর্যন্ত বলেই সাব্যসাচী লেখক আমার দিকে তাকিয়ে থেকে মুচকি হাসতে লাগলেন। ভাবখানা, বুক সাধু যে-জান সন্ধান।
সন্ধান জানবার আগেই কথার মোড় ফেরাবার উদ্দেশ্যে আমি বললামআপনার অভিজ্ঞতাকে স্বীকার করে নিয়ে এর বিপরীত নজীরও আমি দেখাতে পারি। সুবোধ ঘোষের উদাহরণ দিয়েই বলি। সুবোধবাবুর হাতের লেখা। যারা দেখেছেন তারাই জানেন যে, তার হাতের লেখার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় না থাকলে পাঠোদ্ধার সহজসাধ্য নয়। সুবোধবাবুর প্রথম উপন্যাস তিলাঞ্জলি দেশ পত্রিকায় প্রকাশের জন্য পাণ্ডুলিপি প্রেসে পাঠানো হল। কম্পোজ করতে গিয়ে লাইনে অপারেটার হিমসিম। কাজের স্পীড গেল কমে, এক ঘন্টার কাজ দুঘণ্টা সময় লাগে। প্রুফ যখন এল তা সংশোধন করতে গিয়ে ক্ষতবিক্ষত, করেকশন করা মানে নতুন কম্পোজের সামিল।
