সেই ঝোঁকেই বিশুদা পর পর দুটো অসাধারণ গল্প লিখেছিলেন নিম্নমধ্যবিত্ত কেরানী জীবনের আকাঙ্ক্ষা ও ব্যর্থতা নিয়ে। অন্তরের গভীর অনুভূতি দিয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা দুটি গল্পই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু সেই খানেই ইতি, আর কলম ধরলেন না। জিজ্ঞেস করলে বলেন-বেশ তত আছি। আপনার পত্রিকায় লেখকের ভিড় বাড়িয়ে আপনাকে দেশত্যাগ করতে চাইনে।
বিশুদা কথা রেখেছিলেন, কলম আর ধরেন নি। কিন্তু সাহিত্যিকদের যেকোন অনুষ্ঠানে বিশুদার স্থান সর্বাগ্রে। আমরা তাই ঠাট্টা করে আজও ওকে বলে থাকি-না লিখে সাহিত্যিক।
রসচক্রের আজ্ঞায় তাবড় সাহিত্যিকদের সম্বন্ধে বিশুদা প্রায়ই আমাদের বৈঠকে রসিয়ে গল্প জমাতেন, যেন এইমাত্র সেই আড্ডা থেকে উঠে এসেছেন। বিশুদা বললেন–
এক রবিবার ঠিক হল রসচক্রর তরফ থেকে কবি গিরিজাকুমার বসুকে মানপত্র দেওয়া হবে।
বৈঠকে একজন বললে—এ কি সেই বিখ্যাত ল্যাবেস কবি গিরিজা কুমার?
বিশুদা খেঁকিয়ে উঠলেন—হ্যাঁ গো হ্যাঁ, তিনিই। প্রস্তাবটা উত্থাপন করলেন শরৎবাবু নিজেই। আমরা কয়েকজন আপত্তি জানিয়ে বললাম—তা হয় না শরৎদা। কালীদা, যতীনদা, নরেনদা থাকতে আগেই গিরিজাদাকে দেওয়াটা একটু দৃষ্টিকটু হয় না কি?
আমাদের আপত্তি শরৎদা কানেই তুললেন না। শুধু বললেন–ওরা মানপত্রের জন্য ব্যস্ত নয়। তাছাড়া ওদের মানপত্র দেবে দেশবাসী। কিন্তু গিরিজার কথা স্বতন্ত্র। বেচারী সারাজীবন ধরে ওর বউকে উপলক্ষ্য করে কয়েক হাজার প্রেমের কবিতা লিখল, অথচ তোমরা কেউ ওকে আমলই দিলে না। তাই ওর মনে একটা ক্ষোভ আছে।
একথার পর আর আপত্তি চলে না, সবাই মেনে নিলুম। বিশ্বপতি চৌধুরী মানপত্র দেবেন, পরামর্শ টা শরৎবাবুই দিলেন।
বিশুদার গল্পে বাধা দিয়ে বৈঠকের সব্যসাচী লেখক টিপ্পনী কেটে বললেন—এটা কি রকম হল বিশুদা? শরৎবাবু, কালিদাস রায়, যতীন বাগচী, নরেন্দ্র দেব এরা আপনার গল্পের তোড়ে দাদা হয়ে গেলেন?
বিশুদা রেগে বললেন–ওই তো আপনাদের দোষ। কিছুই না জেনে মন্তব্য করবেন। রসচক্রের বৈঠকে বসবার কল্কে তত পেলেন না। পেলে বুঝতেন রসচক্রের ওইটিই ছিল রীতি। বয়োজ্যষ্ঠরা ওখানে সবাই দাদা, সমবয়সী আর কনিষ্ঠদের সঙ্গে তাদের তুই-তোকারি সম্পর্ক।
তাই বলুন। সব্যসাচী লেখক টেবিলে টোকা মেরে, তবলার বোল তুলতে তুলতে বললেন—কোন দিন শুনব রসচক্রের সভ্যদের মুখে রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, মায় বিদ্যাসাগর পর্যন্ত দাদা বনে গেছেন। শুধু কাঁধে হাত দেওয়াটাই বাকি।
আমাদের এই সব্যসাচী লেখকের খোঁচা-দেওয়া স্বভাবটা আর বদলাতে পারলাম না। জমে-ওঠা গল্পকে কঁচিয়ে দিয়ে মজা দেখা। আমরা সবাই বিশুদাকে তাতিয়ে দিয়ে বললাম—চালিয়ে যান বিশুদা। ওর কথায় কান দেবেন না।
এক গাল হেসে বিশুদা বললেন–ওর কথায় কোন দিন কান দিই নাকি! যতোসব—ও, কি যেন বলছিলুম? সেই মানপত্রের কথা। ঠিক হল যতীনদা, তোমাদের যতীন বাগচী গো, তাঁর বাড়িতেই পরবর্তী রবিবার সকালে মানপত্র দেওয়া হবে।
পরের রবিবার বেলা নয়টার মধ্যে রসচক্রের সভ্যরা একে একে যতীন বাগচীর বাড়িতে জমায়ত হয়েছেন, শরৎদাও যথাসময়ে উপস্থিত। কিন্তু মানপত্র আনার ভার যার উপরে দেওয়া হয়েছিল সেই বিশ্বপতি চৌধুরীর দেখা নেই।
এদিকে গিলে-হাতা আদ্দির পাঞ্জাবি আর ধাক্কা-দেওয়া শান্তিপুরী কোচানো ধুতি পরে ষাট বছরের যুবা কবি গিরিজাকুমার বসু ঘর আলো করে বসে আছেন।
শরৎদা বললেন, মানপত্র যখন আসতে দেরি হচ্ছে ততক্ষণে মালা-চন্দন ওকে পরিয়ে দাও।
দুটি মেয়ে এসে গোড়ে মালা আর শ্বেতচন্দন পরিয়ে দিতেই শরৎঙ্গা বললেন–হ্যাঁ, এতক্ষণে গিরিজাকে বরবর দেখাচ্ছে।
বিশুদার কথায় আবার বাধা দিয়ে সব্যসাচী লেখক বলে উঠলেন—শরৎবাবু গিরিজাবাবুকে বর্বর বলে গাল দিলেন আর গিরিজাবাবু তা বিনা প্রতিবাদে হজম করলেন?
বিশুদা বললেন—রসচক্রের সভ্যরা রসিকতা বুঝতেন। আপনার মত তারা বেরসিক ছিলেন না। যাক, যে-কথা বলছিলাম। এদিকে বেলা বাড়ছে, বিশ্বপতিবাবুর দেখা নেই। সবাই ব্যস্ত আর উদগ্রীব, কখন বিশ্বপতিবাবু আসবেন। শরৎদা কিন্তু নির্বিকার। শুধু বললেন, বিশ্বপতির জন্য ব্যস্ত হবার কিছু নেই। ওর আসতে একটু দেরি হবেই।
বিশুদা থামলেন। একটা সিগারেট ধরিয়ে লম্বা টান দিয়ে বললেন–এবার এক রাউণ্ড চা হয়ে যাক। বকর বকর করে গলাটা শুকিয়ে গেছে।
ঘরের এক কোণে অমর এক মনে কতকগুলি লেখার পাণ্ডুলিপি ফাইলে গুছিয়ে রাখছিল। বোঝা গেল কান সে খাড়া রেখেছিল গল্পের দিকে। বিশুদার মুখ থেকে চায়ের কথা বেয়োতে না বেরোতেই হন্তদন্ত হয়ে টপট নিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল। যেখানে এসে বিশুদা চায়ের জন্য গল্প থামিয়েছেন, সেখানে অধিক বিরতি বোধ হয় ওরও মনঃপূত নয়।
বৈঠকের তরুণ কবি আর ধৈর্য ধরে থাকতে না পেরে বললেন—তারপর কী হল বিশুদা?
বিশুদা বললেন–কি আর হবে। বিশ্বপতিবাবু না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
বুঝলাম বেচারী অমরকে বিশুদা বঞ্চিত করতে চান না। শুধু বললেন–আপনারা তমাললতা বসুর কবিতা পড়েছেন?
বৈঠকের তরুণ কবি বললেন—পড়েছি কিছু কিশোর বয়সে। কিন্তু কি পড়েছি আজ জিজ্ঞাসা করলে বলতে পারব না। তবু এটুকু মনে পড়ে প্রেমের কবিতাই লিখতেন বেশী, যা ওই বয়সে মন্দ লাগত না।
বিশুদা বললেন–এই দম্পতি সারা জীবন ধরে প্রেমালাপ করেছেন কবিতায় এবং পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সেই প্রেমালাপ শেষে প্রলাপ হয়ে উঠেছিল।
