আপনার এই যুক্তি সম্পূর্ণ মেনে নিতে না পারলেও এটুকু স্বীকার করবই যে, আগেকার দিনে সাহিত্যিকরা লিখতেন প্রাণের তাগিদে, প্রতিদানে পেতেন যশ ও খ্যাতি। তারা ছিলেন তাতেই সন্তুষ্ট। আজকের দিনে জীবনের মূল্যবোধ গেছে পালটে। যশ ও খ্যাতির বিচার হয় টাকায়, জীবনের মূল্যায়ন হয় কাঞ্চনমূল্যে। সেদিক দিয়ে আজকের লেখকরা লাভবান। প্রাণের তাগিদকে শিকেয় তুলে রেখে টাকার তাগিদেই লেখেন, সাহিত্যপদবাচ্য হক আর না হক। এই সব লেখক সবচেয়ে বেশী আস্কার। পান পত্রিকা-সম্পাদক আর পুস্তক প্রকাশকদের কাছে।
আমি বললাম—এ নিয়ে আক্ষেপ করে লাভ নেই। আমি বলব, পাঠকরা কেন এই লেখা হুমড়ি খেয়ে পড়েন। আপনি বলবেন সম্পাদক-প্রকাশকরা কেন এ সব লেখা ছাপেন। এর কোন মীমাংসা নেই—এ হচ্ছে ভিশ্যাস সার্কল।
আমাদের গাল্পিক বন্ধু এতক্ষণে মুখ খুললেন—তাহলে আমার একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। একদিন বিকেলে কলেজ স্ট্রীটে আমার বইয়ের প্রকাশকের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছি, এমন সময় এক যুবক কাউণ্টারে এসে জিজ্ঞাসা করলেন—আপনাদের কাছে পাঠ্যপুস্তক পাওয়া যাবে?
দোকানের মালিক বললেন–আপনি ভুল করেছেন, আমরা টেক্সট বুক। ছাপাই না।
উত্তরে যুবক বললেন— জানি। বইয়ের বাজার তো অপাঠ্য পুস্তকে ছেয়ে গিয়েছে। আমি তাই কিছু পাঠ্যপুস্তক খুঁজে বেড়াচ্ছি।
আমি বললাম—ভদ্রলোক খাঁটি কথাই বলেছেন। বই বাছতে গুদাম উজাড়। শান্তিনিকেতনে আমাদের অঙ্কের মাস্টারমশাই জগদানন্দ রায়কে আপনারা সবাই চেনেন। ছেলেদের জন্য বিজ্ঞানের বই লিখে যিনি স্বনামধন্য। তার একমাত্র ছেলে ত্রিগুণানন্দ রায়, ডাক নাম পটল। স্কুলে কলেজে খুবই মেধাবী ছাত্র ছিলেন, যৌবনে ভাল চাকরি করতেন। সেই আমাদের পটলদা হঠাৎ পাগল হয়ে গেলেন। একদিন প্রচণ্ড গ্রীষ্মের দুপুরে দেখি পটলদা মাথায় প্রকাণ্ড এক পাগড়ি বেঁধে তার উপর বীরভূমী তালপাতার একটা টোকা চাপিয়ে মাঠের মধ্যে দিয়ে চলেছেন। গায়ে গরম কোট, হাতে একটা লণ্ঠন এবং লণ্ঠনটি জ্বলছে। ওঁকে যখন জিজ্ঞাসা করা হল—কি পটলদা, দুপুর বেলায় লণ্ঠন জ্বালিয়ে কোথায় চললেন?
গম্ভীর হয়ে পটলদা শুধু বললেন, মানুষ খুজতে।
বৈঠকের এক দর্শনিক কবি বলে উঠলেন-আহা হা, কী খাঁটি কথা। দেশ যেখানে অমানুষে অন্ধকার সেখানে আলো জ্বালিয়ে খাঁটি মানুষ খুঁজতে বেরিয়েছেন। আপনাদের পটলদাকে পাগল বলছেন কি মশাই, এ-তত হাই ফিলসফি। গগন হরকরার সেই বিখ্যাত বাউল গানটা মনে পড়ে গেল–
আমি কোথায় পাব তারে
আমার মনের মানুষ যে রে।
হারায়ে সেই মানুষে, তার উদ্দিশে
দেশ বিদেশে বেড়াই ঘুরে।
সব্যসাচী লেখক দার্শনিক কবিকে থামিয়ে দিয়ে টিপ্পনী কেটে বললেন-–মানুষ নিয়ে দর্শনশাস্ত্র আওড়ানো এখন থাক। আমাদের কথা হচ্ছিল লেখক নিয়ে। ফকিরের গানটায় মানুষ-এর জায়গায় লেখক বসিয়ে দিন আমাদের আজকের আলোচনার মোদ্দা কথাটা সুড়সুড় করে বেরিয়ে আসবে এবং বই-খুজতে-আসা সেই যুবকের প্রশ্নের হেঁয়ালিটাও জলবৎ তরল হয়ে যাবে।
তরুণ কবি বলেলেন-বিষয়টা কিন্তু সত্যিই চিন্তা করবার। আপনার পটলদা দিনের আলোয় লণ্ঠন জেলে মানুষ খুঁজে বেড়াচ্ছেন, বই পাড়ার সেই যুবক খুজে বেড়াচ্ছেন পাঠ্যপুস্তক আর সম্পাদকরা খুঁজে বেড়াচ্ছেন মনের মত লেখক। কিন্তু এ-খোঁজার কি শেষ আছে?
এবার গাল্পিক লেখক বললেন–যে কথা দিয়ে আজকের আলোচনা শুরু হয়েছিল তাই চলুক। আপনারা বড় বাজে কথায় চলে যাচ্ছেন, কাজের কথায় আসুন। আমার প্রশ্ন হচ্ছে সম্পাদকের দপ্তরে যেসব বিক্ষোভপূর্ণ চিঠিপত্র আসে তাদের প্রধান অভিযোগটা কী?
আমি বললাম—প্রধান অভিযোগ যা, তা তো আপনারা রামপুরহাটের চিঠিতেই পেলেন। তদ্বির, মামার জোর না থাকলে সম্পাদকরা লেখা ছাপেন না। সম্পাদকের বিরুদ্ধে, প্রধানত সাময়িক-সাহিত্য এবং চিরন্তন সাহিত্য এই দুই রকম মাল নিয়ে একসঙ্গে যাদের কারবার, কেউ কেউ অভিযোগ করেন যে সম্পাদক বাইরে থেকে ভাল লেখা পেলেও ছাপেন না। তাদের একটা জোটবাঁধা দল আছে, শুধু সেই লেখকদের লেখাই তাঁদের আদর পায়। এই অভিযোেগ যে কতটা ভিত্তিহীন, পত্রিকার সংশ্রবে যারাই এসেছেন তারা ভালভাবেই জানেন। ভাল লেখা যে পাওয়া কত দুর্ঘট, বাইরে যারা থাকেন, তাঁরা সে খবর রাখেন না। এমন অবস্থায় ভাল লেখা পেলেই সম্পাদকরা সেগুলি অনাদর করবেন, একি সম্ভব? পত্রিকা পরিচালনার অন্য আদর্শ বা সে সম্বন্ধে সম্পাদকের কর্তব্যের কথা যদি ছেড়েও দেওয়া যায়, তা হলেও এ-যুক্তি টেকে না। সম্পাদকরা বেশ জানেন, ভাল লেখা পত্রিকায় প্রকাশ করলে, তাদের কাগজের আদর বাড়বে, প্রচার এবং প্রসার হবে, সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞাপনও বাড়বে। অন্য কথায় ব্যবসার অর্থাৎ পয়সা আসবার পথ বেশী প্রশস্ত হবে। দলের খাতির যোগাতে গিয়ে ভাল লেখাগুলিকে বাদ দিয়ে যেসব লেখা খারাপ সেগুলিকে প্রাধান্য দেওয়ার অর্থ তাঁদের নিজেদের পায়ে কুড়ল মারা। এমন বিচার নিয়ে চলতে গেলে নিজেদের কাগজের অন্তেষ্টিক্রিয়ার দিনটা আগে নির্দিষ্ট করে নিতে হয়। সত্যিই কোন কাগজের যদি নিজেদের কোনো সাহিত্যিক দল থাকে তবে সে-দলের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে যতই বড় বড় কথা শোনা যাক না কেন, আসলে হল স্বার্থ, অর্থাৎ ভাল লেখা পাবার ব্যবস্থা করা। খাতিরে লেখা ছাপানো কালে ভদ্রে চলতে পারে, কিন্তু দলের খাতিরে কারো মন্দ লেখা বরাবর চালানো যায় না। কারণ স্বার্থের দিক থেকেই তা ক্ষতিকর। বাইরে থেকে যদি কারও ভাল লেখা পাওয়া যায় তাহলে সম্পাদকরাই তাঁকে দলে টেনে আনবার জন্য তৎপর হয়ে পড়বেন এবং সেইটিই ঘটে থাকে।
