প্রভাতদা? কোন প্রভাতদা?
আরে আমাদের প্রভাত দেব সরকার গো। এবারে আপনার পূজা সংখ্যায় বিনিয়োগ নামে যে-গল্পটি লিখেছেন, সেটি নাকি ওঁরই এক বিশেষ পরিচিত বাল্যবন্ধুকে নিয়ে লেখা। ওঁর বন্ধু কাজ করে এক সরকারী অফিসে, সেখানে প্রভাতদার এক জ্যাঠতুতো দাদাও কাজ করে। বন্ধুটি গল্প পড়ে ক্ষেপে গিয়ে প্রভাতদাকে হাতের কাছে না পেয়ে অফিসের মধ্যেই তার সেই জ্যাঠতুতো দাদাকে বেদম ঠেঙ্গিয়েছে। চশমা-টশমা ভেজে একাকার। এই নিয়ে অফিসে মহা শোরগোল। এক নিশ্বাসে কথাগুলি বলে হাঁপাতে লাগলেন।
কথাটা শুনে একটু অবাক হয়ে গেলেও প্রথমে বিশ্বাস করতে পারি নি। বিশুদার কথা তো! বৈঠকে একটা কিছু রুদ্ধশ্বাস গল্প ফেঁদে আসর গরম করায় ওঁর জুড়ি মেলে না।
আমাদের মুখের ভাবসাব দেখে বিশুদা বললেন–কথাটা বিশ্বাস করলেন না তো? ধৰ্ম্মত বুকে হাত দিয়ে বলছি, ঘটনা সত্যি। আমার কালিঘাট পাড়ার একটি ছেলে ওই অফিসে কাজ করে, সে-ই দুপুরে টেলিফোনে খবরটা দিল। সঙ্গে সঙ্গে আপনাকে টেলিফোনে বার তিনেক ধরবার চেষ্টা করেছি, এনেগেজড। তাই সশরীরে এসে খবরটা দিলাম।
বিশুদা বললে আমার কিন্তু দুশ্চিন্তা আপনাকে নিয়ে। প্রভাতদার যণ্ডামার্কা চেহারা—ওদিকে ঘেষবে না। তা ছাড়া জানেন তো প্রভাতদা হচ্ছে ভবানীপুরের পুরনো পলিটিক্যাল মস্তান। ওঁর গায়ে হাত দেয় এরকম বুকের পাটা কজনের আছে। তবে হ্যাঁ, আপনি ওঁর গল্প ছেপেছেন। আপনাকে কি রেহাই দেবে?
এ আবার কী কথা। গল্প ছেপে শেষকালে মারধোর খেতে হবে? প্রথমেই বলেছিলাম, পূজা-সংখ্যা বাজারে বেরুলে হাজার ঝামেলা। কিন্তু এরকম মারপিটের ঝামেলায় পড়তে হবে আমি তা কস্মিনকালেও কল্পনা করি নি।
১১. পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত গল্প
পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত গল্প নিয়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামার দুঃসংবাদ যিনি এনেছিলেন, সেই আমাদের বিশুদা, অর্থাৎ বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়ের কথা কিঞ্চিৎ এখানে না বললে বৈঠকের পরিচয়ই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কালীঘাট পাড়ার সদানন্দ রোডের দোতলায় একখানি ঘরে ছেলেমেয়ে নিয়ে থাকেন, কিন্তু সেই ঘরখানির স্থানমাহাত্ম কালীঘাটের মন্দিরের চেয়েও কিছু কম নয়। কালীঘাটের ট্রাম ডিপোর উল্টো দিকের গলি দিয়ে ঢুকে সদানন্দ রোডে পড়েই আপনি হাঁক দিন—বিশুদা বাড়ি আছেন?
সঙ্গে সঙ্গে দেখবেন দোতলার বারান্দায় হাস্যোম্ভাসিত একটি মুখ সাদর আহ্বান জানিয়ে বলছেন-চলে আসুন, ওপরে চলে আসুন।
রেলিং-বিহীন সংকীর্ণ সিঁড়ি সন্তর্পণে অতিক্রম করে দোতলার ঘরে ঢুকেই দেখবেন মেঝেতে ঘর-জোড়া ফরাশ পাতা, সেখানে আমারই মত আধ ডজন সাহিত্যোৎসাহী বন্ধু শুয়ে বসে আছেন। আপনিও একটা বালিশকে তাকিয়ার মত বগলদাবা করে শুয়ে পড়ে ডান পায়ের উপর বা তুলে নিশ্চিন্ত হয়ে নাচাতে থাকুন আর সাহিত্যের রাজা উজির মারুন, কেউ কিছু মনে করবে না। চা আর তেল-মুড়ি হাত বাড়ালেই হাজির।
কালীঘাটের এই পাণ্ডাটির কাছে সকলকেই আসতে হয়, বিশেষ করে লেখকদের।
কোথাও কোন আঘাত পেয়ে মন মুষড়ে আছে, চল বিশুদার কাছে। এক লেখকের সঙ্গে অপর লেখকের মনোমালিন্য হয়েছে, বিশুদার মিশন যে করেই হোক ঝগড়াটা মিটিয়ে ফেলতেই হবে। দারিদ্র্যের সঙ্গে নিত্যসংগ্রামে বিশুদা বিধ্বস্ত, কিন্তু পরাজিত উনি হবেন না। তাই কোন লেখক বিরূপ সমালোচনায় ম্রিয়মাণ হয়ে পড়লে বিশুদা উত্তেজিত কণ্ঠে তাকে এই বলে তিরস্কার করবেন-তা বলে কি হার মানতে হবে? বাধা যত আসবে তাকে দ্বিগুন জোরে ফেরাতে হবে আরও লিখে। তবে লেখাটা যেন সিনসিয়র হয়।
বিশুদার এক কথায় মনের গ্লানি দূর হয়ে গেল। এক মুহূর্ত আগে যে লেখক ভেবেছিল লেখা ছেড়েই দেবে, এখন সে দ্বিগুণ উৎসাহে বিশুদার সঙ্গে শুরু করে দিল নতুন উপন্যাসের প্লট নিয়ে আলোচনা।
বিশুদা আমাদের বয়সী হলে কি হবে, প্রবীণ ও নবীন সাহিত্যিক মহলে ঘোরা-ফেরা, মেলামেশার ব্যাপারে উনি আমাদের সকলের অগ্রণী। আমরা সেই সুবাদে ওঁকে সবাই দাদা বলে ডাকি। শরৎচন্দ্রের রসচক্র নামে যে সাহিত্যিক আচ্ছা ছিল, যার গল্প আমরা দূর থেকেই শুধু শুনে এসেছি, সেই বিখ্যাত রসচক্রের বিশুদা ছিলেন একজন নিয়মিত চক্রী। সেই আমল থেকে হালফিলের তরুণতম লেখকদের বিশুদা হচ্ছেন ফ্রেণ্ড, ফিলসফার অ্যাণ্ড গাইড। বিশুদা সাহেব কোম্পানীর ব্যাঙ্কে দশটাপাঁচটা টাকা আনা পাই হিসেব করেন, অবসর সময়ে করেন সাহিত্য চর্চা। অর্থাৎ লেখক বন্ধুদের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা দেওয়া। বন্ধুরা কে কোথায় লিখল, সে লেখা সম্বন্ধে বিশুদার মতামত না পাওয়া পর্যন্ত লেখকদের মনেও শান্তি নেই। কোন সাময়িক পত্রে কোন সাহিত্যিক বন্ধুর লেখা বেয়োনট মাত্র বিশুদার তা পড়া চাই এবং লেখকদের বাড়ি গিয়ে তাকে প্রচুর উৎসাহ না দেওয়া পর্যন্ত তাঁর স্বস্তি নেই।
বিপত্নীক হবার পর বিশুদা কিছুদিন মনমরা হয়ে গেলেন। বৈঠকে আসেন, চুপচাপ বসে থাকেন, আবার এক সময়ে কাজের অছিলায় উঠে চলে যান।
বিশুদাকে চেপে ধরলাম, গল্প লিখতে হবে।
শুনে বিশুদা বললে–আমিও তাই ভাবছি। জানেন বাড়িতে ফিরে গেলে মন টেকে না। একটা কিছু নেশায় মনটাকে ডুবিয়ে রাখতে চাই। বড় নেশায় আসক্তি নেই, উপায়ও নেই। সুতরাং লেখার নেশায় ডুবে থাকলে কেমন হয়? আমি বললাম-সে তত উত্তম প্রস্তাব। আপনি এত ভাল গল্প বলেন, অথচ লেখেন না। একি কম দুঃখের কথা।
