সম্পাদকের কাছে তরুণ লেখকরা হামেশাই অনুরোধ করে থাকেন তাদের লেখা কাঁচা হলেও তা প্রকাশ করে উৎসাহ দেওয়া উচিত। কিন্তু নীতির দিক থেকে সম্পাদকেরপক্ষে এমন অনুরোধ রক্ষা করা কঠিন। কারণ, সম্পাদকরা যাদের মুন খান, সোজা কথায় যারা তাদের গ্রাহক, তাদের প্রতি কর্তব্য কিভাবে প্রতিপালিত হয়—সেটিই তাদের প্রধান বিবেচ্য। ছাপানোর মূলে ব্যক্তিগতভাবে সম্পাদকের মহৎ উদ্দেশ্য যতই থাকুক না কেন, গ্রাহকেরা সে ধার ধারবেন না। অনেক সময় সম্পাদকের কাছে এমন অবোধ আসে যে আর্থিক অনটনে জীবন দুর্বিসহ, লেখাগুলি ছেপে দিলে বিপদে উপকার হয়। এক্ষেত্রে সম্পাদকের ব্যক্তিগতভাবে সৎপ্রবৃত্তি বা সাধু উদ্দেশ্য চরিতার্থ করবার জন্য গ্রাহকদের খারাপ জিনিস দেওয়া সঙ্গত হতে পারে না। সম্পাদকরা সব সময় ভাল লেখাই দিয়ে থাকেন এমন কথা জোর দিয়ে আমি বলতে চাই না। তবে তারা চেষ্টা করেন সব সময় যতটা সম্ভব ভাল লেখা দিতে।
তরুণ লেখকদের একটা কথা জানা উচিত যে, সাহিত্যভারতীর মন্দিরের পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়। অনেক তিতিক্ষা, অনেক প্রতীক্ষা, অনেক ধৈর্যের প্রয়োজন সে-মন্দিরের পূজামণ্ডপে উপস্থিত হতে। অন্তরে জ্বালা নিয়েই এ-পথে এগিয়ে আসতে হবে, আঘাতে হতোদ্যম হলে চলবে না। লিখে যাওয়া উচিত, এবং সে লেখা সম্পাদকের কাছে পাঠিয়ে যাওয়াও উচিত ফলের আশা ত্যাগ করেই। এই ভাবেই একদিন কঁচা লেখা পাকা হবে, সম্পাদকরা তখন আগ্রহের সঙ্গেই সে-লেখা প্রকাশ করবেন। এমনি করেই তারাও একদিন সম্পাদকের গোষ্ঠীভুক্ত হয়ে পড়বেন।
আমার কথাও ফুল, আসরের শেষ চক্র চা-ও এসে গেল। কথায় কথায় রাত হয়ে এসেছে, সবারই উঠি-উঠি ভাব। টেবিলের উপর একরাশ খোলা চিঠি। চিঠিগুলি এতক্ষণ তাদের অনুরোধ উপবোধ রাগ অনুরাগ উম্মা আর হতাশা নিয়ে আমার কাছে কলরব করে উঠেছিল, এখন তারা শান্ত স্তব্ধ নীরব। এরা কি চিরকালের মত আমার কাছে নীরব থেকে যাবে? আমি আশাবাদী তাই আমি জানি যে, এদের মধ্যেই কোন-কোন লেখক একদিন কথা বলবে এবং সে-কথা সম্পাদকের দপ্তর ছাপিয়ে বাংলার ঘরে ঘরে ধ্বনিত হবে। সেই অনাগত পথিকের পদধ্বনি শুনবার জন্যই আমি কান পেতে আছি।
১০. শারদীয়া সংখ্যা পত্রিকা
শারদীয়া সংখ্যা পত্রিকা প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে স্নায়ুযুদ্ধের উত্তেজনার অবসান হল। শেষ ফর্মার প্রিন্ট অর্ডার দেওয়া হয়ে গেলে প্রিন্টার এসে বলেছিলেন-যান, এবার গঙ্গাস্নান করুন। কিন্তু গঙ্গাস্নানেও কি মুক্তি আছে? পত্রিকা প্রকাশের পরেও হাজার ঝামেলা। লেখকদের কাছ থেকে টেলিফোনে অনবরত তাগাদা আসছে-কী মশাই, বাজারে পত্রিকা বেরুলল, আমরা পাচ্ছি কখন? পিয়ন দিয়ে পাঠাবেন না, পেতে দেরিও হয়, খোয়ও যায়। নিজেই গিয়ে নিয়ে আসব।
দেড় মাস ধরে খাটাখাটুনির পর কোথায় একটু বায়োস্কোপ থিয়েটার দেখে চিত্তবিনোদন করব, তা নয়, ধুনি জ্বালিয়ে বসে থাকতে হবে কখন কে আসবেন পত্রিকা নিতে।
যা আশঙ্কা করেছিলাম তাই হল। টেলিফোন বেজে উঠতেই রিসিভার তুলেছি, দূরভাষী বন্ধুর পরিচিত কণ্ঠস্বর, স্নান করুণ গম্ভীর।
হ্যালো!
বলুন, কাকে চাই?
আপনাকেই দরকার। আমার গল্পটা দিতে পারলেন না?
চেষ্টা খুবই করেছিলাম। আপনি তো নিজেই দেখে গিয়েছিলেন আপনার গল্পের ছবি প্রুফ সবই তৈরী ছিল।
সেই দেখেই তো নিশ্চিন্ত ছিলাম যে গল্পটা নিশ্চয় প্রকাশিত হচ্ছে। বিজ্ঞাপনের তালিকায় নাম না দেখেও হতাশ হই নি, কারণ ইতিপূর্বে একাধিক বার বিজ্ঞাপনের তালিকায় নাম না থাকলেও লেখা প্রকাশিত হয়েছে। শুধু আমারই নয়, আরও অনেকের। তাই আজ আপনাদের পত্রিকা প্রকাশিত হতেই অফিস যাবার পথে এসপ্ল্যানেডের স্টল-এ পত্রিকা নেড়েচেড়ে দেখলাম আমার গল্প নেই। অফিস যাওয়া হল না। কাছেই, একটা দোকান থেকে টেলিফোন করছি।
আমি সত্যিই খুব দুঃখিত। কিন্তু এই জন্যে আপনি অফিসে গেলেন না?
কি করে যাই বলুন। অফিসের সবাইকে বলেছিলাম আপনাদের কাগজেই এবার আমার সবচেয়ে ভাল গল্পটা বেরোচ্ছে।
ছি ছি, আমি খুবই লজ্জিত। আপনি আগে থেকেই সবাইকে না বললেই ভাল হত। জানেন তো অনেক অনিশ্চয়তা নিয়েই আমাদের কাজ করতে হয়।
তা জানি। তবু মনে একটা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। সত্যি করে বলুন, গল্পটা কি আপনার পছন্দ হয় নি?
আরে না না, তা কেন হবে? তা ছাড়া আমার পছন্দ-অপছনয় কী যায়-আসে। আপনারা বহুদিন ধরেই লিখছেন, এবং লেখার মধ্যে দিয়ে আপনারা নিজেদের পাঠকও সৃষ্টি করে নিয়েছেন। এখন সম্পাদকের দপ্তর ছাপিয়ে দায়িত্বটা পাঠকদের কাছেই বেশী। আপনার গল্পর ভাল-মন্দর বিচারক আজ তারাই।
সেইজন্যেই তো আপনার পত্রিকায় লেখা দিতে হলে অনেক ভেবেচিন্তে লিখতে হয়। যতক্ষণ না লেখা সম্বন্ধে নিজে নিঃসন্দেহ হতে পারছি ততক্ষণ আপনার কাগজে লেখা পাঠাতে ভরসা পাই না। আপনার পত্রিকার পাঠকরা যে কড়া বিচারক তা আমরা সবাই জানি। তবু আমার লেখা সম্পর্কে এ-অঘটন কেন ঘটল সে-প্রশ্ন মন থেকে কিছুতেই দূর হচ্ছে না।
তাহলে আসল কারণটা আপনাকে খুলেই বলি। আমাদের সাহিত্য সম্রাট শেষ মুহুর্তে খবর পাঠালেন যে তিনি পূজা সংখ্যার জন্য গল্প লেখায় হাত দিয়েছেন, সুতরাং তার জন্য যেন জায়গা রাখা হয়। কতখানি জায়গা রাখতে হবে জানতে চাইলে বললেন যে, গল্প ছোটই হবে, ছ-পাতা জায়গা রাখলেই চলবে। সম্রাটের কথা তো, তাঁর ছোট গল্প মানেই বড় গল্প, বড় গল্প মানে উপন্যাস, উপন্যাস মানে আরেকটি মহাভারত। ছ-পাতার পরিবর্তে বানো পাতা জায়গা রেখেছিলাম। কিন্তু নিজের চোখেই তত দেখেছেন, সে গল্প উনিশ পাতায় এসে ঠেকল। তখন উপায়?
