বিশুদার এই কথায় আমি প্রতিবাদ জানিয়ে বললাম-যাই বলুন, তরুণ বয়সে এই কবি-দম্পতির কবিতা কিন্তু আমার ভালই লাগত। যে-বয়সটায় একটুকু কথা আর একটুকু ছোঁয়া নিয়ে মনে মনে অর্ধেক রাজত্ব আর রাজকন্যার কল্পনা করতে ভাল লাগত সে-বয়সে ওঁদের লেখা মিষ্টি প্রেমের কবিতার একটা মোহ ছিল বইকি!
ওই জন্যেই তো বলা হয় ল্যাবেঞ্চুস কবি।
অমর বিশুদার সামনে চায়ের কাপটা রাখতেই চুমুক মেরে আবার বললেন–যাক, বিশ্বপতিবাবু এসে গেছেন। ট্যাক্সি থেকে ব্যস্ত-সমস্ত হয়ে নামলেন, হাতে খবরের কাগজে রোল করা একটা বিরাট জিনিস, অনুমান করলাম মানপত্ৰই হবে।
শরৎজা বললেন—কি হে বিশ্বপতি, এত দেরি করলে যে?
বিশ্বপতিবাবু বললেন–আপনি যে-ধরনের মানপত্রের কথা বলেছিলেন কলকাতায় কোথাও খুঁজে পাই না। এদিকে দেরি হয়ে যাচ্ছে, আপনারা সবাই আমার জন্যে অপেক্ষা করছেন, তাও বুঝতে পারছি। শেষকালে খালি হাতে ফিরব? তাই মরিয়া হয়ে একটা ট্যাক্সি নিয়ে ছুটলাম ধাপার মাঠে। তাই দেরি হয়ে গেল।
আমরা সবাই এ-ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছি আর ভাবছি একটা মানপত্রর সঙ্গে ধাপার মাঠ পর্যন্ত ছোটার কি সম্পর্ক।
শরৎদা বললেন–তাহলে আর অপেক্ষা করা নয়, বেলা অনেক হল। ফটোগ্রাফারও সেই ন-টা থেকে বসে আছে ফটো তুলবার জন্যে। বিশ্বপতি, মানপত্রটা তুমিই গিরিজার হাতে তুলে দাও।
বিশ্বপতিবাবু একটু কিন্তু কিন্তু করে বললেন–আপনি উপস্থিত থাকতে আমি দেব?
শরৎদা বললেন—একই কথা। তাছাড়া রসচক্রর তরফ থেকে তোমাকেই তো এভার দেওয়া হয়েছে।
গিরিজাকুমার বসু গলায় মালা দিয়ে বসে আছেন আর প্রবল উত্তেজনায় শীতকালেই কপালে কালোকালে ঘাম দেখা দিয়েছে। বিশ্বপতিবাবু গিরিজাবাবুর সামনে জোড়হস্তে নিবেদনের ভঙ্গিতে খবরের কাগজে মোড়া সুতো দিয়ে বাঁধা মানপত্রটি রাখলেন।
শরৎদা বললেন—ওহে বিশ্বপতি, কাগজের মোড়কটা খুলে মানপত্রটা ওর হাতে তুলে দাও।
একটু ইতস্তত করে বিশ্বপতিবাবু কাগজের মোড়কটা খুলে ফেললেন, বেরিয়ে পড়ল দুহাত মাপের একটা মানকচুর পাতা।
গিরিজাবাবু এক লাফে আসন ছেড়ে উঠে পড়লেন। গলার মালা ফেললেন ছিড়ে। শরৎবাবুর দিকে বিক্ষুব্ধ দৃষ্টি হেনে বললেন–বুঝতে পেরেছি শরৎজা। আমাকে নিয়ে এই যে ধ্যাষ্টামোটা হল তার মূলে রয়েছেন আপনি।
শরৎদা চোখেমুখে বিস্ময়ের ভাব এনে বললেন–আমি কি করে জানব। বিশ্বপতির উপর ভার ছিল মানপত্র আনবার, কথাটা ও রেখেছে।
আপনার সঙ্গে এই আমার শেষ দেখা। আমি চললুম।
শরৎদা বললেন–তার আগে তোমার সঙ্গে অন্তত ফটোগ্রাফটা তুলে রাখা যাক। ফটোগ্রাফারকে তাই সকাল থেকে বসিয়ে রাখা হয়েছে।
শরৎদার এই কথায় কাজ হল। শরৎবাবুর ওপর যতই রাগ হোক না কেন। ওঁর সঙ্গে একটা ছবি তুলে রাখার লোভ কার না আছে। গিরিজাবাবু রাজী হতেই ওঁকে মাঝখানে রেখে সবাই মিলে ছবি তোলা হল। গিরিজাবাবুর মাথার পিছনে অতি সন্তর্পণে যে মানকচুর পাতাটা তুলে ধরা হয়েছিল গিরিজাবাবু তা জানতে পেরেও না জানার ভান করেছিলেন।
বিশুদা এবার থামলেন। আমরা সবাই উৎসুক হয়ে উঠলাম সেই ফটোগ্রাফটা কিভাবে সংগ্রহ করা যায়।
বিশুদা বললেন—দুঃখের কথা আর বলেন কেন। সেই ফটোগ্রাফ সংগ্রহের চেষ্টা আমরা কি কম করেছি। কবি-পত্নী তমাললতা বা গিরিজাবাবুর কাছে সব বৃত্তান্ত শুনে হুকুম দিলেন—যতটাকা লাগে এক্ষুনি গিয়ে ফটোগ্রাফারের কাছ থেকে নেগেটিভটা কিনে আনতে। এবং গিরিজবাবু তা করেও ছিলেন। পরে সে নেগেটিভের আর কোন পাত্তা পাওয়া গেল না।
প্রশ্ন দেখা দিল শরৎচন্দ্র গিরিজাবাবুকে নিয়ে এরকম রসিকতা করলেন cal
বিশুদা বললেন—আমরা শরৎদাকে এই প্রশ্নই করেছিলাম। শরৎদা বললেন–গিরিজা রোজ সকালে তাড়া তাড়া কবিতা এনে আমাকে শোনাতে লাগল ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সারা সকালটাই মাটি।
অমৃত সমান সচক্রের কথা থামতেই আমি বললাম—বিশুদা এবার আরেক দফা চামৃত হয়ে যাক্। অনেকক্ষণ তো গাঁজাখুরী গল্প চালালেন।
বিশুদা ফোঁস করে উঠলেন। বললেন–আপনারা বড়ই বেরসিক। আজকাল ভেজালের যুগে কোন জিনিসটা খাঁটি? গল্পে কিছু ভেজাল যদি এসেই থাকে দোষ কি।
দোষ নেই। তবে গিরিজাবাবুকে নিয়ে শরৎবাবু এরকম নির্মম রসিকতা কেন করলেন সেইটাই বুঝতে পারছি না।
বিশুদা বললেন–কী করে বুঝবেন। গিরিজাবাবুর পাল্লায় কোনোদিন তো পড়েন নি। তাছাড়া এ আর কি শুনলেন? শরৎদা রবীন্দ্রনাথকে একবার কী রকম জব্দ করেছিলেন সে ঘটনাটা বলি।
পথের দাবী বই বাজেয়াপ্ত হবার পর বন্ধুদের পরামর্শে শরৎদা রবীন্দ্রনাথকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন যে সাহিত্যের উপর ইংরাজ সরকারের এই অন্যায় হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে চিঠি দিতে। রবীন্দ্রনাথ শরৎদার এই অনুরোধ রক্ষা করতে পারেন নি এবং কেন পারেন নি তা এক দীর্ঘপত্রে রবীন্দ্রনাথ শরৎদাকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু পণ্ডিচেরীর দিলীপকুমার রায় যখন লোকমুখে শুনলেন যে রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্রের অনুরোধ রাখেন নি, ছুটে চলে এলেন শরৎদার কাছে। শরৎদাকে একটু উস্কে দেবার বাসনায় সান্ত্বনার সুরে বললেন—কবি আপনার অনুবোধ উপেক্ষা করে আপনার খুবই ক্ষতি করলেন।
শরৎদা মুচকি হেসে বললেন—ওহে মণ্টু, কবি আমার আর কী এমন ক্ষতি করলেন। আমি ওঁর যা ক্ষতি করেছি জীবনে তা উনি ভুলতে পারবেন না। গিরিজাকুমার বসুর সঙ্গে কবির আলাপ করিয়ে দিয়েছি।
১২. শনিবার বিকেলে দপ্তরে বসে
শনিবার বিকেলে দপ্তরে বসে একটি সদ্য পাওয়া পাণ্ডুলিপির পাতার উপর মুগ্ধদৃষ্টি রেখে ঘাড় গুঁজে বসে আছি। আড্ডাধারী বন্ধুরা একে-একে হাজির হয়েছেন, সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। আমার তন্ময়তা ভঙ্গ করবার জন্য আড্ডার সব্যসাচী লেখক বললেন–
