কথাটা বলতেই নরেনবাবু যেন খানিকটা মুষড়ে পড়লেন। উত্তরে কিছু একটা বলবার জন্য দম নিলেন, কিছু একটা বলতে গিয়ে মুখ দিয়ে একটা অস্ফুট ধ্বনিও বেরুলো, কিন্তু থেমে গেলেন। কথার পরিবর্তে বেরিয়ে এল একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস।
এবারে সত্যিই আমি অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। বৈঠকের অন্যান্যদের চোখে-মুখেও একটা লজ্জা ও সংকোচের ভাব স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। নরেনবাবু কি ঘরে ঢােকবার আগে আমাদের আলোচনা বাইরে থেকে শুনতে পেয়েছেন? নরেনবাবু আমাদের সকলেরই অত্যন্ত প্রিয় লেখক। শুধু তাই নয়, এই নিরহঙ্কার নিরভিমানী সরল মানুষটিকে আমরা সবাই ভালবাসি, আর সাহিত্যিক নরেন্দ্রনাথকে অন্তর দিয়ে শ্রদ্ধা করি বাংলা সাহিত্যের প্রতি তার অনন্যমনা নিষ্ঠা আর সাহিত্যবোধের প্রতি অনমনীয় দৃঢ়তার পরিচয় পেয়ে। তার মনে কোনরকম আঘাত দেওয়া আমরা তো কল্পনাই করতে পারি না। অত্যন্ত সংকোচের সঙ্গে আমি বললাম-দেখুন নরেনবাবু, আমার কথাটা যদি আপনার কাছে অপ্রিয় বলে মনে হয়ে থাকে তারজন্য আমি ক্ষমা চাইছি।
এবারে নরেনবাবুর মুখে একটু হাসির রেখা দেখা দিল। তিনি একটু থেমে, আমতা-আমতা করে বললেন–আমার দুঃখটা কি জানেন? নারায়ণ। এবারও আমার চেয়ে বেশী লিখেছে। আমি লিখেছি উনিশটা গল্প, ও লিখেছে তেইশটা। তাছাড়া খবর নিয়ে জানলাম ওর বায়না আছে বিসর্জনের দিন পর্যন্ত।
বৈঠকের সব্যসাচী লেখক বললেন–নারায়ণ গাঙ্গুলী তত আপনার বাল্যবন্ধু এবং অভিন্নহৃদয় বন্ধু। আপনাদের দুজনের প্রতিযোগিতায় আমরা, যারা এই মরসুমে দু-চারটে লিখে থাকি, তাদের অবস্থাটা বুঝুন। আপনাদের দুই বন্ধুর নামের নামাবলীতে সব পত্রিকার অঙ্গ আর তার বিজ্ঞাপন মোড়া। আমাদের নাম পাঠকরা আর মনে রাখবে কেন?
নরেনবাবু এবার যেন কণ্ঠে একটু উত্তেজনা ঢেলে বললেন–এই প্রতিযোগিতায় নামানোর জন্য আপনারাই দায়ী। প্রত্যেক বছর আপনারা আমাকে এই নিয়ে ঠাট্টা করেছেন। বলেছেন, যত বেশী গল্পই লিখি না কেন, নারানকে ছাড়াতে পারব না। আমি তাই এবার কোন কাগজকেই ফিরিয়ে দিই নি। কলকাতা মফস্বল যে-কোন জায়গার যে কোন কাগজের সম্পাদক এসে লেখা চাইতেই কথা দিয়েছি এবং কথা রেখেওছি। এত করেও নারানকে ছাড়াতে পারলাম না।
বৈঠকের তরুণ কবি নরেনবাবুকে সান্তনা দেওয়ার সুরে বললেন–দেখুন নরেনদা, নারানদার সঙ্গে এই কম্পিটিশনে আপনার নামাই উচিত হয় নি। নারানা হচ্ছেন প্রলিফিক রাইটার আর আপনি হচ্ছেন প্রটেকটিভ রাইটার। যতই যা-কিছু লিখুন, আত্মরক্ষা করেই আপনি লেখেন। অর্থাৎ সমালোচকরা হয়তো বলবে আপনি ইচ্ছা করলে আরও ভাল লিখতে পারতেন। কিন্তু এ কথা তারা কখনই বলবে না যে আপনি বাজে লিখেছেন।
সব্যসাচী লেখক বললেন–নারায়ণবাবু ঘটনাবহুল গল্প লিখতেই বেশী ভালবাসেন বলেই তার গল্পের গতি দ্রুত। আপনি লেখেন মনস্তত্ত্বমূলক গল্প, তাই অতি সন্তর্পণে আপনার চলা।
আমি বললাম-আমাদের সঙ্গীতশাস্ত্রে যাকে বলে দ্রুত খেয়াল, নারায়ণ বাবুর লেখা হচ্ছে তাই। দুন থেকে চৌদুনে তার গতি। নরেনবাবুর লেখার চালটা হচ্ছে ঢিমালয়ের খেয়াল, রাগের বিস্তার দেখানোই যার উদ্দেশ্য।
নরেনবাবু এবারে সলজ্জ জড়িতকণ্ঠে বললেন—আচ্ছা, আপনারা আজ আমাকে নিয়ে পড়লেন কেন বলুন তো?
আমার গাল্পিক বন্ধু বললেন–পূজা-সংখ্যা বেরিয়ে গেলে শহরসুদ্ধ লোকের মুখে আপনার কথা। যত বেশী গল্পই আপনি লিখুন, একথা কেউই অস্বীকার করবে না যে একটা স্ট্যাণ্ডার্ড আপনি সব লেখাতেই বজায় রাখেন। এ ক্ষমতা খুব কম লেখকেরই থাকে।
নরেনবাবুর চেহারার দিকে লক্ষ্য করলাম। কম কথার এই ঘোট খাটো মানুষটি লজ্জায় যেন টেবিলের তলায় ঢুকে পড়তে পারলে বাঁচেন।
তরুণ কবি বললেন—নারানদার গল্প পাঠকদের দৌড় করায় এবং একেবারে উর্ধ্বশ্বাসে। আর নরেনদা? পাঠকদের হাত ধরে ধীর পদক্ষেপ গহন অরণ্যের মাঝে এনে বলেন-কান পেতে শোন বনমর্মর আর কত বিচিত্র পাখির ডাক, আর শোন হিংস্র শ্বাপদের কবলে অসহায় হরিণীর কাতর ক্রন্দন। চেয়ে দেখ হ্রদের দিকে স্ফটিক-স্বচ্ছ জলের গভীরে কত বিচিত্র প্রাণীর
হঠাৎ নরেনবাবু পকেট থেকে একটা ডায়েরী বার করে কী যেন নিরীক্ষণ করলেন, তার পরেই হঠাৎ উঠে পড়ে বললেন—কই, আমার পূজা-সংখ্যার কাগজটা দিন। সাড়ে চারটা বাজল, পাঁচটার মধ্যে বঙ্গশ্রী অফিসে যাব বলেছি।
পত্রিকা হাতে নিয়েই নরেনবাবু প্রায় এক লাফে ঘরের চৌকাঠ পার হয়েই হাওয়া। নরেনবাবুর গল্প সম্বন্ধে তরুণ কবির কাব্যিক বিশ্লেষণেও বাধা পড়ল। শুধু বৈঠকের সব্যসাচী লেখক টিপ্পনী কেটে নরেনবাবুর পিছনে কথা ছুড়লেন-নরেনবাবু, ঝাকামুটে নিন। একা অতগুলি পূজা সংখ্যা বাড়ি বয়ে নিয়ে যাবেন কি করে?
কে একজন প্রশ্ন করল-নরেনবাবু ডায়েরী দেখতে-দেখতে হঠাৎ লাফিয়ে উঠে চলে গেলেন কেন জানেন?
আমি বললাম-ওটা একটা উপলক্ষ্য। নিজের লেখার প্রশংসা শুনতে লজ্জা পাচ্ছিলেন বলেই বোধ হয় ডায়েরীর পাতায় মুখ লুকোচ্ছিলেন।
কিছুই জানেন না আপনি। ওঁর ওই ছোট্ট ডায়েরীতে লেখা থাকে কার সঙ্গে কতখানি সময়ের অপব্যয় করবেন। আপনার এখানে টাইম ছিল আধঘন্টা। পার হতেই পগারপার। কিরকম মেথডিক্যাল লোক ভেবে দেখুন। উনি কি আর আমার-আপনার মত? আড্ডায় বসে গেলুম তো কা তব কান্তা।
নরেন্দ্র-নারায়ণ আলোচনার মাথায় মুগুড় মেরে ঝড়ের মত ঘরে ঢুকলেন আমাদের আড্ডার না-লিখে-সাহিত্যিক বিশুদা, বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়। ঘরে ঢুকেই চোখ বড় বড় করে বিশুদা বললেন—শুনেছেন, প্রভাতদা কি কাণ্ড করেছেন? একেবারে কেলেঙ্কারির একশেষ।
