টেলিফোনে আমার সাহিত্যিক বন্ধু বললেন—বুঝেছি। অর্থাৎ আপনি বলতে চান। বড় গল্পটি কয়েকটি ছোট গল্পকে তাড়িয়ে জায়গার জবর দখল নিয়েছে।
হতাশার সুরে আবার বললেন–আমার দুর্ভাগ্য, কোপটা পড়ল আমারই উপর।
তার জন্য আমিই অপরাধী, সাহিত্য সম্রাটকে দোষ দেবেন না। এক্ষেত্রে একজন না একজন বাদ পড়তই। আপনার লেখা বাদ দিলাম এই ভেবে যে আপনার সঙ্গে তো আমার শুধু লেখক-সম্পাদক সম্পর্ক নয়। আমার তাই এই বিশ্বাসটুকু আছে যে আপনি অন্তত আমাকে ভুল বুঝবেন না।
ভুল আমি বুঝি নি। আমার দুঃখের আসল কারণটা তাহলে আপনাকে খুলেই বলি। আমার শালী আমার গল্পের একজন অনুরাগী পাঠিকা। তাকে বলেছিলাম গল্পটা আপনার পত্রিকায় প্রকাশিত হবে। তার কাছে আমার মুখরক্ষা হল না, সেইটিই আমার দুঃখ।
এ কথা শোনার পর স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। এর পর কিছু বলা যায় না অথচ কিছু বলতেই হয়। অন্তত সহানুভূতির সঙ্গে দু-চারটি কথা। মানুষের দুর্বলতা কত রকমের থাকে। টেলিফোনে কিছু একটা বলব বলে প্রস্তুত হচ্ছি, ওপার থেকে দীর্ঘনিঃশ্বাসের সঙ্গে কথা ভেসে আসে-আর আপনাকে বিরক্ত করব না, নমস্কার।
টেলিফোন ছেড়ে দিলেন। বিমর্ষ মন নিয়ে বসে আছি। একে একে পূজা সংখ্যার লেখকদের আবির্ভাব ঘটতে লাগল। লেখকদের পরস্পরের মধ্যে এক প্রশ্ন—এবারে কে কটা গল্প লিখেছেন। কোয়ালিটির চেয়ে কোয়ান্টিটিই যেন এযুগে শ্রেষ্ঠতার মাপকাঠি। পুজোর বাজারে কে কতগুলি গল্প লিখেছেন সেইটিই নাকি আজকের দিনে জনপ্রিয়তার কষ্টিপাথর।
বৈঠকের গাল্পিক বন্ধু বললেন—কাল সন্ধ্যায় হাজরার মোড়ের কাগজের স্টল-এ পূজা সংখ্যা পত্রিকাগুলি উল্টেপাল্টে দেখছিলাম। যে-কাগজ খুলি তাতেই দেখি আমাদের নরেন্দ্রনাথ মিত্র। আমাদের পাড়ার সংহতি সংঘের সার্বজনীন পূজার উৎসাহী ছেলেরা আজ সকালে এসেছিল পত্রিকা দিতে। পাড়ায় যারা চাদা দেয় তাদের নামের তালিকা ছাপানোই এই পত্রিকার উদ্দেশ্য। সেই সঙ্গে সাহিত্যযশঃপ্রার্থী পাড়ার কিছু কিছু ছেলে তাদের গল্প কবিতাও প্রকাশ করে। কাগজটা খুলে দেখি সেখানেও নরেন্দ্রনাথ মিত্র। ভদ্রলোক থাকে এন্টালী, চেতলা সংহতি সংঘের সার্বজনীন পূজা-পত্রিকায় তার লেখা।
বন্ধু যে রকম ভীত শঙ্কিত চোখে কথাটা বললেন সবাই না হেসে থাকতে পারি নি। সেই সঙ্গে মনে পড়ে গেল শৈশবে সুকুমার রায় সম্পাদিত সন্দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি কবিতার কথা। কবিতার লাইনগুলি মনে নেই, ভাবার্থ হচ্ছে একটি ছেলে সুন্দরবনে তার মামাবাড়িতে প্রথম বেড়াতে গেছে। সে-দেশে সর্বত্রই সাপ। রাত্রে যে-ঘরে তাকে শুতে দিয়েছিল তার যেদিকে তার চোখ পড়ে সেখানেই দেখে সাপ। চৌকাঠে সাপ, কড়িকাঠে সাপ, মশারির দড়িতে সাপ, মশারির উপরে সাপ, খাটের তলায় সাপ। এই দেখে-দেখে ভয়ে আতঙ্কে পাশবালিশটি আঁকড়ে ধরে চোখ বুজতে যাবে, তখন পাশ বালিশটা ছুঁয়েই দেখে মস্ত একটা সাপ।
কবি-বন্ধু বললেন—আমার কাছে এটা একটা বিস্ময়ের বিষয় যে দশটাপাঁচটা চাকরি করে নরেনদা এত লেখেন কী করে?
আড্ডার সব্যসাচী লেখক বললেন–এইমাত্র আপনাদের অফিসের সামনেই নরেনবাবুর ভাই ধীরেনবাবুর সঙ্গে দেখা। দাদার সংবাদ জিজ্ঞাসা করতেই বললেন, তিনি নাকি এখনও ঘাড় গুঁজে লিখে চলেছেন এবং অষ্টমীর দিন পর্যন্ত নাকি তার বায়না আছে।
গাল্পিক বন্ধু বললেন–যাক, তাহলে এমন পত্রিকাও আছে যার পূজাসংখ্যা দুর্গা পূজায় না বেরিয়ে কালীপূজায় বোয়োয়।
সব্যসাচী লেখক বললেন—পূজা-সংখ্যার সময়টা ইদানীং অনেকখানি ব্যাপক হয়ে পড়েছে। এদিকে জগন্নাথের রথ ওদিকে কালী পূজা।
আলোচনা যখন এতদুর এগিয়েছে, নিঃশব্দ পদসঞ্চারে আমাদের ঘরে আবির্ভূত হলেন স্বয়ং নরেন্দ্রনাথ মিত্র। বৈঠকে তখন কথার তুবড়ি ছুটছিল, ঠাণ্ডা জল পড়তেই তা-যেন হু করে নিবে গেল।
দুরভাষিণীর স্বল্পভাষী লেখক নরেন্দ্রনাথ মিত্র কথা বলেন এত আস্তে যে কান পেতে শুনতে হয়। বোধ হয় কম কথা বলেন বলেই তাঁর কলমে গল্প-উপন্যাসের চরিত্রগুলি এত মুখর হয়ে ওঠে। কম কথা বলে বেশী লেখার শক্তি অর্জন করতে দেখেছি নরেন্দ্রনাথ মিত্রকে। এর ঠিক বিপরীত উদাহরণ হচ্ছে আমাদের সৈয়দদা, ডক্টর সৈয়দ মুজতবা আলী। শতং বদ মা লিখ–পূর্বাচার্যদের এই আপ্তবাক্যটি তার জীবনের বীজমন্ত্র। ইদানীং চাপে পড়ে ছিটে-ফোঁটা কিছু লিখেছেন। রাজশেখর বসুর পরে বাংলা সাহিত্যে রসের স্রোত বইয়ে দিতে এর জুড়ি নেই। এর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ইনি যতটুকু লিখেছেন, পড়েছেন তার শতগুণ এবং গল্প বলেছেন সহস্রগুণ। বাংলা সাহিত্যের এই জনসনের কোন বস্ওয়েল বন্ধু নেই, এইটিই আক্ষেপের বিষয়। সৈয়দদার গল্প অনেক বলবার আছে, বারান্তরে বলবও। এখন ফিরে আসি নরেনবাবুর কথায়। ঘরে প্রবেশ করা মাত্র টগবগানো ফুটন্ত ভাতের হাঁড়িতে ঠাণ্ডা জল ঢেলে দেওয়ার নিস্তব্ধতা দেখে নরেনবাবু বললেন—কী ব্যাপার, বাইরে থেকে ঘরে আলোচনার জোর শোরগোল শুনেছিলাম, আমি যেন সে-আলোচনায় বাধা দিলাম বলে মনে হচ্ছে?
সবাই এ-ওর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে দেখে আমিই অবশেষে বললামএই, আপনার কথাই এতক্ষণ আলোচনা করছিলাম। কথা হচ্ছিল, এবার পূজা-সংখ্যায় কে কটা গল্প লিখেছে। তাতে বৈঠকের বন্ধুরা একবাক্যে রায় দিলেন যে এবারে গল্প সবচেয়ে বেশী লিখেছেন আপনি এবং অষ্টমীর দিন পর্যন্ত আপনার লেখার বায়না আছে।
